চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১১ নভেম্বর, ২০২০ | ৯:৫৩ অপরাহ্ণ

মো. আজিজুল মওলা

ভ্রমণ ডায়েরি

দেশ-বিদেশের ফকির-মিসকিন

শিরোনাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আজকের এই পর্বে ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে লিখছি। আমাদের নিজেদের  মনে হতে পারে ইউরোপে কোন গরীব মানুষ বা ফকির, মিসকিন নাই। এধারণাটি সঠিক  নয়। এখানেও আপনি ফকির, মিসকিন, ভবগুরে খুঁজে পাবেন। তবে সুইডিশ, ডেনিস, ডাচ, জার্মান কোন ফকির আমার চোখে কখনোই পড়েনি।
মালমো সেন্ট্রাল স্টেশন এর কাছে আমাদের ইউনিভার্সিটি। একদিন বিকালে ক্লাস শেষ করে সেন্ট্রাল স্টেশন এর কাছে শতাব্দি পুরাতন ব্রিজটির উপর দাঁড়িয়ে দূরে এক পিতা-পুত্রের মাছ ধরার দৃশ্য দেখছিলাম। সামনে একটু অগ্রসর হতে গিয়ে পায়ের কাছে দেখলাম দু’টি ২০, আরেকটি ৫ ক্রোনার এর নোট। সর্বমোট ৪৫ ক্রোনার; বাংলাদেশি টাকায় ৪৫০ টাকার মতো। নোটগুলো হাতে নিয়ে আমার চারপাশ দেখলাম কোন ফকির মিসকিন দেখা যায় কিনা। কাউকে চোখে পরলো না। আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটি পার্কের কাছে চলে আসলাম। পার্কের গেইটে এক বৃদ্ধকে দেখলাম একটা কাপড় বিছিয়ে হাতে একটি ছোট টিনের বাটি নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, মনে হয় দুপুরে খাওয়া হয়নি। বৃদ্ধ লোকটির কাছে গেলাম, বেশভূষা দেখে বুঝে ফেললাম, রোমানিয়া থেকে এসেছে। তবে লোকটির চোখের চাহনি আমাকে আর একটু দাঁড়াতে বাধ্য করলো। ৪৫ ক্রোনার নোটের সাথে আমি আরো ৫ ক্রোনার নোট যোগ করে সর্বমোট ৫০ ক্রোনার লোকটির হাতে ধরিয়ে দিলাম। লোকটি টাকাটি হাতে নিয়ে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল আর বিড়বিড় করে কি যেন বললো আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে ওর চোখের ভাষা দেখে যা বুঝলাম তা হল, এখানকার মানুষ সচরাচর ১, ২, ৫, ১০ ক্রোনার ভিক্ষা হিসাবে দান করে, ৫০ ক্রোনার দেয় না। অপ্রত্যাশিতভাবে টাকাটি পাওয়ায় মনে হয় সে আমাকে অন্তর থেকে দোয়া করছে।
সুইডেনে আসার পর প্রথম প্রথম মাথায় কাপড় দেওয়া খুব শালীন পোশাকে কিছু শিশু-কিশোর ও মহিলা আমার চোখে পড়ত। বিভিন্ন শপিং মলের সামনে  অতীব শালীন মহিলাদের মত, এসকল মহিলারা মাথায় হিজাব পড়ে সাহায্যের আহ্বান করত। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্য যখন কোন উপায় থাকেনা তখন সে ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে পড়ে বা সাহায্যের জন্য হাত পাতে মানুষের কাছে। তাদের বেশভূষা দেখলে স্বাভাবিকভাবে যে কারো মনে হতে পারে তারা মুসলিম পরিবারের সদস্য যারা সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে এসেছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পশ্চাদগামী দেশের নাগরিকদের দুর্দশা এদেশে দেখতে পেয়ে আপনি স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতি একটু হলেও সদয় হবেন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।  মাঝে মাঝে তাদেরকে যতটুক পারি সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। মানুষের কাছ থেকে অধিক করুনা পাওয়ার জন্য তারা তাদের বেশভূষা পরিবর্তন এনেছে। ওরা জাতিতে রোমানিয়ান, এই দেশে এসেছে ভিক্ষা করতে; একটাই তাদের অন্যতম কাজ। এই তথ্যটি জানার পরে মনে মনে চিন্তা করতেছি, যাদের সত্যিকার অর্থে আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন, তারা তো ওদের কারণে সাহায্য পাবে না। এই ধারণা থেকেই আমি নিজ থেকে তাদেরকে ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।
যাহোক সাপ্তাহিক ছুটিতে মালমো থেকে কোপেনহেগেন যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে হিলি বর্ডারে আসলাম। এখানে একটি বিখ্যাত ও দৃষ্টিনন্দন শপিংমল রয়েছে-নাম Emporia; বিদেশী শত শত ব্র্যান্ডের শো-রুমের সমাহার। ভ্রমণে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে আমার ভালো লাগে কিন্তু গত দুদিন ধরে হেডফোনটি কাজ না করাতে, Emporia তে আসলাম একটি ভালো হেডফোন কিনব বলে। বিশাল শপিং মল। হেডফোনসহ আরো কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করে, মার্কেট থেকে বের হতেই আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছিল। ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা চলে আসলাম Mcdonald’s এ। এসে দেখলাম কোন সিট খালি নাই। ফাস্টফুডের বিশ্ব বিখ্যাত এই চেইনশপ টির এক কোনায় কতগুলো মানুষকে দেখলাম গোল করে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে। একজন টাকা গুনছে আর একজন তার ঝোলা থেকে বের করে কয়েন গুনছে, আরেকজন কাগজে-কলমে কিছু লিখছে। তাদের মধ্যে একজনকে মনে হলো তাদের দলনেতা। বিষয়টি আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো। পরে জানলাম ওরা এসেছে রোমানিয়া থেকে সুইডেনে। ভিক্ষা করার জন্যই তাদের এদেশে আগমন। তাদের চেনার উপায় হলো তাদের পোশাকের কোনো একটি অংশ অবশ্যই গাড়ো নীল রঙের হবে। শুধুমাত্র ভিক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাদের এইদেশে আসা বিষয়টি আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো।
এ তো গেল আর্থিক সাহায্যের জন্য মানুষের কাছে হাত পাতার ঘটনা। আরেকটি ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করি, গত ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডের রটার্ডাম শহরে এসেছি বন্দর ব্যবস্থাপনার উপর প্রশিক্ষণ নিতে। শহরটি Mass নদীর তীরে অবস্থিত। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে একটি ইন্টারন্যাশনাল চেইন হোটেলে আবাসনের ব্যবস্থা করছে। বেশ পরিপাটি এবং গোছানো হোটেল। ইউরোপে প্রায় হোটেলেই একটি মিনিমাম  স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখে, এখানেও তাই। হোটেল রুম থেকে খুব সুন্দর করে শহরের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। বিকেলে হোটেল থেকে বের হয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটছি আমি আর আমার কোর্সমেট। প্রায় আধা ঘণ্টা আগে বৃষ্টি হওয়াতে এদিকে লোকজনের আনাগোনা কম। নদীর পাড়ে ছোট ছোট কদম দিয়ে হাঁটছি আর শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। হঠাৎ পিছন দিক দিয়ে একটি লোক আমাদেরকে ডাকলো, ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম লোকটি কিছু একটা বলতে চাইছে। আমার কোর্সমেটকে সে হাত বাড়িয়ে একটি কার্ড দিল, এটি আসলে হোটেলের চাবি;  মনে হয় পড়ে গিয়েছিল পকেট থেকে অসাবধানতার কারণে। কার্ডটি হাতে পেয়ে আমরা দুজনেই তাকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ধন্যবাদ দিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক শুধু “থ্যাংক ইউ” তে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আমাদের সাথে আরো কথা বলতে চাইলেন। আমরা আমাদের পরিচয় দিলাম, তিনি দিলেন তাঁর পরিচয় এবং সাথে আরো বেশি কিছু। তিনি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন, গত এক সপ্তাহ হল চাকরিতে যাচ্ছেন না।  পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছেনা। আপাতত একাকী দিনযাপন করছেন। তিনি আমাদের সাথে কিছু সময় কাটানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং তিনি তদনুযায়ী পেমেন্ট করতেও রাজি আছেন। আপনাদের সাথে আরেকটি কথা শেয়ার করি, সেটি হল ইউরোপে ঘণ্টা প্রতি মানুষের মজুরি প্রদান করা হয়। সে’টি যে কাজই হোক আপনার মেধা, যোগ্যতা এবং কাজ অনুযায়ী আপনাকে পারিশ্রমিক প্রদান করবে, যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান আপনাকে কাজে নিয়োজিত করবেন।
কাউকে সাহায্য করা বলতে আপনি কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিশেষ কে শুধু অর্থ দিয়ে সাহায্য করবেন বিষয়টি তা নয়। এই দেশগুলো ভ্রমণ না করলে হয়তো আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। বুঝলাম এই ভদ্রলোক একজন Time Beggar (সময় ভিখারি)। লোকটির প্রস্তাব শুনে আমরা কিছু সময়ের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। আমরা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করলাম। বললাম, রাজি আছি; তবে আপনাকে পেমেন্ট করতে হবে না। তিনি নাছোড় বান্দা। তিনি বললেন, “ঠিক আছে পেমেন্ট করব না, আমি তোমাদেরকে ডিনার  করাবো”। পরিশেষে তিনজনই হাঁটতে-হাঁটতে রটার্ডাম মেরিটাইম মিউজিয়াম ঘুরে দেখলাম। তাঁর সাথে আমাদের অনেক আলাপ আলোচনা হল। তাঁর অনেক পারিবারিক বিষয় আমাদের সাথে শেয়ার করলেন। আমাদের মতো ভদ্র শ্রোতা পেয়ে, মনে হয় ভদ্রলোকের চাপা পড়া দুঃখ খানিকটা হাল্কা হল। যাহোক, ঘন্টাখানেক পরে ঢুকে পড়লাম একটি লেবানিজ রেস্টুরেন্টে। ভদ্রলোক আমাদের ইচ্ছামত পেটপুরে খাওয়ালেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায়-সম্ভাষণ দিয়ে বিদায় নিলেন। অচেনা অজানা একজন বিদেশীকে কোন অর্থ সাহায্য না করেও, মানসিক সাহায্য করতে পারাতে আমাদের নিজেদের মধ্যে একটি আত্মতৃপ্তি আসলো ।
উন্নত দেশগুলোতে মানুষ খুব সুন্দর জীবন যাপন করেন আর খুবই সুখে শান্তিতে বসবাস করে। বিষয়টি আসলে সব সময় সে’ই রকম নয়। অনেকে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এইসমস্ত উন্নত দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার স্বপ্ন দেখেন। আমার কাছে মনে হয়েছে এখানে সুখ আছে কিন্তু শান্তি নাই সবার জন্য। এখানে আপনি পরিবারের সদস্যদের কে নিয়ে আসতে পারলে অথবা নিকটাত্মীয় বা দূরের কাছের বন্ধু-বান্ধবের পরিবার সহ বসবাস করতে পারলে, তাহলে আপনি হয়তো কিছুটা শান্তি খুঁজে পাবেন। আমরা বাংলাদেশীরা স্বাভাবিকভাবে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে পছন্দ করি এবং স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। কিন্তু এই সমস্ত উন্নত দেশে সবাই একত্রিত হয়ে বসবাস করার মত সেই সুখ এবং শান্তি পাবেন না। সবাই যার যার কাজকর্ম ও পৃথিবী নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কাউকে সময় দেওয়ার মত সময় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যেও আপনি অনেক ধরনের ফকির-মিসকিন চোখে দেখবেন। কিন্তু আমার কাছে তাদের মধ্যে একটি শ্রেণীকে একটু ভিন্ন ক্যাটাগরির মনে হল। তারা প্রায় প্রতি বছরই এই দেশগুলোতে আসেন। নিজেদের দেশের এতিমখানা, মসজিদ, বিদ্যালয় এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অথবা সংস্কার করার অর্থ জোগাড় করার জন্যই তাদের এখানে আসা। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আর্থিক খরচের বিবরণ ,বর্তমান অবস্থার কিছু ছবি সহ ইত্যাদি ইত্যাদি বর্ণনা দিয়ে একটি সুন্দর বাইন্ডিং করা বই, তারা টার্গেট করা ব্যক্তিবিশেষ বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে উপস্থাপন করে। তাদের বেশভূষা আর চলাফেরা দেখে বোঝার উপায় নেই, তারা অর্থ সাহায্যের জন্য এই দেশে এসেছেন। উদ্দেশ্য সফল হলে, নিজ দেশে ফেরত আসেন। দেশে ফিরেই প্রকল্পের কাজে হাত দেন এবং  সাথে নিজের নামটিও জুড়িয়ে দেন। দামি গাড়িতে চলাফেরা করেন, এলাকায় মাছ, পশু-পাখির খামার গড়ে তুলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তি বা দানবিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মাঝখান দিয়ে তিনি মিডলম্যান হিসেবে আর্থিক ভাবে বড় অংকের লাভবান হন। গত বছর অক্টোবরে সেই রকমেরই কয়েকজন কে দেখেছিলাম, দুবাইয়ের শেখ জায়েদ রোডে গ্রান্ড এমিরেটস হোটেল এর লবিতে। বর্তমানে আমাদের দেশ বহির্বিশ্বে একটি সম্ভাবনাময় অবস্থানের জন্য সুনাম অর্জন করলেও  মূলত তাদের কারণেই আরব দেশগুলোতে সেদেশের নাগরিকরা আমাদেরকে নিম্ন পশ্চাদগামী দেশ হিসেবে দেখছে এখনও। বিষয়টি আমাদের জন্য অমর্যাদাকর।
আবার, বিদেশিরা যখন আমাদের দেশে আসেন, তখন তারাও আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাদের দেশে ফেরেন। বিশেষ করে ট্রাফিক সিগনালে যখন কোন গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, তখন একদল ভিক্ষুক গাড়িতে ভিক্ষার জন্য এগিয়ে আসে। এই বিষয়টি আমরা স্বাভাবিকভাবে হয়তো নিলেও বিদেশীরা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। আমাদের দেশ সম্পর্কে তাদের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। ফলে আমরা বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের রাজধানীসহ বিভাগীয় শহর গুলো ভিক্ষুক মুক্ত করার অনেক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ফলপ্রসূ তেমন ফলাফল দেখা যায়নি। অন্তত এই শহরগুলো ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য তাদেরকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অথবা অন্যত্র কাজের অনুসন্ধানের জন্য সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে অন্যথায় তাদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায়  আনতে হবে।
এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

লেখক পরিচিতি :
উপ-সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 106 People

সম্পর্কিত পোস্ট