চট্টগ্রাম রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

১২ জুন, ২০২০ | ১:৪০ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

মায়ের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি

পৃথিবীতে মায়ের জন্য সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার দৃশ্য। বলা হয় সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালবাসা হচ্ছে মায়ের। মা তার সন্তানদের পরম যত্নে লালন-পালন করতে গিয়ে নিজের সর্বোচ্চ সুখটুকু বিসর্জন দিতে ও ভাবেন না। মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। তাই মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও সম্মানবোধ সবচেয়ে বেশি। শরিয়তসম্মত কোনো বিষয়ে মায়ের অবাধ্য হওয়া যায় না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি মানুষকে মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি, মা তাকে কষ্ট করে গর্ভ ধারণ করেছে এবং কষ্ট করে প্রসব করেছে, আর গর্ভ ও দুধপান ছাড়াতে সময় লাগে ত্রিশ মাস।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৫)।

মায়ের সঙ্গে কখনোই উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে না। মায়ের কষ্ট হয় এমন কিছু বললে সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। নতুবা ইহকাল ও পরকালে তা ব্যক্তির ধংস ডেকে আনবে। একদা রাসুল (সা.) মিম্বরে আরোহণ করেন। প্রথম সিঁড়িতে আরোহণকালে বললেন, আমিন। দ্বিতীয় সিঁড়িতে আরোহণের সময়ও বললেন, আমিন। অতঃপর তৃতীয় সিঁড়িতে আরোহণকালেও বললেন, আমিন। অতঃপর বললেন, ‘আমার কাছে জিবরাইল (আ.) এসেছিল। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘হে মুহাম্মদ, ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি যে রমজান পেয়েও ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়নি। আমি বললাম, আমিন। তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি যে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মাকে পেয়েও জান্নাত লাভে ব্যর্থ হয়। আমি বললাম, আমিন। ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি যার কাছে আপনার আলোচনা করা হলেও সে আপনার ওপর দরুদ পড়ে না। আমি বললাম, আমিন।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৫৪৫)

বিজ্ঞাপন

তরুণ সাহাবি আলকামা (রা.) অসুস্থ। অসুস্থতার মাত্রা তীব্র হলে তার স্ত্রী রাসুল (সা.)-এর কাছে কাউকে পাঠিয়ে জানাল, তার স্বামী আলকামা মৃত্যুশয্যায় আছেন। কালেমা শাহাদাতের তালকিনের জন্য রাসুল (সা.) আম্মার (রা.), বেলাল (রা.) ও সুহাইব (রা.)-কে পাঠালেন। মৃত্যুর সময় কালেমা পাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে কালেমা পাঠ করাকে ইসলামি শরিয়ার পরিভাষায় ‘তালকিন’ বলে। সাহাবিরা এসে আলকামা (রা.)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পান। কালেমার তালকিন শুরু করেন তারা। কিন্তু আলকামা (রা.) কালেমা পড়তে পারছিলেন না। হতাশ হয়ে সাহাবিরা রাসুল (সা.)-এর কাছে ফিরে তার দুরবস্থার কথা জানালেন।

তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তার বাবা-মায়ের কেউ কি জীবিত আছে?’ একজন বলল, হে আল্লাহর রাসুল, তার বয়স্ক মা আছেন। রাসুল (সা.) মায়ের কাছে কাউকে পাঠিয়ে বললেন, আপনি পারলে রাসুল (সা.)-এর কাছে আসেন। নতুবা একটু অপেক্ষা করুন, তিনি আপনার কাছে আসবেন। আলকামা (রা.)-এর মা বললেন, ‘আমার প্রাণ তার জন্য উৎসর্গ হোক। আমি-ই তার কাছে যাওয়ার অধিক উপযুক্ত।’

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধা লাঠিতে ভর করে রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে সালাম দেন। রাসুল (সা.) সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, ‘আলকামার মা, আপনি আমাকে সত্য কথা বলবেন। আপনি মিথ্যে বললে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে সত্য চলে আসবে। আচ্ছা, আপনার সন্তান আলকামার অবস্থা কেমন ছিল?’ তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সে অনেক বেশি নামাজ আদায় করত। রোজা রাখত। সদকা করত। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তার সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক ছিল?’ তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট। রাসুল (সা.) বললেন, আপনি অসন্তুষ্ট কেন? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সে নিজের স্ত্রীকে আমার ওপর প্রাধান্য দিত। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকলে আলকামার মুখে কখনো কালেমা আসবে না।’

অতঃপর রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে বেলাল, যাও, আমার জন্য কিছু লাকড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে আসো।’ আলকামার মা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি লাকড়ি দিয়ে কী করবেন? রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমরা আপনার সন্তানকে আগুনে পোড়াব।’ আলকামার মা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সে তো আমার সন্তান। তাকে আগুনে পোড়াতে দেখলে আমার অন্তর সইতে পারবে না। রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে আলকামার মা শুনুন, আল্লাহর আজাব তো আরও কঠিন ও স্থায়ী হবে। আর আখেরাতের আগুনের চেয়ে দুনিয়ার আগুন অনেক হালকা। তার জন্য আল্লাহর ক্ষমা আশা করার আগে আপনি তাকে ক্ষমা করুন। ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আপনি আলকামার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকলে নামাজ, রোজা ও সদকায় তার কোনো উপকার হবে না।’

একথা শুনে আলকামার মা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ ও তার ফেরেশতা এবং উপস্থিত মুসলিমদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমার সন্তান আলকামার প্রতি আমি সন্তুষ্ট। রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে বেলাল, গিয়ে দেখো, আলকামা কালেমা শাহাদাত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে পারছে কি না? নাকি আমাকে দেখে আলকামার মা লজ্জার কারণে অন্তরের কথা বলছে না।’ বেলাল (রা.) দৌড়ে গেলেন। আলকামা (রা.)-এর কালেমা পড়াও শুনলেন। এরপরই আলকামা (রা.) মৃত্যুবরণ করেন।

অতঃপর রাসুল (সা.) তাকে দেখতে আসেন। দাফনকার্য সম্পন্ন করে তার জানাজা পড়ান তিনি। কবর দেওয়ার পর বললেন, ‘হে আনসার ও মুহাজির সাহাবিরা, যে ব্যক্তি মায়ের ওপর স্ত্রীকে প্রাধান্য দেবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সব মানুষের অভিশম্পাত পড়বে। আল্লাহ তার নফল ও ফরজ কোনো আমল গ্রহণ করবেন না। সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তাওবা করে মায়ের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার ও সন্তুষ্টিদায়ক কাজ না করা পর্যন্ত এমনই থাকবে। তাই মা সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। মা অসন্তষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হোন।’ (বাইহাকি, হাদিস নম্বর : ৭৮৯২)

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 1031 People

সম্পর্কিত পোস্ট