চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

লোহাগাড়ার প্রাচীন সংস্কৃতি আমিরাবাদের বড় মাওলানার ঘোড়দৌড় মেলা

১ মার্চ, ২০২০ | ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ

এম. এম. আহমদ মনির ■ লোহাগাড়া

লোহাগাড়ার প্রাচীন সংস্কৃতি আমিরাবাদের বড় মাওলানার ঘোড়দৌড় মেলা

লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের একটি পরিচিত নাম ‘সভার বিল’। উপজেলা সদর বটতলী মোটর স্টেশনের পূর্বপাশে এটি অবস্থিত। বৃহদাকারের খোলা ধানী জমিনের বিল বা খোলা ময়দান। এ বিলে প্রতিবছর মাঘ মাসের ২১ ও ২২ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় অতি প্রাচীনকালের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক উৎসব বড় মাওলানার ঘোড়দৌড় মেলা। গত ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি ১২৪তম ঘোড়দৌড় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রকমারি পণ্যের সারি-সারি দোকানপাট, ওয়াজ মাহফিল, বৃহদাকারের নামাজের জামায়াত, ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা ও বড় মাওলানার কবর জিয়ারতে ভক্তদের ভিড় ইত্যাদি।
অতীতের একসময় এলাকার মুসলিম সম্প্রদায় অপসংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধ হয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে পড়ে। আধ্যাত্মিক জ্ঞানসাধক হযরত মাওলানা সৈয়দ মুফাজ্জলুর রহমান (রহ.) বিচলিত হন। মুসলমানদেরকে ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জ্বীবিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। বিশেষ করে বিভিন্ন অপসংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে ইসলামী ভাবধারা ও চেতনা কলুষিত করা থেকে মুক্ত রাখার জন্য তিনি উল্লেখিত সময়ে একটি মুসলমানদের মিলনমেলার আয়োজন করেন। তাতে গ্রামীণ সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন এবং হযরত বড় মাওলানার অন্যতম ভক্ত নুরুদ্দীন ফকিরকে ঘোড়দৌড় সভার আয়োজন করতে নির্দেশ দেন। এই কারণে আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধক হযরত সৈয়দ বড় মাওলানা ১৮৯৬ সালে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি গ্রামের বৃহদাকারের ধানী জমির খোলা মাঠে দুদিনব্যাপী ঘোড়দৌড় সভার গোড়াপত্তন করেন। এলাকায় সৃষ্টি হয় ইসলামী সংস্কৃতির এক নতুন জাগরণ। হযরত বড় মাওলানার ভক্ত, অনুরাগী ও অনুসারীর সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ভিন্নধর্মের সাংস্কৃতিক উৎসব থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ফিরে আসে। হযরত বড় মাওলানার ইসলামী মতাদর্শের প্রতি মুসলমানেরা অনুপ্রাণিত হতে থাকেন। এভাবে তৎকালীন সময়ে ঘোড়দৌড় সভা মুসলমানদের মিলন মেলায় পরিণত হলে ইসলামী সংস্কৃতির সাথে এক সেতুবন্ধন রচিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরের মাঘ মাসের শেষার্ধে সভাটি দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সভায় সমাগম ঘটে দূর-দূরান্তের অসংখ্য আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার। শেষদিনে জামায়াতে আছর নামাজ আদায় করেন অসংখ্য মুসল্লি। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা। সভার একপাশে চলতে থাকে ওয়াজ মাহফিল। মিষ্টান্ন, শিশুদের খেলনাসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর চলে বেচাকেনার ধুমধাম। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের উপস্থিতিও দেখার মতো। সভাটি অনাবিল শান্তি ও আনন্দের এক সরস প্রাণের জীবন্ত উৎস।

উল্লেখ্য, ১৮১৪ সালে হযরত বড় মাওলানা বর্তমান লোহাগাড়া উপজেলাধীন আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ মুতিউল্লাহ মিঞাজী। তিনি সাতকানিয়া থানার মির্জাখীল থেকে এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার পূর্বপুরুষ আরব থেকে ধর্মপ্রচারে ভারতে এসেছিলেন। ওইখান থেকে তার পিতামহ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে মির্জাখীলে এসে প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সৈয়দ মুতিউল্লাহ মিঞাজী মির্জাখীল ত্যাগ করে বর্তমান ঠিকানায় চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানে হযরত বড় মাওলানা জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। পরে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য কলকাতা থেকে হুগলি মাদরাসায় চলে যান। কৃতিত্বের সহিত সাফল্য লাভের পর তিনি একই মাদরাসায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘকাল চাকরিশেষে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। তার ধ্যান-ধারণা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানসাধনা তাকে মহান করে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সুনাম ও খ্যাতি। তিনি ছিলেন জ্ঞান তাপস, লেখক ও বিভিন্ন ভাষাজ্ঞান সমৃদ্ধ একজন ইসলামী চিন্তাবিদ। আল্লাহ ও রাসূল (স.) প্রেমিক হযরত সৈয়দ বড় মাওলানা নিজ গ্রামে তার ভক্ত নুরুদ্দীন ফকির ও মনিরুজ্জমান ফকিরের মাধ্যমে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সবসময় হালাল-হারাম পরখ করে চলতেন। বেনামাজীদের খাবার ও দাওয়াত তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন। তার নামাজে জানাজা পড়াবার জন্য তার সহধর্মীনিকে বলেছিলেন, তার সহোদর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সৈয়দ মাওলানা হামিদুর রহমান তার নামাজে জানাজা পড়াবেন। তিনি থাকতেন ফেনী জেলার শর্শদী গ্রামে। কিন্তু, হযরত বড় মাওলানার মৃত্যুর পর হযরত সৈয়দ মাওলানা হামিদুর রহমান একটি নৌকায় লাল পতাকা টাঙিয়ে নদী ও সাগরপথ পাড়ি দিয়ে টঙ্কাবতী খাল অতিক্রম করে জানাজায় উপস্থিত জনগণের সম্মুখে হাজির হয়ে জানাজার নামাজের ইমামতি করেন।

এ সুমহান জ্ঞানসাধক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে অর্থাৎ ১৯১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সুখছড়ি গ্রামের নিজ বাড়ির পাশে এবং ঘোড়দৌড় সভার বিলের সামান্য উত্তর পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু ঘোড়দৌড় মেলার অম্লান স্মৃতি আজো হযরত বড় মাওলানাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 200 People

সম্পর্কিত পোস্ট