চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৭ মে, ২০১৯ | ৩:৫৬ অপরাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বে সাড়া জাগানো বাংলাদেশের ‘জাদুকরী চাকমা ‘ মনিকা

সবুজ মাঠে লাল সবুজ জার্সি গায়ে ছুটছেন এক বাংলাদেশী ফুটবলার। ঘাড়ে তার অনেক নিন্দার বোঝা। ফাঁকা পোস্টেও গোল করতে পারেন না বাংলাদেশের ফুটবলাররা , মাঠে নামলে বল দেখতে পান না তারা এমনই আরও কত কী! কিন্তু ছুটতে থাকা এই মিডফিল্ডার যেন মহাভারতের অর্জুন। গোলপোস্ট ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না তার। দূর্ধর্ষ এক গোলে তাই দেশের নাম পৌঁছে দিলেন বিশ্ব ফুটবলের দরবারে।

অনূর্ধ্ব-১৯ বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচে চোখ ধাঁধানো গোলটি করেছিলেন বাংলাদেশের মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা।

নিজের হেড থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রেখে বাঁ পায়ে করা মনিকার গোলটি এখন দেশ পেরিয়ে বিশ্বের কোটি ফুটবল ভক্তের নজরে। মনিকার করা গোলটি জায়গা করে নিয়েছে ফিফার ভক্তদের পছন্দের তালিকায়। প্রতি সপ্তাহে সারা বিশ্বের ফুটবল ভক্তদের কাছ থেকে ফুটবলের সেরা গোল বা মাঠের সেরা মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও বা অন্যান্য পছন্দের বিষয় চেয়ে থাকে ফিফা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা নিজেদের পছন্দের কন্টেন্টগুলো হ্যাশট্যাগ (#WeLiveFootball) এর মাধ্যমে ফিফার কাছে পাঠায় ভক্তরা। প্রতি সপ্তাহে ভক্তদের পাঠানো ভিডিও, ছবি থেকে বাছাই করা সেরা পাঁচটি কনটেন্ট নিয়ে ‘ফ্যানস ফেভারিট’ প্রকাশ করে ফিফা। এবারের সপ্তাহে ফিফার এই ক্যাটাগরিতে প্রকাশ পাওয়া পাঁচটি সেরা ঘটনার একটি বাংলাদেশের মেয়ে মনিকার করা বিস্ময়কর গোলটি। ফিফা এখন মনিকাকে সম্বোধন করেছে ‘ম্যাজিকাল চাকমা’ নামে। জাদুকরের মতোই যে গোলটি করেছেন মনিকা চাকমা!

প্রথমে একজনকে গতিতে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের নাম্বার সিক্স আরেক ডিফেন্ডারের মাথার ওপর থেকে হেড করে বলটা নিজের সুবিধামতো জায়গায় নিয়েছেন মনিকা। বিপদ বুঝে তাঁকে থামানোর জন্য এগিয়ে এসেছিলেন প্রতিপক্ষ দুজন খেলোয়াড়। কিন্তু মনিকা তো অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা ! বাঁ পায়ের জোরালো ভলিতে পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে করা বল চলে গেল পোস্টের দুরূহ কোণে। প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক ঝাঁপ দিয়েও বলের নাগাল পাননি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘুরেঘুরে এসেছে একটি প্রশ্ন। ‘গোলটা কি বাংলাদেশের ফুটবলারের?’ ফেসবুকে একটি গোলের ভিডিও পোস্ট করে এমন ক্যাপশনে অনেক ফুটবল সমর্থকের লুকানো উচ্ছ্বাস, কিছুটা অবিশ্বাস আর একবুক গর্ব প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের এক মেয়ের পায়ে অমন গোল ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। শেষ পর্যন্ত এক বাংলাদেশির বদৌলতে ‘ফ্যানস ফেবারিট’-এর সৌজন্যে মনিকার গোলটি পৌঁছে গেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার দরবারে। শুধু তাই নয়, এবারের সপ্তাহে ‘ফ্যানস ফেবারিট’ ক্যাটাগরিতে প্রকাশ পাওয়া পাঁচটি সেরা ঘটনার একটি বাংলাদেশী এই মেয়ের গোল।

 

এত বড় অর্জন গোটা বাংলাদেশ ফুটবলের জন্যই দুর্দান্ত আনন্দের বার্তা। ফিফার মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের নারীদের ফুটবলের উন্নতির বার্তাই যেনো দিলো মনিকার এই গোল।

