চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বাংলা ভাষার গুরুত্ব ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভাষা-বৈচিত্র্য

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৮:২৩ অপরাহ্ণ

আজিজ কাজল

বাংলা ভাষার গুরুত্ব ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভাষা-বৈচিত্র্য

বাংলা ভাষা। অনাদরে অবহেলায় হাঁটতে হাঁটতে সাধারণ গণ-মানুষের এই ভাষা আজ রাষ্ট্রভাষা। ভাষাদেশ বাংলাদেশ। বাংলার নিজস্ব ব্যাকরণ এবং উচ্চারিত ভাষার কাছাকাছি না থাকায় অপপ্রয়োগের ফলে বর্ণ, শব্দ, বাক্য আর বানানে কিছু অমার্জনীয় ত্রুটি যেনো সবসময় থেকে যায়। যদিও একটু সচেতন আর চর্চা থাকলে এই সমস্যা থেকে অনেকটা মুক্ত থাকা যায়। এবার আসি বাংলা ভাষার ধ্বনি, উচ্চারণ, আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবসহ ব্যাকরণসম্মত বাংলার অন্তর্গত শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক দায় নিয়ে কিছু আলোচনায়।
শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে গেলে প্রথমত যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত; সেই ভাষার স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের ধ্বনিগত সাম্য। ঘোষ-অঘোষ। অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণ ইত্যাদি। মোটাদাগে বলতে হয়, কোন অঞ্চলের কথা বলার ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারিত ভাষার কতোটুকু কাছাকাছি। ছোটবেলার এই প্র্যাকটিস বড়ো বেলায় গিয়েও অনেকের সমস্যা থেকে যায়। দেখা যাচ্ছে, কোন বর্ণ বা শব্দ কেউ সঠিকভাবে স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। কিন্তু উচ্চারণে ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। অথবা উচ্চারণ করতে গিয়ে আঞ্চলিক টান রয়েই যাচ্ছে। ফলে উচ্চারণ ঠিক থাকলে বলাটা ঠিকভাবে হচ্ছে না। অথবা বলাটা ঠিকভাবে হলেও টিউনে সমস্যা থেকে যাচ্ছে। অঞ্চলভেদে কিছু কিছু জায়গায় এ সমস্যা অনেক বেশি।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কৃষিভিত্তিক দেশ। ভাটি বাংলার দেশ। জলা জংলার দেশ। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দেশ। ভাটি অঞ্চলের হওয়ায় বাংলার সাধারণ জনগণের কথাবার্তা টিউনে পরস্পর পরস্পরকে একটু আবেগ দিয়ে আদর করে ডাকার একটা সহজাত প্রবণতা আছে। এর সাথে কাজ করেছে আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ। নদী-পাহাড়-জলা-জংলা-পুকুর-দিঘি এবং সাধারণ মানুষের জীবনাচরণের বিশাল নৃতাত্ত্বিক ছাপ।

নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি সংকর জাতি। এবং জাতি হিসেবে চীন জার্মানদের মতো বস্তুগত নয়। ভাবগত। ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল মহাকাব্য যার অন্যতম চিহ্ন। বাঙালি, হাজার বছরের জীবনাচরণ, খাওয়া-দাওয়া-চলাফেরা-রুচি-অভ্যাসের ফল। এবং এর মধ্য দিয়েই জীবনাচরণের আবেগ থেকে, নানা প্রবণতায় ভাষাগত শৃঙ্খলায় পৌঁছেছে। ফলে বাংলা ভাষার প্রমিত রূপের উদাহরণ হিসেবে মোটাদাগে বাংলা সাহিত্যে এক জীবনানন্দ এর ‘রূপসী বাংলা’ কবিতা দিয়েই ভাটি বাংলার পুরো দেশটাকে কাভার করতে পারি। কেননা বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, শতো শতো নদ-নদী-খালবিল-হাওড়। এ নিয়ে আছে নানা মিথ। কিংবদন্তি। প্রাচীন নগরসহ লতা পাতা ফুল পাখির বিবিধ নামের বর্ণনাগুলো জীবনানন্দ এর কবিতার অংশ জুড়ে, কী এক বিস্ময় জড়িয়ে আছে! সুতরাং বলতেই হয় বাংলা ভাষার শক্তি আর ক্ষমতাকে জীবনানন্দ দাশ আরেকবার তার একটি সহজ কবিতা ‘রূপসী বাংলা’ এর (সৃজন ও মননের আরো শক্তিশালী কবিতাসহ) মধ্য দিয়েই অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কেননা এই কবিতার সহজ বাক্য। সহজ পঙ্ক্তি। সরল গতি। চিরচেনা শব্দ। একেবারে মাটিজাত বুনন। ফলে ইউরোপীয় পঞ্চপা-বদের মধ্যে অন্যতম এই প্রজ্ঞাবান কবি, উদাহরণ হিসেবে যথার্থ বলেই মনে হয়। তাছাড়া বাংলা চিরকাল সাধারণ মানুষের ভাষাই ছিলো। হিন্দুদের সময়ে সংস্কৃত। মুসলমানদের সময়ে ফার্সি। ইংরেজদের সময়ে ছিল ইংরেজি ভাষা। বাংলা ভাষা নানাভাবে এই বঙ্গে তার আধিপত্য থাকলেও বাংলা ঠিকই টিকে ছিলো বাংলার ধীবর, শুদ্র, ডোম, তাঁতী, কবিয়াল, শায়েরদের মাঝে। বাংলার হঁলা, পুঁথি, খনার বচন, জারি-সারি-ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া-মারেফত, লালনসহ ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম বিশাল ভা-ারের অমিত শক্তির মাঝে। বাংলা ভাষার ঐশ্বর্য এবং ভাষার উৎকর্ষকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় আরেক বিশাল উঁচুতায় নিয়ে গেছেন, রবীন্দ্রনাথ। হুমায়ুন আজাদ যেমন বলেন, বাংলার আকাশটা রবীন্দ্রনাথের। কবিতা-রবীন্দ্র সংগীত-চিত্রকলা-নাটক-প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাস-রাষ্ট্র চিন্তা-সমাজ-চিন্তায় যিনি বিশাল একটি রুচি তৈরি করে দিয়েছেনÑ বড়ো প্রতিষ্ঠান স্বরূপ এই ব্যক্তিত্ব।
ভাষারও রাজনীতি আছে। আছে শ্রেণিচরিত্র। আগের অনেক শব্দ এবং ভাষা হারিয়ে গেছে। এই সময়ে এসেও অনেক পুরনো শব্দ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ ধারণ করেছে। কথায় বলে এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি। যেমন: মাগী। শব্দটার অর্থ আগে অনেকে কন্যা, স্ত্রী বলে সম্বোধন করতো। এখন সেই শব্দ হয়ে গেছে বারবনিতা বা গণিকার নাম। যেমন পুরী। মজাদার ডালপুরি বা পুরি শব্দটি সিলেটে গিয়ে হয়েছে নারীবাচক শব্দ পুরী। বগা শব্দটি (আঞ্চলিক শব্দ) বক। কোথাও কোথাও এই শব্দকে পুরুষের জনন অঙ্গ সম্বোধন করে। এভাবে একেক জেলার একেক শব্দ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। অনেকসময় সেটা কাছাকাছি অর্থ অথবা একই অর্থ বহন করে। এটাই হচ্ছে ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য। যে বৈচিত্র্য ভাষার প্রমিত রূপকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করছে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তথা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আদিবাসীর বসবাস রয়েছে। তাদেরও আছে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা। সেই ভাষাও কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তারা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি ভাষা-বৈচিত্র্যেও অবদান রাখছে। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, প্রমিত বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যকেও সমৃদ্ধ করছে।

ভাষারও মৃত্যু ঘটে। প্রচলিত অনেক শব্দ এবং বাক্য যুগের সাথে তাল মেলাতে না পারলে আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। সেই ভাষা দখল করে কোন বিদেশি শব্দ। সহজবোধ্য কোন প্রাযুক্তিক শব্দ। অথবা চলনসই কোন ব্যবহারিক শব্দ। শ্রুতিমাধুর্যও এখানে বড় একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বাংলা ভাষায় বাগধারা, খনার বচন, হঁলা, প্রবাদ প্রবচনসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় শব্দ বা বাক্যআছে। যেমন: অভ্যাস মানুষের দাস। মানুষ মাত্রই ভুল। ব্যবহারে বংশের পরিচয়। গোয়াল ভরা গরু পুকুর ভরা মাছ। সাঁঝপ্রদীপ। সলতে। চেরাগের নিচে অন্ধকার ইত্যাদি। এই শব্দ বা বাক্যগুলো আমাদের ভূ-প্রকৃতি। পরিবেশ পরিপার্শ্ব। নদীমাতৃক দেশ। কৃষিভিত্তিক দেশ। ভাটি বাংলার দেশসহ (মাটিজাত) একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ দেশের পরিচয় বহন করে। কারো নামে যেমন: সকিনা, জরিনা, মফিজ, আবুল, নাবালক, খোকা, বাবু ইত্যাদি। এইসব নামকে এখন গো-বেচারা বা নিরীহ ব্যক্তির নাম হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। প্রযুক্তি-বিজ্ঞানের এই যুগে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে, মানুষের রুচি-সূচি-মেধা-সৃজন-মনন যখন নানাসূচকে পরিবর্তন হয়, পুরনো শব্দ বা ভাষাও আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। অপ্রচলিত হয়ে যায়। (যদিও এখানে পুঁজিবাদী কর্পোরেটবাজার ব্যবস্থা অনেক বড়ো একটা ফ্যাক্টর…) সংক্ষেপে বলতে গেলে, উল্লিখিত শব্দ বা ভাষাগুলোর অবস্থাও ঠিক তেমন।
এবার আসি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা। তার উচ্চারণ ইত্যাদি বিষয়ে। আসলে উচ্চারিত ভাষার কাছাকাছি না হওয়ায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এবং তার উচ্চারণ কঠিন বৈকি। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম। সমুদ্র বন্দর হওয়ায় তৎকালীন সময়ে বহির্বিশ্ব থেকে এই চট্টগ্রামে এসেছে অনেক বণিক বা ব্যবসায়ী। তারা এখানে ব্যবসা করতেএসেছে। অনেকসময় এখানকার মানুষের সাথে তৈরি হয়েছে হৃদ্য সম্পর্ক। অনেক আবার পারস্পরিক বোঝাপড়ায় বিয়েসাদী করেস্থায়ী হয়েছে। একসময় চট্টগ্রাম, আজকের মায়ানমারের (আগের বার্মা নাম) রাখাইন স্টেটের অংশ আরাকান এর অংশ ছিলো। আরাকানের বিখ্যাত মুসলমান জনগোষ্ঠি ছিলো রোহিঙ্গা। এই আরাকান কে সাহিত্যে রোসাং বা রোসাঙ্গ নামে চেনা হয়। প্রাচীন চর্যাপদের পর। মধ্যযুগের সাহিত্যের মধ্যে দৌলত কাজী। মাগন ঠাকুর। তার সমসাময়িক কবি মরদুন এবং পদ্মাবতী’র বিখ্যাতকবি আলাওলের কথা বলা যায়।
তাছাড়া একদিকে সমুদ্র বন্দর। ফলে বিশাল পার্বত্য চট্টগ্রামের যে আঞ্চলিক ভাষা; সেই আঞ্চলিক ভাষায় আছে নানা ভিন্নতা। ঐ ভাষার উচ্চারণ। শব্দ। বাক্য। ধ্বনিগত বৈচিত্র্য এবং ইশারায় আছে ভিন্নতা ও বৈপরীত্য। এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, প্রমিত (শুদ্ধভাষা) ভাষার সাথে কথা-বার্তা স্টাইলে যোজন যোজন পার্থক্য আছে। চট্টগ্রামের মানুষের আঞ্চলিক ভাষা প্রমিত ভাষার কাছাকাছি না হওয়ায় উচ্চারণের জায়গায় তারা বড়ো একটা হোছট খায়। খুব

কম আঞ্চলিক ভাষা আছে বাংলার মূল ভাষা থেকে নানা দূরত্বের। সিলেটও তারমধ্যে অন্যতম বলা যায়।

একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে বাংলা ভাষা নিয়ে আবেগের শেষ নেই। কিন্তু সর্বত্র এর যথার্থ প্রয়োগ নিয়ে আমরা কতোটুকু সচেতন? স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের বাংলা বানান আর উচ্চারণের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শক্ত নিয়ম বিধি প্রচলিত নেই। সংবাদ পত্র, সরকারি বেসরকারি বড়ো প্রতিষ্ঠান। অফিস, দোকান পাঠ, শপিং মল, সুপার শপ। মার্কেট, আদালত, এমনকি আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্টের ব্যানার, কোন প্রোগ্রাম বা অনুষ্ঠানের ব্যানার, খাবারের ম্যানুসহ মূল্য তালিকাগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত অমার্জনীয় ভুলের ছড়াছড়ি যা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাবলিক বাস, রিক্সা, টেম্পো, টেক্সিসহ সাধারণ যানগুলোতে হাস্যকর অমার্জনীয় ভুল বানান। যারা শিক্ষিত সচেতন, তারাও হয়তো কমবেশি এই নৈরাজ্যের বিপক্ষে মানসিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। অথচ মোটাদাগে বাংলা একাডেমি যদি নিজেই এই নৈরাজ্যের দায় নিতো, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-পত্র-পত্রিকা-অফিস-আদালত-প্রশাসনের এই ভাষাদূষণ অনেকাংশে কমে আসতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সচেতন প্রত্যেক বাসাবাড়ি এবং প্রশাসনের সব গুরত্বপূর্ণ জায়গায় কমবেশি বাংলা একাডেমি’র ডিকশনারি রাখা হয়। কোন সমস্যা হলেই তারা এটি অনুসরণ করে। অথচ বাংলা একাডেমির বাংলা বানান অভিধানের এই দ্বৈতরীতির ভূত যদি এভাবে চেপে বসেই থাকে, তাহলে এর থেকে মুক্তি অসম্ভব। সব শেষে বলি, বাংলা ভাষা তার উৎকর্ষ, শুদ্ধতা, মাহাত্ম্য ও গৌরব নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে সেই প্রত্যাশা।

লেখক হ কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 604 People

সম্পর্কিত পোস্ট