চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২০ ডিসেম্বর, ২০২২ | ৯:২৫ অপরাহ্ণ

গুনাহ বর্জনেই মিলবে ইবাদতের স্বাদ

আল্লাহপাক জিন এবং ইনসান সৃষ্টি করেছেন একমাত্র ইবাদতের জন্য। অর্থাৎ আল্লাহপাকের গোলামী করার জন্য। আল্লাহপাকের হুকুমমতো সারাজীবন কাটানোর নামই ইবাদত। এজন্য সুরা ফাতিহায় আমার বলি, ইয়াকানা বুদু। তোমারাই ইবাদত করি। যে গোলাম হয় মনিবের ইচ্ছা ছাড়া কিছু করতে পারে না। গোলামের কোন ইচ্ছা থাকে না। মনিবের যেটা ইচ্ছা, সেটা গোলামেরও ইচ্ছা। ‘ইবাদত’ আরবী শব্দ হলেও সকল ভাষাভাষী মুসলিমের কাছেই এটি পরিচিত। আল কোরআনে এ শব্দটি বিভিন্নভাবে এসেছে ২৭৬ বার । আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে চলার নামই ইবাদত।

আল কোরআনে বলা হয়েছে “হে সকল মানুষেরা, তোমার আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা মোত্তাকি হতে পার”। আল্লাহপাক আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাই আমরা তাঁর ইবাদত করি। আমাদের বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন। তবে গুরুত্বপর্ণ হলো ইবাদত। আমাদের সৃষ্টি করার একটি উদ্দেশ্য হলে দুনিয়া আবাদ করা। আদম (আ)-কে আল্লাহপাক সৃষ্টি করে ইবাদতের পাশাপাশি দুনিয়া আবাদ করার নির্দেশ দেন। দুনিয়া আবাদের জন্য চাষাবাদ, গাছপালা লাগানো, বাগান, ফসল উৎপাদন করতে হয়। দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে মানুষ। দুনিয়ার কাজ-কর্ম না করলে আপনাকে কবরে, কেয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে না। কিন্তু নামাজ না পড়লে রোজা না রাখলে প্রশ্নের সমুক্ষিন হতে হবে।

কাফেরদের আল্লাহপাক জিজ্ঞেস করবেন তোমরা আজ জাহান্নামে কেন? তখন তারা উত্তর দিবে, আমারা দুনিয়াতে নামাজ পড়তাম না। মিসকিনদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করতাম না। প্রত্যেক মানুষকে তার আমল নিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ দেখবেন কে নিষ্ঠার সাথে আমল করেছে। কেয়ামতের দিন দেখবে আপনার আমল কিভাবে হয়েছে। আল্লাহকে সন্ত্তুষ্টির জন্য করেছেন কি না? বান্দাকে তোষামোদ করার জন্য করেছেন। সে অনুযায়ী ফলাফল এবং ফয়সালা হবে।

আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে মানুষের প্রশান্তি তৈরী হয়। কেউ ৪০দিন ইখলাস নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর সন্ত্তুষ্টির জন্য ইবাদত করলে অবশ্যই আল্লাহপাক তাঁর অন্তরের মধ্যে বিভিন্ন প্রজ্ঞা প্রদান করবেন। ৪০ দিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায় করলে আল্লাহপাক দুটি সার্টফিকেট দিবেন একটি হলো- তার মধ্যে মুনাফেকি নেই, দুই- জাহান্নামের আগুন থেকে তিনি মুক্ত। দ্বীনের স্বাদ আল্লাহপাক প্রদান করবেন।
মহানবী বলেছেন, তোমরা তোমাদের চোখকে ইবাদতের অংশ বানিয়ে নাও। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, চোখের কি ইবাদত হতে পারে? কোরআন দেখে দেখে তেলওয়াত করলে চোখের ইবাদত হয়। মুখস্ত থেকে দেখে দেখে পড়লে দ্বিগুণ সওয়াব। চোখ দিয়ে কাবা দেখা, মা-বাবার চেহারা দেখাও ইবাদত। কিন্তু ইবাদতের স্বাদ পেতে হলে আগে গুনাহ বর্জন করতে হবে। গুনাহ বর্জনেই মিলবে ইবাদতের স্বাদ। গুনাহ বর্জিত অবস্থায় নামাজ, রোজা, জিকির, কোরাআন তেলওয়াত, দান-সদকা, সংসার, সামাজিক কাজে সবকিছুর মধ্যে শান্তি পাবেন। গুনাহর মধ্যে থাকলে যে সব সওয়াব অর্জন করছেন তা মুছে যাচ্ছে।

মহানবী মুহাম্মদ (সা) বলেন, হে ইমানদার তোমরা নিজেদের জাহান্নাম, থেকে বাঁচাও। তোমার গুনাহ বর্জন কর। ইবাদত করতে হবে এমনভাবে যেন আপনি আল্লাহকে দেখছেন। সেই ধারণা তৈরী করতে না পারলে আল্লাহ আপনাকে দেখছেন সেই ধারণা অন্তরে তৈরী করতে হবে। আমরা আল্লাহকে দেখছি আল্লাহর নেয়ামতের মাধ্যমে। চাঁদ, সূর্য , রাত-দিন প্রমাণ করে পৃথিবীর একজন মাবুদ আছেন। রাত-দিন এর পরিবর্তনে আল্লাহপাক এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা এমন কোন সত্বা আর পৃথিবীতে নেই, যিনি রাতকে বিদায় করে দিন আনতে পারেন। সূর্যকে বিদায় করে চাঁদ-তারকা আনতে পারেন।

আল্লাহপাক কোরআনে বলেন, যারা বুদ্ধিমান, জ্ঞানী তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে মহান রাব্বুল আলামিনের প্রত্যেকটি কাজের মধ্যে। সাধারণ মানুষ ইবাদত করে পরকালের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য। কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেন জান্নাত প্রদান করেন। অর্থাৎ সওয়াবের মহব্বতে মানুষ ইবাদত করে। এটা সাধারণ মানুষের স্তর। ইবাদত করতে করতে যারা আরো উপরে চলে যায় তারা ইবাদতের মহব্বতে ইবাদত করে। আরো উপরে যারা তারা আল্লাহর মহব্বতে ইবাদত করে। এই ইবাদতে সওয়াব বেশি। ইখলাস বেশি পাওয়া যায়। সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হলো নিয়মিত করা। নিয়মিত কাজ আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন। উত্তম আমল হলো সেই আমল যেটা নিয়মিত হবে।

মহানবী মেরাজে গেলেন। সেখানে বেলালের পায়ের আওয়াজ পেলেন । এসে বেলালকে জিজ্ঞেস করলেন, বেলাল তোমার কি আমল আছে, যে আমলের কারণে জান্নাতে তোমার হাঁটার আওয়াজ পেলাম। তখন বেলাল বললেন, সেই রকম কোন বিশেষ আমল আমার নেই। তবে আমি একটি আমল নিয়মিত করি। সেটা হলো-যখন আমি অজু করি তখন ২ রাকায়াত তাহিয়াতুল অজুর নামাজ পড়ার জন্য চেষ্টা করি। এই অজুর নামাজের কারণে তোমার মর্যাদা আল্লাহ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

ইবাদত হলো সম্মানের শেষ প্রান্ত। মাথা ঝুঁকে দেয়া। সুতরাং এটা এমন সত্বার জন্য হতে পারবে, যেনি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত আপনাকে দেবেন। প্রথম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো আমি –আপনি দুনিয়াতে আসা। দ্বিতীয়- বেঁচে থাকার জন্য নানা উপকরনের ব্যবস্থা করা। চূড়ান্ত নেয়ামত একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন। তাবে চূড়ান্ত ইবাদত আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য হতে পারে না। যিনি আসমানকে স্তম্ভ বিহীন রাখতে পারেন। সূর্যকে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় রাখতে পারেন। সেই ক্ষমতা একমাত্র আছে আল্লাহর। সেই কারণে ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। তিনি আপনার অতীতে অবদান রেখেছেন, বর্তমানে রাখছেন ভবিষ্যত এমনকি পরকালেও রাখবেন। আমরা নিঃস্ব অবস্থায় ছিলাম। সেখান থেকে দুনিয়ায় এলাম। বাঁচার জন্য আলো, অন্ধকার, পানি প্রয়োজনীয় খাবার–দাবার রিযিক সব কিছুর ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি।

