চট্টগ্রাম রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

সর্বশেষ:

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ | ১:৪০ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 

‘সিটি গভর্নমেন্ট’র বিকল্প নেই

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের মেয়র প্রার্থীদের ‘ইশতেহার’ ঘোষণা করেছে। চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য বিশ্বমানের উন্নত ও নান্দনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলা স্বপ্ন দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী। ‘রূপসী চট্টগ্রাম আমার-আপনার অহঙ্কার/অঙ্গীকার-সবার যোগে সাজবে নগর।’ এই স্লোগানে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন তিনি।

অপরদিকে, নিরাপদ চট্টগ্রাম, সাম্য-সম্প্রীতির চট্টগ্রাম, জলাবদ্ধতামুক্ত নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। ‘চলো সবাই বাঁধো জোট, এবার দেবো আমার ভোট’ স্লোগান নিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন তিনি।

ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট সমস্যা থেকে উত্তরণ, সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নালা নর্দমা, খাল-নদী দখলদার উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটন রাজধানী হবে চট্টগ্রাম, স্বাস্থ্যসেবাসহ মূল ৩৭ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

অপরদিকে, বিএনপি প্রার্থী আরও এগিয়ে ৭৫ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। তিনিও জলাবদ্ধতামুক্ত, সাম্য-সম্প্রীতির চট্টগ্রাম, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্য-শিক্ষাবান্ধব, তথ্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ, নান্দনিক পর্যটন নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।

প্রধান দুই দলের ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই একই ধরনের। চটকদার এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। অন্যথায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা ও আওতার বাইরে গিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। যা বাস্তবায়ন করা কঠিন। এটা হচ্ছে ভোটে জেতার ইশতেহার। বাস্তবে কিন্তু ভিন্ন।’

তিনি বলেন, ‘আমার আমলে (৮৯-৯০ সাল) বন্দর, সিডিএ, ওয়াসা, পুলিশ প্রশাসন, বিদ্যুৎ, রেলওয়ে, সওজ ও অন্যান্য সেবাধর্মী সকল সংস্থা সিটি গভর্নমেন্টের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সকল সংস্থার সমন্বয়ে নগরীর উন্নয়ন সাধিত করেছি। মেয়রের ক্ষমতা উপভোগ করেছি। এখন তো মেয়রের সেই ক্ষমতা নেই।’

ইশতেহারে দুই দলের প্রার্থী নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এছাড়াও নগরীর যানজট ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সন্ত্রাস দমন, মাদক নির্মূলসহ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে ভিন্ন। আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিকব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে নগর পুলিশ। এখানে মেয়রের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা গৌণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) প্রফেসর সিকান্দর খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রধান কাজ হচ্ছে রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, যাতায়াতের সুবিধা করা, আলোকায়ন, মশক নিধন করা। নিজের আওতার বাইরে ভোটারদের খুশি করার জন্য বড় বড় আশা দেখিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। বাস্তবে যা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’

প্রধান প্রতিশ্রুতি জলাবদ্ধতা নিরসন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা স্থানীয় সরকারের বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। বড় প্রকল্প। মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কোনো প্রার্থীই ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেননি। নগর সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা সাদরে গ্রহণ করতো জনগণ। নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করা হলে নিজেদের মতো করে সবকিছু করতে পারতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নগর সরকার রয়েছে। তারা নিজেদের মতো করে কাজ করে। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে কাজ করতে হয়। ট্যাক্সি ছাড়াও সরকারের থোক বরাদ্দের উপর নির্ভর হয়ে থাকতে হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে সিটি গভর্নমেন্ট অধ্যাদেশ বাতিল করে। এর আগে এরশাদ সরকার আমলে নগর সরকার আইন ছিল। ’৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পদত্যাগের পর তা অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকারের দাবি করেছিলেন সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ঢাকার মেয়র প্রয়াত মো. হানিফও একই দাবি করেছিলেন। এরপর থেকে আর কোনো মেয়র সেই দাবি করেননি।

সিটি গভর্নমেন্ট শাসন না থাকায় অনেকটা ক্ষমতাহীন প্রশাসনে পরিণত হয়েছে সিটি করপোরেশন। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। শহরভিত্তিক উন্নয়নের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার প্রচলিত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকার পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমা নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, খাল খনন ও দখলদার মুক্তকরণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা না করলে সিটি করপোরেশনগুলোর বর্তমান সংকুচিত ক্ষমতা  থেকেই যাবে।

সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা না থাকায় সরকার ও বিরোধীদলের মেয়র পদ নিয়ে বৈমষ্যের অভিযোগ রয়েছে। এতে নগরীর উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও পুরোনো। যেমন মেয়র মহিউদ্দিনের তিনটি মেয়াদের দায়িত্ব পালনের সময়ে অধিকাংশই ক্ষমতায় ছিলেন বিএনপি সরকার। এসময় সিটি করপোরেশন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো অনেক প্রকল্প আটকে দেওয়ার অভিযোগ মানুষের মুখে মুখে। একইভাবে সাবেক মেয়র মন্ধসঢ়;‌জুর আলমের আমলেও একই অভিযোগ ছিল। মনজুর আলম আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর আমলে সিটি করপোরেশনের জন্য সরকারের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সদ্য বিদায়ী মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের এক বক্তব্যের রেশ ধরে সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনসহ কয়েকটি মেগাপ্রকল্প সিটি করপোরেশনকে বাদ দিয়ে সিডিএকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অথচ সিটি নির্বাচনে মেয়রের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন করা। শেষতক সেই প্রকল্প হাতছাড়া হয়ে যায় সিটি করপোরেশনের। সিটি গভর্নমেন্ট শাসনব্যবস্থা না থাকায় সেবাধর্মী সংস্থার সমন্বয় সাধন ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে ব্যক্ত করেন বিশিষ্টজনেরা।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 159 People

সম্পর্কিত পোস্ট