চট্টগ্রাম বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ

নিজাম উদ্দিন লাভলু, রামগড়

শীঘ্রই ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ঘোষণা

বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সুদিনের পথে হালদা নদী

হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র এবং বাংলাদেশের একটি মাছের খনি। খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা ছোট বেলছড়ির হাসুকপাড়া পাহাড় থেকে জন্ম নেয়া অপার জীব বৈচিত্র্যময় ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এ নদীটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। অথচ এটি এখনও অবহেলিত। প্রাকৃতিক এ সম্পদ রক্ষায় হালদা নদী রক্ষা কমিটি ১৫ বছর যাবত নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। সুসংবাদ হচ্ছে, জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সরকার হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনও দিয়েছেন। আগামী ১৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেয়া হবে। আর ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবহেলিত হালদা নদীর সুদিনের সূচনা হবে। এমন আশায় সরকারের এ উদ্যোগে আনন্দ উদ্দিপনা সৃষ্টি হয়েছে হালদাপাড়ের মানুষের মাঝে। রামগড়ের পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে হালদা মানিকছড়ি, ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার বুক চিরে চলে গেছে কর্ণফুলী নদীতে। রুই জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) পোনার জন্য এ নদীর আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকলেও এটি যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকটি প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশে রয়েছে তার মধ্যে হালদা অন্যতম। বর্তমানে এ নদী যথাযথ পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মা-মাছ শিকার, অপরিকল্পিত স্লুইস গেইট নির্মাণ এবং বাঁক কেটে দেয়াসহ মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে হুমকির সম্মুখীন। এরফলে প্রতিবছর মা-মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। এতে হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারী ও জেলেদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি ও যুগ যুগ ধরে তাদের পূর্বসুরীদের ঐতিহ্যবাহী পেশা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অজানা আশঙ্কায় দিনযাপন করছে। হালদা নদীর প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর ২০০৭ সালের জুলাই থেকে ‘হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ২০১২ সালে। কিন্তু প্রকল্পটির সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। হালদা নদীর সম্পদ, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনা করলে এ নদী বাংলাদেশের জাতীয় নদীর স্বীকৃতি পাওয়ার উপযুক্ত তেমনি বেশকিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য এটি আমাদের দেশের জাতীয় মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যের দাবিদার। অথচ গুণগত গবেষণা, সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও প্রচারের অভাবে এখনো হালদা নদীর জাতীয় ঐতিহ্যে সম্পর্কিত পরিচয় সবার দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে।
হালদার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক অবদান: অপার জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ এ নদী একদিকে যেমন মৎস্য খাতে অবদান রাখছে তেমনই অবদান রেখে চলেছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এ নদী থেকে ২০১০ সালে মাত্র দু’সপ্তাহেই আয় হয় ৯০০ কোট টাকা। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ছয় শতাংশ আসে হালদা থেকে। একটি গবেষণার তথ্যানুসারে একটি মা কাতলামাছ হালদায় গত পাঁচ বছরে ডিম ছেড়েছে ১৯ কোট ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার। গত ১০ বছরে এ নদী থেকে রেনু প্রাপ্তির হার প্রতিবছর ৬০৪.৬৪ কেজি। শুধু এ নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে আছে তিন হাজার জেলে আর এর সাথে জড়িয়ে আছে ২০ হাজার মানুষের জীবন। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ছয় শতাংশ আসে হালদা থেকে। হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম যার মধ্যে মৎস্যবিষয়ক গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমনÑ হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। এটিই বিশ্বের একমাত্র জোয়ারভাটার নদী যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। হালদা নদী থেকে ডিম আহরণ, আহরিত ডিম থেকে রেণু উৎপাদন এবং পরিচর্যার প্রযুক্তি স্থানীয়দের সম্পূর্ণ নিজস্ব, যা স্মরণাতীত কাল থেকে ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সংমিশ্রণে উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিবছর হালদার অবদান ৮০০ কোটি টাকা যা এখানে প্রাপ্ত ডিম, উৎপাদিত রেণু এবং মাছ থেকে আসে। এছাড়াও রয়েছে কৃষিজ উৎপাদন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকা- যা হালদার অবদানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, জোয়ার-ভাটার ক্রিয়া, তীব্র ¯্রােত, ফেনিল ঘোলা পানিসহ নদীর ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে একে আলাদা করেছে। হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের প্রধান বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক। হালদা নদী বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহরের সুপেয় পানির প্রধান উৎস। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় হালদা নদীকে জাতীয় ঐতিহ্য এমনকি বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নদী ঘোষণার দাবি দীর্ঘদিনের।
বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণার উদ্যোগ: নানামুখী অত্যাচারে হালদা যখন বির্পযস্ত, হালদা পাড়ের মানুষ, নদী রক্ষা কমিটিসহ নদী প্রেমী নাগরিকরা হালদার করুণ অবস্থায় উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ ঠিক এমনি সময়ে সরকার উদোগ নিলো ঐতিহ্যবাহী প্রাণের এ নদীটিকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণার।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সরকারের এ সময়োপযোগী ও মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এমন উদ্যোগে ব্যাপক উদ্দীপনা-আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটউটের (বিএফআরআই) প্রস্তাবনা বিবেচনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় হালদাকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদনও দিয়েছেন। আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া হবে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ। এ সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটউটের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ড. এম খলিলুর রহমনের নেতৃত্বে ২১-২৩ জানয়ারি রামগড়ে হালদা নদীর উৎপত্তিস্থলসহ নদীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। তারা নদীর দ্’ুপাড়ের মানুষের সাথে স্টেকহোল্ডার কনসালটেশান করেন।
হালদা নদী রক্ষা কমিটির অভিনন্দন: হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণার সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নদী গবেষক মো. মনজুরুল কিবরীয়া। তিনি বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ নদী রক্ষা কমিটির দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলনের ফসল। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাও জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হালদা নদীর প্রতি খুবই আন্তরিক। তিনি হালদার অবস্থার কথা জানতে তার দপ্তরের মহাপরিচালককে ২০১৫ সালে নদীটি সরেজমিনে পরিদশনে পাঠিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণার কারণে বিপন্নের হাত থেকে রক্ষা পাবে দেশের এই অমূল্য সম্পদ।
উৎপত্তিস্থল নিয়ে বিভ্রান্তি: বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী নদী হওয়া সত্ত্বেও দুঃখজনক হচ্ছে, হালদার উৎপত্তিস্থল নিয়ে এখনও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার ও প্রকাশ করা হচ্ছে। হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়ার নেতৃত্বে ২০১৩ সালে সরেজমিনে ব্যাপক অনুসন্ধানের পর হালদা নদীর প্রকৃত উৎপত্তিস্থল আবিষ্কার হয়। খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ৭ নং পাতাছড়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ছোট বেলছড়ির হাসুকপাড়া পাহাড়ের ঝরনা থেকেই উৎপত্তি হয়ে ক্রমান্বয়ে ছড়া, খাল ও নদীতে রূপান্তরিত হয় হালদা।
এর ¯্রােতধারায় যুক্ত হয় বিভিন্ন ছড়া ও খাল। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার হালদা নদর এ উৎপত্তিস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। ওইসময় তিনি স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে নদীটির অতীত ও বতর্মান অবস্থা সম্পর্কে তথ্যাদি নেন। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটউটের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। প্রকৃত উৎপত্তিস্থল আবিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলীর সালদা খালকে হালদা নদীর উৎস হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 324 People

সম্পর্কিত পোস্ট