চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫

সর্বশেষ:

ঢেলে সাজানো হজ-ব্যবস্থাপনা

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

১২ আগস্ট, ২০২৪ | ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

করোনা মহামারী পরবর্তী সৌদি সরকার হজকে ঢেলে সাজাতে তৎপর। এতে অন্যতম একটি হল হজের অনুমতি ব্যতীত যেনতেনভাবে কেউ যাতে হজ করতে না পারে। সাথে হজ ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো ত আছেই। প্রাথমিক যুগ থেকে পবিত্র মক্কাবাসীদের অনেকে হজের মোয়াল্লেম হিসেবে দায়িত্বপালন করে আসছেন। মোয়াল্লেম অর্থ শিক্ষক বা শিক্ষাদাতা। হাজার বছরের এ প্রথাকে গত ২০২২ সাল থেকে সৌদি সরকার পরিবর্তন আনে। মোয়াল্লেমগণের করা অনেক দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়।

 

দোষেগুণে মানুষ। মোয়াল্লেমগণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি অভিযোগ আসবে না তা নয়। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় হয়ত মনে করতেছেন হজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো উত্তম হবে। সেই মতে মিনা আরাফাতে তাঁবুর ব্যবস্থাপনা, খাবার সরবরাহ, হজযাত্রীর কল্যাণে স্থানে স্থানে সেবক নিয়োগ, বাস কোম্পানী পরিবর্তনসহ অনেক কিছু। সাথে সাথে এও দেখা গেছে, অনুমতিবিহীন কেউ যাতে পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে আগত হজযাত্রী এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তর থেকে অনুমতি প্রাপ্ত হজযাত্রী পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে অন্যথায় নয়। জেদ্দা ত নয়ই পবিত্র মক্কায় বসবাসকারী আমাদের দেশের প্রবাসীরা হজে গমন করা তাদের আপনজনের সাথে সাক্ষাত করতে আসার জন্য সাহস করেননি। সৌদি সরকার ১৮ লাখ হজযাত্রীর আইডি কার্ড প্রদান করে প্রত্যেকের ছবি সম্বলিত। যারা হজের বিভিন্ন ক্যাটাগরীর সেবক তাদের জন্যও ছবি সম্বলিত একই আকৃতির আইডি কার্ড প্রদান করে। তবে হজযাত্রীর আইডি কার্ড ও সেবকের আইডি কার্ডের রং ভিন্ন যা দূর থেকে সহজে অনুমেয়। শুধু তাই নয়, লাখ লাখ হজযাত্রী হজের আগে মসজিদুল হারমে নামাজ পড়তে গমনকালীনও এই আইডি কার্ড চেক করতেছিল। কাফেলা এজেন্সী বা বাংলাদেশ সরকারের আইডি কার্ড গ্রহণযোগ্য নয়। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় প্রদত্ত আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এত কিছুর পরও কড়াকড়ির মধ্যে থেকেও অনেকে অনুমতিবিহীন হজ করেছে। অপরদিকে সৌদি সরকারের ঢেলে সাজানো সংস্কার হজযাত্রীর কল্যাণে না এসে অকল্যাণ হয়েছে বলে মনে করি। মাত্র দুটি দিকে হজযাত্রীর কল্যাণ রয়েছে। ১) জেদ্দা হজ টার্মিনাল ভবন পার হলেই বিশাল খোলা চত্বরে উপরে প্রকান্ড প্রকান্ড ছাউনি থাকলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল না। গরমকালে হজ। ১৯৮৩ সালে নতুন বিমান বন্দর চালু হয়। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হজযাত্রীগণ বিমান বন্দরে নেমেই গরমে কষ্টের সম্মুখীন হত। করোনা পরবর্তী এখন ব্লক ব্লক করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২) গরীব দেশের হজযাত্রীদের পুরাতন ভাঙ্গাচোঁড়া বাস মেরামত করে চালানো হত। এ সমস্ত বাস কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন সব অতি উন্নতমানের নতুন নতুন বাস। মনে হয় চট্টগ্রাম-ঢাকা যাতায়াতে বিলাসবহুল বাসগুলোর চেয়ে ঐ বাসগুলো উন্নত। বাকী সমস্ত ব্যবস্থাপনা আমার কাছে হজযাত্রীর আগের চেয়ে কল্যাণ হয়েছে বলে মনে করি।

 

