চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২০

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খৈয়াছড়ায় একদিন

২৬ জুলাই, ২০২০ | ১২:৩৪ অপরাহ্ণ

চৌধুরী আনোয়ারুল আজিম

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খৈয়াছড়ায় একদিন

করোনাময় দুঃসংবাদে যখন আমরা রীতিমত হতাশার অনলে পুড়ছি, আর শুনতে ইচ্ছে করছে না আপনজন হারানোর খবর, সেই পরিস্থিতি থেকে কিছু মূহূর্ত দূরে থাকতেই ঘর থেকে দুই পা ফেলানোর সিদ্ধান্ত।

ভ্রমণ পিপাসু, প্রকৃতি প্রেমিক বিশেষ করে যারা ঝর্ণার প্রেমে মাতোয়ারা তাদের জন্য অন্যতম আলোচিত, মায়াবী ও মোহনীয় জলপ্রপাত হচ্ছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা।

আমাদের যাওয়ার লক্ষ্য ছিল থানচি আলীকদমে বাইক ট্যুর। অতিবৃষ্টির কারনে পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খৈয়াছড়া ঝর্ণায় অবগাহনের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত নিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বাংলাদেশীয়ান টিমের এডমিন নীল জামশেদ। টিমের অন্যান্য সদস্যরা হলেন অভ্র ম. মোরশেদ, আবদুল্লাহ আল হারুন, সাঈদ খান আরজু, নয়ন মোরশেদুর রহমান, মো. ইমরান হোসাইন ও আমি চৌধুরী আনোয়ারুল আজিম।

চট্রগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। সকাল ০৭ টায় বাইক নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই কর্ণফুলী ব্রিজ সংলগ্ন মইজ্জারটেকে অবস্থান নেই। সেখানে আগে থেকেই আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষমান নয়ন ভাই। সবাই দেরি না করে আরজু ভাইয়ের সৌজন্যে পাওয়া আলীশান হাইচ (মাইক্রো) তে উঠে পড়লাম। সবাই আমাকে মুরব্বি ভেবে সামনে বসার অনুরোধ করলে সহজেই সেই সুযোগটি লুফে নিই এবং যথারীতি ঝর্ণার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি।

সীতাকুণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছে আমরা ক্ষনিকের জন্য যাত্রা বিরতি দিয়ে ট্যুরের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করি এবং আনুমানিক ১ ঘন্টা সময়ের মধ্যেই ঝর্ণা থেকে আনুমানিক ৪ কিলোমিটার দূরত্বে আমরা গাড়ি পার্কিং করি। সেখানেই পোশাক চেঞ্জ করে লাঠি হাতে পায়ে হেঁটে এক অজানা আশঙ্কায় যাত্রা শুরু করি।

অবস্থান : চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে আনুমানিক ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে এই জলপ্রপাতের অবস্থান। ৯ টি ধাপ বা ক্যাসকেড নিয়েই এই ঝর্না আবিষ্কৃত হয়। অনুমান করা হয় বিগত ৫০ বছর ধরে এই জলপ্রপাতের বহমান ধারা অব্যাহত।
নামকরণ : খৈয়াছড়া ইউনিয়নে এই জলপ্রপাতের অবস্থান হওয়ায় এটির নাম খৈয়াছড়া ঝর্ণা।
যোগাযোগ ব্যবস্থা : বাংলাদেশের যে কোন জেলা থেকে সহজেই আসা যায়। মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া বাজারে নেমে সেখান থেকে সি এন জি যোগে আনুমানিক দুই কিলোমিটার গিয়ে আপনাকে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে ঝর্ণার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। পাহাড়ের অনেক গভীরে হওয়ায় আপনাকে ট্রেকিং করেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খৈয়াছড়ায় একদিন

যৌবনভরা ঝর্ণার মোহনীয়, উজ্জ্বল, উছ্বাস ও তেজোদীপ্ত রূপ দেখতে চাইলে এখনই উপযুক্ত সময়। তবে হ্যাঁ, হুজুগে আসা যাবেনা। হার্ড ট্রেকিং করার প্রচন্ড সাহস ও কৌশল জানতে হবে নতুবা যে পিচ্ছিল ও উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে।
অনেকগুলো গ্রুপ এসেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। পথি মধ্যে আমাদের সাথে দেখা ও কথাও হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ধাপে পৌঁছতেই পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি শুধু আমাদের টিমের সদস্যরা রয়েছে বাকিরা উধাও। সেখানে ইচ্ছে মতো ঝর্ণার প্রেমে মশগুল থেকে ও ফটোসেশন পর্ব শেষ করে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুতি নেই।

দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে ক্লান্ত অবসন্ন ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে জয়নাল আবেদিন হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট আগে থেকেই তৈরি করা খাবারে হামলিয়ে পড়ি। ক্ষুধার্ত বাঘ শিকারী পাওয়ার মতোই সমতুল্য। হারুন ভাইয়ের সৌজন্যে এই খাবার ছিল আমার ট্রেকিং লাইফের সেরা খাবার। নিজ হাতেই দেশী মুরগী জবাই করা,গরুর মাংস,আলু ভর্তা ও ডাল দিয়ে সেরা লাঞ্চ হলো।

ট্রাভেলিং কালে উল্লেখযোগ্য কিছু মজার স্মৃতি রচনা করে ইতিহাসের ইতি টানছি। ট্রেকিং শুরু হওয়ার পর নয়ন ভাই ও আরজু ভাই যখন হাঁপিয়ে উঠছিলেন তখনই মোরশেদ ভাইয়ের আঞ্চলিক গান ও কোমড় দুলিয়ে নৃত্য পরিবেশন মূহুর্তেই ওনারা সাহসী হয়ে উঠলেন। জামশেদ ভাইয়ের অতর্কিত পানি ডুবে যাওয়ার মূহূর্ত ক্ষনিকের জন্য বিচলিত হলেও আনন্দ কিন্তু কম পাইনি। হারুন ভাইয়ের ঘন ঘন স্লিপ করে পড়ে আহত হওয়ার দৃশ্য সাময়িক আমাদের আনন্দ দিলেও উনার জন্য ছিল বেদনাবিধুর। শেষপর্যন্ত উনি ট্রেকিং বাদ দিয়ে বিরল প্রজাতির বৃক্ষরাজি সন্ধানে মনোযোগী হলেন।

টিমের সকলের প্রতি অজস্র ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আশাকরি ভবিষ্যতেও সব ট্যুরে একই ধারার ভালবাসা চলমান থাকবে ইনশাআল্লাহ।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 362 People

সম্পর্কিত পোস্ট