যতবড় জ্ঞানী হোক তাঁর জ্ঞানের সীমা আছে। আল্লাহর জ্ঞানের কোন সীমা নেই। কোরআনে আল্লাহপাক বলেন, নবী-রাসূল থেকে সবাই ততটুকু জানেন, যতটুকু আল্লাহ জানিয়ে দেন। এর বাইরে কেউ আর কোন কিছু জানেন না। পরকালে তিনি প্রতিদান দিবেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই ন্যায় বিচার আর কারো ক্ষমতার মধ্যে নেই। কেয়ামত, বিচার দিবসের একমাত্র মালিক আল্লাহ। কোরআনে বলা আছে- “হে দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর ইবাদত কর। আল্লাহর সাথে কাউকে ইবাদতে শরীক করো না। এবং তোমার মা-বাবার জন্য সেবা করে যাও। মা-বাবার হক আদায় কর আল্লাহর হকের সাথে”।

ইবাদত হবে একমাত্র আল্লাহর, পদ্ধতি হবে মহানবীর। সে কারণে বলা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই। মুহ্ম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। মহানবী যে পদ্ধতিতে আমাদের ইবাদত করতে বলেন নাই। সে পদ্ধতিতে ইবাদত করার নাম বিদআত। সেই ইবাদতে কোন সওয়াব নেই্ । কালেমার মর্মার্থ হলো সেটা। মা-বাবার সেবা প্রত্যেক সন্তানকে করতে হয় । যদিও তারা কাফের কিংবা অমুসলিম হয়। কোরআন, সুন্নাহ ইমানের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করা যাবে না, তবে তাদের সেবা করতে বাধ্য ।

আল্লাহপাকে বলেন, তোমাদের কাছে রিযিক চাই না। রিযিক আমি তোমাদের কাছে পৌঁছাব। মানুষের জীবনে দরকারি সব কিছুই রিযিক। অন্ন. বস্ত্র, বাসস্থান থেকে শুরু করে সব কিছুই রিযিক। রিযিক দেয়ার মালিক আল্লাহ। যাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দিবেন। প্রশস্ত করে দিবেন। সংকীর্ণ করে দিবেন। দুইজনকে দুই অবস্থায় পরীক্ষা নিচ্ছেন। বাড়ানোর কারণে শোকরিয়া আদায়, কমানোর কারনে সবর করেছে কিনা? মুছা (আ) কারুনকে জাকাত দিতে বললে অহংকার করেন। নিজে সম্পদ অর্জন করার বড়াই করেন। পরে ধ্বংস হয় তার সম্পদ, কোন কাজে আসেনি। সোলায়মান (আ) বাদশা ছিলেন। বাতাস তাঁর কথা শুনতো। জিনরা কথা শুনতো। পাখিরাও তাঁর কথা শুনতো। তাঁর সিংহাসন বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যেত উড়োজাহজের মতো। আল্লাহপাকের শোকরিয়া আদায় করেন।

আল্লাহপাক বলেন, আমার শোকরিয়া আদায় কর। অহংকার করবে না । গরীব দু:খীদের ছোট ভাববে না। তাদের উপর আল্লাহ রাজী হয়ে যাবেন। গরীবদের জন্য উপহার রয়েছে জান্নাতে দামি পোশাক। দুনিয়ায় অর্থের অভাবে পরতে পারেনি। অলংকার কিনতে পারেনি। জান্নাতে পাবে অলংকারের পোশাক। এটা দুনিয়ার বদলা প্রতিদান। এটা চিরকালের জিন্দেগি শুরু আছে শেষ নেই। দুনিয়ারটা রুহর সাথে সাথে শেষ। অন্যরা মালিক হবে সব কিছুর।

আল্লাহ দুনিয়াতে বেশি সম্পদ দিয়ে যেমনি পরীক্ষা নেন তেমনি কম সম্পদ দিয়েও পরীক্ষা নেন। বেশিওয়ালা অহংকার করে কিনা? কমওয়ালা ধৈর্যধারণ করে কিনা? শোকরের কারণে ধনী ব্যাক্তি জান্নাতি, সবরের কারণে গরীব ব্যাক্তিও জান্নাতি। তবে সব ধনীর ৫০০ বছর আগে গরীব জান্নাত পাবেন। সবার জন্য লাভ।

আল্লাহপাকের নির্দেশ মানলে এমন প্রতিদান দিবেন –যেটা কখনো চোখ দেখিনি, কোন কান নেয়ামতের কথা শুনেনি। কোন মানুষ কোনদিন যা কল্পনাও করতে পারেনি। নেকা বান্দা-বান্দিদের জন্য তৈরী আছে এমন সব নেয়ামত সমূহ। আল্লাহপাক আমাদের সকলকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন ।

লেখক: ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/মামুন/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট