চট্টগ্রাম বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

সর্বশেষ:

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

এস এম নাজের হোসাইন

ভেজালরোধ প্রধানমন্ত্রীর শূন্য-সহনশীলতার ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে ভেজাল, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং বিক্রয়কে ‘দুর্নীতি’ আখ্যায়িত করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে খাদ্য ভেজালকে দুর্নীতি বলে আখ্যায়িত করেছেন হাইকোর্ট। সরকার এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে এগিয়ে চলছে। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা খানিকটা স্বস্তিবোধ করছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই কাক্সিক্ষত ঘোষণা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে বা জনগণ কী সুফল পাচ্ছে ? তা আলোচনার বিষয়। কারণ ফেনীর নুসরাত ও বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যার আসামিসহ প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও নির্দেশনা ছাড়া কাজে অগ্রগতি হচ্ছে না। নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধেও একই অবস্থা। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে? তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাস্তার খাবার থেকে প্যাকেটজাত পণ্য সবকিছুতেই মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল। বিদেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়ো দুধ আমদানি ছাড়াও পাস্তুরিত দুধে সিসা এবং মার্কারি, মুরগির মাংসে হেভি মেটাল, এন্টিবায়োটিক এবং গরুর মাংসে পাওয়া যাচ্ছে গরু মোটাতাজাকরণের স্টেরয়েডসহ এন্টিবায়েটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার। মিষ্টান্ন ও বেকারিতে তৈরি পাউরুটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যান্সারের জন্য দায়ী পটাশিয়াম রোমেটসহ নানা কেমিক্যাল। হোটেল-রেস্তেুারাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না, পরিবেশন ও সংরক্ষণ করা, পোড়াতেল, মানহীন ও নি¤œমানের উপাদান দিয়ে খাদ্য রান্নার অভিযোগ প্রায়শ দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও ফুডগ্রেড দেয়ার পরিবর্তে কাপড়ের রঙ, দেয়ালের রঙ ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র প্রতিনিয়তই খররের শিরোনাম হচ্ছে। খাদ্যে ভেজালের এই সীমানা এখন আর শুধু খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ নাই, এটি এখন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবেও সংক্রমিত হয়েছে। যার কারণে মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষ যা আয় করে তার সিংহভাগই এখন চিকিৎসা ও ওষুধ ক্রয়ে চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকেই অনিরাপদ খাদ্যের কারবারীরা তৎপর থাকলেও তাদের অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। নানা সময়ে তাদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র‌্যাব, পুলিশ প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই’র অভিযান পরিচালিত হলেও কার্যত কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার জরিমানা করার পরও পরবর্তীতে আবারও একই অপরাধ সংগঠিত করে চলেছেন। অভিযান বন্ধ হলেই খাদ্য ভেজালপণ্যের কারবারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের দৌরাত্ম্য এখন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার মানসে সরকার নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এবং আইনের আওতায় পৃথকভাবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনের আওতায় প্রতিটি জেলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতও গঠন করা হয়েছে। যদিও এবিষয়ে সাধারণ জনগণের অনেকের ধারণা নেই। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদে পদায়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বেশ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় শহরে কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা বলছেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, জনবল সংকটের কারণে প্র্রতিষ্ঠানটি জনগণের চাহিদা মাফিক সকল কার্যক্রম সুচারুভাবে করতে পারছে না। কিছু কিছু জায়গায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৭টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বপালনে গাফিলতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও আছে। আর এ সুযোগ নিচ্ছে অনিরাপদ খাদ্যের কারবারীরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। খাদ্যে ভেজালকারী ও মুনাফাশিকারী সিন্ডিকেটগুলো একদিকে নানাভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে, অন্যদিকে অনিরাপদ ভেজাল খাদ্য-পণ্য বিক্রি করে সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যহানি করছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, খাদ্যপণ্যে এ নৈরাজ্য ঠেকাতে জেলা প্রশাসন, খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তাদের মধ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। একই সাথে নিরাপদ খাদ্যের মূল অংশীজন হলো ভোক্তা ও সরকারি নীতি নির্ধারণে এই ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে বৈষম্য কমাতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীতি নির্ধারণীতে ব্যবসায়ীদের আধিক্য থাকলেও ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব আমলে না নেওবার বিষয়টিকে খাদ্যে ভেজালরোধে বড় দুর্বলতা মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে আমরা প্রায়শ দেখে থাকি আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক দাতাসংস্থাসহ

সরকারি-বেসরকারি দপ্তরগুলো সব সময় ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা উন্নয়নে নানা কর্মসূচি নিলেও ভোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও তাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কোন কর্মসূচি নিতে আগ্রহী নয়। ফলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবধান ক্রমাগতই বেড়েই চলেছে। সরকার যদি খাদ্যে ভেজালরোধে ব্যবসায়ী নির্ভর হয়ে যায় তাহলে যাবতীয় নীতি প্রণীত হবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে, যা খাদ্যপণ্যের বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় অন্তরায় হতে পারে। যার জলন্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে দেশে চলমান পেঁয়াজ সংকট।
সরকারের নানামুখী কর্মকা-ে দেশ খাদ্য উৎপাদনে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয় ওঠেনি। দেশে খাদ্য ব্যবসায় জড়িত কিছু অতি মুনাফাশিকারী এবং ভেজালকারী চক্রের দৌরাত্ম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যপণ্যের বাজারে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে দেশে ন্যায্য ব্যবসার পরিবেশ বারবার বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যে সুশাসনের ঘাটতিও ক্রমাগত বাড়ছে। নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ এখনো পুরোপুরি সচেতন নয়। যার বড় দৃষ্টান্ত রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে রাস্তার উপর ধুলো-ময়লায় পথ খাবার বিক্রি। এসব খাবার খেতে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি।
কৃষক ও উৎপাদকের মাঠ-খামার, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন ও পরিবেশন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে নিরাপদ খাবার নিশ্চিতকরণের বিধিবিধানগুলি অনুসরণ করা না হলে নিরাপদ খাদ্যও অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে। সরকার ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জনশক্তির বিকল্প নেই। আর কর্মক্ষম জনশক্তির জন্যে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকার এখন এ বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছেন।
সরকার শুদ্ধাচার কৌশল, এনুয়েল পারফরমেন্স এগ্রিমেন্ট (এপিএ), গণশুনাণির মতো নানা কৌশল উদ্ভাবন করলেও মাঠ পর্যায়ে সত্যিকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, যথাযথ নাগরিক পরীবিক্ষণ না থাকায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিশেষ করে খাদ্য ভেজালবিরোধী কার্যক্রম, ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের গা-ছাড়াভাব। এতে প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যে ভেজালবিরোধী শূন্য-সহনশীলতা প্রদর্শন যথাযথ হচ্ছে না। প্রশাসনের আন্তরিকতা ও দায়সারা গোছের দায়িত্বপালনের কারণে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে।
সুস্থ-সবল জাতি গঠন ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সুস্থ জাতি এবং কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে তুলতে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকারসহ জনস্বার্থে অনেক আইন ও বিধিবিধান এবং কর্তৃপক্ষ থাকলেও আইন প্রয়োগ সব সময় যথাযথভাবে হয় না। আইন প্রয়োগে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে প্রয়োগের মাত্রাও রঙ বদলায়। এতে আইন না মানার সংস্কৃতি ক্রমশঃ বাড়ছে। কারণ মানুষ নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে খাদ্যপণ্য ও সেবা ক্রয় করে থাকে। ক্রয়ের আগে খাদ্যপণ্য ও সেবার মান যাচাই করা একান্ত আবশ্যক। শুধুমাত্র বাহারী ও চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে খাদ্যপণ্য ক্রয় করলে প্রতারিত হওবার ঝুঁকি বেশি। জনসচেতা ছাড়াও কৃষক, উৎপাদনকারীদেরকেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ে সচেতন-দক্ষতা বাড়াতে হবে। সার ও কীটনাশক, এন্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, ওষুধ-কীটনাশক ব্যবহারের পর প্রত্যাহার সময়সীমা, খাদ্যদ্রব্যের প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, সংরক্ষণসহ খাদ্য-শৃঙ্খলের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপদ রাখার বিধিবিধান ও অনুসরণীয় বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল কর্তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পাঠ্যপুস্তকে জাঙ্কফুডের মতো নিরাপদ খাদ্যপণ্যসহ ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাহলে নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা হিসেবে তার অধিকারও আইনগতভাবে ভোগ করতে পারবে।

লেখক : ভাইস প্র্রেসিডেন্ট, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

The Post Viewed By: 27 People

সম্পর্কিত পোস্ট