মনিকার বাড়ি খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীচরে। বাবা বিন্দু কুমার কৃষি কাজ করেন। মা রবি মালা গৃহিনী। ৫ কন্যার সবার ছোট মনিকা চাকমা রাঙ্গামাটির ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্রী। পরিবারের কারোরই সম্পৃক্ততা নেই ফুটবলে। বিন্দু কুমার ও রবি মালার কেউই চাননি তার কোনো মেয়ে ফুটবল খেলুক। খেললেও বকা দিতেন, বাধা দিতেন মনিকাকে। বাবা-মায়ের বাধা উপক্ষো করেই ফুটবল নিয়ে মাঠে ছুটতেন ছোট মেয়ে মনিকা। কৃষাণ বিন্দুর মেয়ে ফুটবলের সাফল্যের ফসল ফলিয়ে যাচ্ছেন লাল-সবুজ জার্সি গায়ে। ফুটবল মাঠ রাঙাচ্ছেন বাবার চোখ রাঙানি খাওয়া সেই মেয়ে মনিকা।

বাবা-মায়ের বাধার পরও কিভাবে ফুটবলার হলেন? ‘ফুটবল আমার অনেক ভালো লাগে। তাই বকা খেয়েও মাঠে গিয়েছি, ফুটবল খেলেছি। বাবা আমাকে খেলতেই দিতেন না। তারপরও চুরি করে মাঠে গিয়ে খেলতাম। তবে বির সেন স্যার আমাকে খেলার জন্য খুব উৎসাহ দিতেন। এখন তো ফুটবলই আমার সব’-রহস্যের ঝাঁপিটা খুলে দিলেন মনিকা।

২০১১ সালে বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টে ফুটবল খেলেছেন ময়মনসিংহের হয়ে। দুই বছর পর খেলেছেন নিজ স্কুলের জার্সি গায়ে। বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট থেকে উঠে আসা সেই মনিকাই এখন দেশের ফুটবলের অন্যতম বড় মুখ। বৃহস্পতিবার সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে ৩-০ ব্যবধানে হারানো ম্যাচের শেষ গোলটি মনিকার চাকমার। দারুণ গোল ছিল সেটি। শামসুন্নাহারের কাছ থেকে বল পেয়ে ঢুকে পড়েন ভারতের সীমানায়। দু’জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে কোনাকুনি শটে গোল। শুধু গোলই করেনি, খেলেছেনও দুর্দান্ত। এ টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচে ২ গোল। ম্যাচসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। প্রথম ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষেও ছিল মনিকার একটি গোল। ওই ম্যাচেরও সেরা ছিলেন রাঙ্গামাটির বিস্ময় এ কিশোরী।

এর আগেও আন্তর্জাতিক গোল রয়েছে অনূর্ধ্ব-১৫ নারী দলের এ সদস্যার। গত বছর তাজিকিস্তানে করেছেন দুটি গোল। একটি করেছেন থাইল্যান্ডে আরো বড় টুর্নামেন্টে। দেশে মণিকার পছন্দ জাতীয় দলের স্ট্রাইকার সাবিনা খাতুন। বিদেশে পর্তুগালের রোনালদো, আর্জেন্টিনার মেসি ও ব্রাজিলের মার্সেলো।

থাইল্যান্ডে এশিয়ান অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপেও দুর্দান্ত খেলেছিলেন এ ফরোয়ার্ড। ওই রকম ফুটবলই সব সময় খেলতে চান তিনি।

ভারতকে হারানোর পর ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ভালো খেলার প্রসঙ্গ উঠতেই লাজুক হাসি দিয়ে মনিকা বললেন, ‘আমি স্বাভাবিক খেলার চেষ্টা করি। আসলে খেলতে খেলতে বুঝতে পারি না কতটা ভালো খেলি।’

ভারতের বিপক্ষে মনিকা গোল করেছেন দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে। বল পাওয়ার পর কী মনে হয়েছিল তখন তার? জবাবে বললেন ‘আসলে আমি যখন বল নিয়ে এগিয়ে যাই তখন মনে হয়নি আমার আশপাশে কেউ আছে। কাউকে বিট করছি সেটাও মনে হয় না। আমি আমার মতো করেই বল নিয়ে ঢুকে পড়ে জালে পাঠিয়েছি’- পায়ে বল গেলে অন্য কিছু চোখেই পড়ে না মনিকার। এমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এমন অটল আত্মবিশ্বাসই তো মনিকাকে মানায়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 538 People

সম্পর্কিত পোস্ট