মিনায় তাঁবুর ভিতর হজযাত্রীগণের অবস্থান আগের মত গিঞ্জি। মাত্র দেড় ফুটের মত প্রশস্ত। খাবার মান আগের চেয়ে নিম্ন। মিনায় ১০ তারিখ জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড এক অপরিকল্পিত পদক্ষেপ। যা বিদেশী অতি গরমে অভ্যস্ত নয়, অতি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হাজীগণকে নিরাপত্তার অজুহাতে এ রকম অমানবিক ব্যারিকেড অগ্রহণযোগ্য, অমানবিক। মাত্র ৫/৭ বর্গ মিটারের মিনা। ৬০/৭০ শতাংশ এরিয়ায় তাঁবু রয়েছে। বাকী ৩০-৪০% এরিয়ায় উপরে তাঁবু, নিচে পানি ছিটানো, ঠান্ডা বাতাসের ব্যবস্থা করা এ আধুনিক যুগে কঠিন কিছু নয়। তা না করে ৫০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় অতি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হাজীগণের প্রতি নিরাপত্তার অজুহাতে জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড দিয়ে নির্মম আচরণ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল হজের আগে নিরাপত্তা নামে ব্যারিকেড বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিদেশী হজযাত্রীগণের সহনীয় ক্ষমতা কতটুকু তা ভাবা। আগেই উল্লেখ করেছি, হেজাজ ভিত্তিক জজিরাতুল আরব মরুভূমি অঞ্চল। এখানকার আবহাওয়া পরিবেশের সাথে ঐ অঞ্চলের বাসিন্দারা জন্ম থেকে অভ্যস্ত। দ্বিতীয়ত তাদের পারিবারিক গঠনও বড়, সক্ষমতাও অনেক বেশি। হয়ত বিদেশী ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হাজীরা যে ব্যারিকেড সহ্য করতে পারবে না তা তাদের বুঝে আসেনি। গত স্বাভাবিক হজে অস্বাভাবিক মৃত্যুর অন্যতম কারণ ব্যারিকেড বলে মনে করি। মসজিদুল হারমে নামাজ পড়তে যেতেই ব্যারিকেড। মসজিদুল হারমের চর্তুদিকে চত্বর, চত্বরের বাহিরে পয়েন্টে পয়েন্টে ব্যারিকেড মসজিদুল হারমের ধারণ ক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেলে যাতে আর যেতে না পারে। বিশ্বের ২ শত কোটির মত মুসলমান। মাত্র ১৮ লাখ নর-নারী হজ করতেছেন। তৎমধ্যে সৌদি আরবের অভ্যন্তর ভাগ বাদ দিলে হয়ত ১০/১২ লাখ মানুষ মসজিদুল হারমে আসতেছেন নামাজ পড়তে। যেখানে ২ শত কোটি মুসলমানের বাস বিশ্বে সেখানে ১ কোটি নর-নারীর ধারণ ক্ষমতার পরিকল্পনা নিয়ে মসজিদুল হারমের সম্প্রসারণের কাজ শুরু করে দিতে হবে। সাথে তাওয়াফের জন্য মাতাফও। কিন্তু সম্প্রসারণের কোন খবর নেই। ব্যারিকেডই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। শতকরা ৮০/৯০ জন হজযাত্রী সৌদি ব্যবস্থাপনার উপর খুশি বলে মনে করি না। সৌদি কর্তৃপক্ষকে অনুধাবন করতে হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হজযাত্রীদের শারীরিক সক্ষমতা কতটুকু এবং তারা কি চায়, কি করলে তাদের মানসিক প্রশান্তি লাভ করবে। মসজিদুল হারমের চত্বরের চারিদিকে ব্যারিকেড নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষকে দ্রæত ভাবতে হবে। হজ বা ওমরাহ উপলক্ষে পবিত্র মক্কায় অবস্থান করবে কিন্তু ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে মসজিদুল হারমে যেতে পারবে না তা হয় না।

 

শুধু ওমরাহ এর এহরাম থাকলে মাতাফে যেতে পারবে না হয় সাধারণ পোষাকে তাওয়াফ করতে মাতাফে যেতে পারবে না হয় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষের উচিত হবে জমজম টাওয়ার তথা ক্লক টাওয়ার হোটেলসমূহ শরীকা মক্কা তথা মক্কা হোটেল ভেঙ্গে দ্রুততার সাথে সংস্কার করা মনে করি। সাথে মাতাফও। এহরামবিহীন নফল তাওয়াফ করতে যেতে না পারা, মসজিদুল হারমে যেতে ব্যারিকেডের সম্মুখীন হওয়া ইহা সৌদি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা লজ্জার ব্যাপার। উক্ত সব প্রতিকূলে অযৌক্তিক এর পরও তিনটি বড় বড় কল্যাণকর কাজ রয়েছে। যা স্বীকার করতে হবে। ১) হজ, ওমরাহকারীর নিরাপত্তা, ২) লাখ লাখ হজ, ওমরাহ, যেয়ারতকারী অবস্থান করার পরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ৩) বাদশাহ ফাহাদের আমল থেকে দুই হারমে হাত বাড়ালেই জমজমের পানি খেতে পারা। উক্ত যাবতীয় কিছু সৌদি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে, দ্রুত নিতে হবে সিদ্ধান্ত।

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট