চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ২:৩৭ অপরাহ্ণ

ডাঃ আঞ্জুমান আরা ইসলাম

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালঃ সাফল্য ও অগ্রযাত্রার ৩৯ বছর

“চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল” চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী, জনহিতকর ও স্বাস্থ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক শিশু বর্ষ উপলক্ষে চট্টগ্রামের কিছু মহৎ প্রাণ সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। চট্টগ্রামে একটি শিশু হাসপাতালের স্বúœ দেখেছিলেন মরহুম ডাঃ এ এফ এম ইউসুফ। কান্ডারী ছিলেন প্রফেসর ডাঃ এ এস এম ফজলুল করিম, যিনি অদ্যবদি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রেসিডেন্ট। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে যিনি অক্লান্ত মেধা ও শ্রম দিয়েছিলেন তিনি মরহুম ইঞ্জিনিয়ার এল.কে.সিদ্দিকী। যিনি না হলে মা ও শিশু হাসপাতাল হতো কিনা সন্দেহ আছে। তার প্রচেষ্টায় প্রথমে ১০ শয্যা বিশিষ্ট আন্তঃবিভাগ শুরু হয়, এরপর ৩০ শয্যা এবং পরবর্তীতে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট আন্তঃবিভাগ শুরু করা হয়। সাথে ছিলেন এক ঝাক নিবেদিত প্রাণ সমাজকর্মী। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আজকের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল। ইতিমধ্যে এই হাসপাতাল সফলতার সাথে তার প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পার করেছে। প্রাথমিক ভাবে শুধুমাত্র শিশু স্বাস্থ্য বহির্বিভাগের মাধ্যমে এই হাসপাতালের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি ৬৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সার্বক্ষনিক খোলা থাকে এবং বহির্বিভাগ প্রতিদিন সকাল ৮.০০ টা থেকে রাত ৮.০০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে বর্তমানে শিশু স্বাস্থ্য, মেডিসিন, অবস এন্ড গাইনী, জেনারেল সার্জারী, অর্থোপেডিক সার্জারী, শিশু সার্জারী, নাক-কান-গলা, চক্ষু, দন্ত, চর্ম ও যৌন রোগ, ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, মানসিক রোগ, এ্যাজমা ক্লিনিক, ল্যাকটেশন ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, ইপিআই প্রোগ্রাম, ডটস কর্ণার, কনসালটেন্সি সার্ভিস, বিভিন্ন সাব-স্পেশালিটি ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক ইত্যাদি এবং আন্তঃ বিভাগে মেডিসিন, শিশু স্বাস্থ্য, নিওনেটলজি, শিশু নিউরোলজি, অবস এন্ড গাইনী, জেনারেল সার্জারী, শিশু সার্জারী, অর্থোপেডিক সার্জারী, নাক-কান-গলা ও চক্ষু বিভাগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা হিসেবে চালু রয়েছে এডাল্ট আইসিইউ, এডাল্ট সিসিইউ, এডাল্ট এইচডিইউ, এনআইসিইউ, শিশু আইসিইউ, শিশু এইচডিইউ, শিশু সিসিইউ, শিশু নিউরোলজি, থেলসেমিয়া ইউনিট, কিডনী রোগীদের জন্য হেমোডায়ালাইসিস ইউনিট, শিশু কিডনী ও পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস, ইউরোলজি, প্লাস্টিক সার্জারী, অনকোলজি এন্ড রেডিওথেরাপি (ক্যান্সার চিকিৎসা), হেমাটোলজি, গ্যাষ্ট্রোএন্টারলজি, এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়বেটিক ও হরমোন রোগ), নিওরো সার্জারী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধি শিশুদের জন্য অত্যাধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা সহ বিশেষায়িত অটিজম ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র। ভবিষ্যতে এই হাসপাতালে আরো নতুন নতুন বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অসহায়, দুঃস্থ ও গরীব রোগীদের এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া অসহায় ও গরীব রোগীদের যাকাত ফান্ড ও দরিদ্র কল্যাণ তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র, খাদ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে। মধ্যবিত্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কম মূল্যে সকল চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ”কোনো রোগী অর্থাভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না” – এটি এই প্রতিষ্ঠানের মূলমন্ত্র।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সাথে দেশে ও দেশের বাইরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। উক্ত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে এই হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা, প্রশিক্ষন ও গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম হয়ে থাকে। এএমডি ফ্রান্স, হোপ ফাউন্ডেশন, কেএমডি ফ্রান্স, জন হপ কিনস ইউনিভার্সিটি, ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ গড়ষবপঁড়ৎ ইরড়ংপরবহপবং গধযরফড়ষ টহরাবৎংরঃু, ঞযধরষধহফ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, আইসিডিডিআরবি, কক্সবাজার শিশু হাসপাতাল, এসএআরপিভি, চকরিয়া, তারেক মেমোরিয়াল হসপিটাল, ফেনী, সন্দ্বীপ হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। এএমডি ফ্রান্সের একটি বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক টিম প্রতিবছর ৩ মাস এই হাসপাতালে অবস্থান করেন এবং রোগীদের চিকিৎসা সেবা ও গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন করেন। এছাড়া হাসপাতালের অধীনে কমিউনিটি সার্ভিসের আওতায় মোহরা, সাতকানিয়া, রাউজান, আনোয়ারা, ফটিকছড়ি প্রভৃতি স্থানে প্রতিবছর হেলথ ক্যাম্প আয়োজন করা হয়ে থাকে। রোহিঙ্গা শিবিরেও হাসপাতালের একটি মেডিকেল টিম হোপ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় বেশ কিছুদিন যাবৎ চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল একটি ট্রাষ্ট। এই ট্রাষ্টের অধীনে বর্তমানে নিম্নবর্ণিত প্রকল্প সমূহ অত্যন্ত সফল ও সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে।
১.চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল ঃ প্রতিষ্ঠা লগ্নে এই হাসপাতালের নামকরন করা হয়েছিল ”চট্টগ্রাম শিশু হাসপাতাল”। ১৯৭৯ সালে মাত্র ৪০০ বর্গফুট জায়গায় বহির্বিভাগ সেবার মাধ্যমে ”চট্টগ্রাম শিশু হাসপাতাল” তার যাত্রা শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে বহির্বিভাগের পাশাপাশি ১০ শয্যার আন্তঃ বিভাগ চালু করা হয়। ১৯৮৭ সালে ১০ শয্যা থেকে ৩০ শয্যায় উন্নিতকরণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে এই হাসপাতালের আন্তঃ বিভাগ ১৫০ শয্যায় উন্নিতকরণ করে শিশু স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সেবার কার্যক্রম শুরু করা হয় এবং সাথে সাথে এর নাম পরিবর্তন করে করা হয় ”চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল”। সকল বিভাগের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ০১/১০/২০০৪ তারিখে ”চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল” এর নাম পরিবর্তন করে করা হয় ”চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল”। দক্ষ জনবল, অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং অত্যাধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই হাসপাতাল বর্তমানে ৬৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই হাসপাতালকে ৮৫০ শয্যায় উন্নিতকরণের জন্য এবং নতুন নতুন বিশেষায়িত সেবা চালু করার জন্য ১৩ তলা বিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল ভবনের কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলছে।
২. চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অন্যতম প্রকল্প চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ। ২০০৬ সালে ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির মাধ্যমে এই মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। ইতিমধ্যে এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা একটি বেসরকারী মেডিকেল কলেজ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের বর্তমানে ১৪তম ব্যাচে মোট ১১০ জন ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তি কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৭টি ব্যাচ এমবিবিএস কোর্স সফল ভাবে সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে এই মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা অনেক ডাক্তার সাফল্যের সাথে পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে পড়াশোনা করছে এবং অনেকে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন। একজন সুনাগরিক, ভাল মানুষ ও রোগী বান্ধব চিকিৎসক তৈরির জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
৩. চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনষ্টিটিউট ঃ ১৯৮৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নার্সিং সেবা কার্যক্রম চালু আছে। এই নার্সিং ইনষ্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত নার্সদের মাধ্যমে শুরু থেকে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্র্সিং ইনষ্টিটিউট বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের অনুমোদন লাভ করে। প্রতিটি ব্যাচে ২৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাইন্স এন্ড মিডওয়াইফারী কোর্সে ভর্তি করা হয়। ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি ২৫ থেকে ৫০ সে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের কমপ্রিহেনসিভ পরীক্ষায় এই ইনষ্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীদের পাশের হার শত ভাগ। এই হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের উচ্চতর প্রশিক্ষন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একে খান হেলথ কেয়ার ট্রাষ্টের সহযোগিতায় ১ বছর মেয়াদী একটি নার্সিং ব্রিজ প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪টি ব্যাচে মোট ১৫০ জন নার্স উক্ত নার্সিং ব্রিজ প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছেন।
৪.নার্সিং কলেজ ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অধীনে বিগত ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিএসসি ইন নার্সিং কোর্স চালু করা হয়েছে। প্রথম ব্যাচে ২২ জন ছাত্র/ছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২য় ব্যাচের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বিএসসি ইন নার্সিং কোর্সের জন্য এখানে আধুনিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা সামগ্রী, শিক্ষা উপকরণ, যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ল্যাব, প্রয়োজনীয় শ্রেণী কক্ষ, অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত দেশী-বিদেশী বই ও জার্নাল সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম, কমন রুম ও প্রয়োজনীয় টিউটর রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্রীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ৪ তলা বিশিষ্ট একটি হোস্টেল ভবন, যাতে ২৪০ জন ছাত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। নার্সিং ইনষ্টিটিউট ও নার্সিং কলেজের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি। আমরা আশা করি নার্সিং পেশা ও সেবার মান উন্নয়ন এবং নার্সিং পেশায় দক্ষ মানব সম্পদ গঠনে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
৫.চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ইনষ্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অন্যতম আরেকটি প্রকল্প হল ইনষ্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ। ১৯৯৭ সালে এই ইনষ্টিটিউটের অধীনে থেকে ডিপ্লোমা ইন চাইল্ড হেলথ (ডিসিএইচ) কোর্স চালু করা হয়েছে। এই পর্যন্ত অত্র ইনষ্টিটিউট থেকে ৭৫ জন ডাক্তার ডিসিএইচ কোর্স পাশ করেছেন। এই ইনষ্টিটিউটের অধীনে শিশু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা মূলক কার্যক্রম চালু আছে। জাতীয় পর্যায়ে আইসিডিডিআরবি, ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডঐঙ ও আমেরিকার ঔড়যহ ঐড়ঢ়শরহরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের গবেষণা কার্যক্রম চালু আছে। ইনষ্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ এর অধীনে এমডি (পেডিয়েট্রিক) কোর্স চালুর বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করি খুব সহসা এমডি (পেডিয়েট্রিকস) কোর্স চালু করা সম্ভব হবে।
৬.ইনষ্টিটউট অব অটিজম এন্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অন্যতম একটি বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র হলো শিশু বিকাশ কেন্দ্র। ১৯৯৮ সালে এই হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু করা হয়। যা ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর অনুমোদনক্রমে ইনষ্টিটিউট অব অটিজম এন্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিবন্ধি শিশুদের জন্য একই ছাতার নিচে অত্যাধুনিক মেশিন এবং দক্ষ জনবলের মাধ্যমে এখানে সকল ধরনের চিকিৎসা সেবার (ঙহব ঝঃড়ঢ় ঝবৎারপব) ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া প্রতিবন্ধি শিশুদের চিকিৎসা সেবায় দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির জন্য এখানে সার্টিফিকেট কোর্স সহ স্বল্প মেয়াদী বিভিন্ন প্রশিক্ষন কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। এই কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক ও থেরাপিষ্টগণকে দেশে ও দেশের বাহির থেকে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অত্র প্রতিষ্ঠানের অধীনে ডিপ্লোমা ইন ডেভেলপমেন্টাল থেরাপি কোর্স চালু করার জন্য অনুম্দোন প্রদান করেছেন। খুব সহসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিপ্লোমা ইন ডেভেলপমেন্টাল থেরাপি কোর্স শুরু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এধরনের প্রশিক্ষন কোর্স এই প্রথম। প্রতিবন্ধি শিশুদের চিকিৎসা সেবায় এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭.ঈগঙঝঐ ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউট ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আরেকটি নতুন প্রকল্প হলো ঈগঙঝঐ ক্যান্সার হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনষ্টিটিউট। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অধীনে সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধা সহ একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্ধ পাওয়া গেছে। গত ১২/১২/২০১৫ ইং তারিখ মাননীয় ভূমি প্রতিমন্ত্রী জনাব সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ উক্ত জমির দলিল আনুষ্ঠানিক ভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করেন। উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে দৈনিক আজাদী সম্পাদক জনাব এম এ মালেককে চেয়ারম্যান করে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ”দৈনিক আজাদী” উক্ত ক্যান্সার হাসপাতাল বাস্তবায়নে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন। খুব সহসা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। এ ব্যাপারে আমরা সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন, শিশু স্বাস্থ্য, জেনারেল সার্জারী, অর্থোপেডিক সার্জারী, শিশু সার্জারী, নিওনেটলজি, শিশু নিওরোলজি ও অবস এন্ড গাইনী বিভাগের প্রশিক্ষন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্স কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা কর্মে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। হাসপাতালে প্রায় ১০ হাজার লাইফ মেম্বার রয়েছেন। এই ১০ হাজার লাইফ মেম্বার কর্তৃক বিভিন্ন ক্যটাগরিতে ২৪ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কার্যনির্বাহী কমিটিকে ০৩ বছরের জন্য হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। হাসপাতালে আগত লাইফ মেম্বারদের সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য হাসপাতালে লাইফ মেম্বার ডেস্ক খোলা হয়েছে। এই ডেস্ক সকাল ০৮.০০ থেকে রাত ৯.০০ পর্যন্ত খোলা থাকে। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে যারা হাসপাতালের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন ভাবে অবদান রেখেছেন তাদেরকে প্রতিবছর ফ্যামিলি নাইট অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্য থেকে সব ক্যাটাগরীতে বেষ্ট সার্ভিস এ্যাওয়ার্ড ও প্রেসিডেন্ট স্পেশাল এ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হচেছ। যারা গত হয়েছেন তাদের নামে স্মরণ বক্তৃতার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তাদের অবদান স্মরণীয় ও অনুকরণীয় করার জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঃ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অধীনে ভবিষ্যতে এখানে একটি বেসরকারী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নতুন নতুন বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা চালু সহ একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ভিলেজ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে হাসপাতালের একটি মাষ্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। উক্ত মাষ্টার প্ল্যান অনুযায়ী ৮৫০ শয্যা বিশিষ্ট (১৩ তলা) নতুন হাসপাতাল ভবনের নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে ১৩ তলা বিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল ভবনের ষ্ট্রাকচার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ফিনিশিং কাজ শুরু করা হয়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুমের পূর্বে ২/১টি ফ্লোরের কাজ শেষ করে হাসপাতালের নিচ তলার কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করার চেষ্টা চলছে। আমরা আশা করি যথাসময়ে এই নতুন হাসপাতাল ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। নতুন এই হাসপাতাল ভবনে সকল বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা থাকবে। নতুন এই হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলে তা এই অঞ্চলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে যুগান্তকারী অবদান রাখবে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালের নিজস্ব অর্থায়নে এই নির্মাণ কাজ চলছে। উক্ত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ১৮২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কিন্তু উক্ত অর্থের যোগান দেয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে একক ভাবে সম্ভব হবে না। এই ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। সমাজের বিত্তশালী, সমাজ দরদী মানুষ যাদের হৃদয় মানুষের দুঃখে দুঃখিত হয় তাদের কাছে আমাদের নিবেদন আপনারা এগিয়ে আসুন। আমাদের হাতে হাত মিলিয়ে গরীব, অসহায় মানুষের দুর্দশা লাঘবে সরকারী, বেসরকারী, বিভিন্ন দাতা সংস্থা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

জেনারেল সেক্রেটারী, ই.সি
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল
আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 722 People

সম্পর্কিত পোস্ট