চট্টগ্রাম রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৪ মে, ২০১৯ | ১:০৮ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক রতন কুমার তুরী

ভাষার বিলুপ্তি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন

পৃ থি বী র দে শে দে শে কালে কালে অনেক ভাষারই উদ্ভব হয়েছে। এ সমস্ত ভাষার মধ্যে অনেক গুলো এখনও টিকে থেকে এগিয়ে গেলেও কিছু ভাষা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। বিশ^ব্যাপী ৭০০০ এরও অধিক ভাষায় মানুষ কথা বলে। মানব বৈচিত্র্যতার এক অনন্য এবং হয়তো সবচেয়ে স্পষ্ট নিদর্শন এটি। বিশে^ এমনও ভাষা আছে যাতে কেবল ১১টি ধ্বনি ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। আবার ১১৮টি ধ্বনি সম্বলিত ভাষাও রয়েছে। এর সঙ্গে প্রত্যেক ভাষার বিশাল শব্দ ভা-ার, বাক্য গঠনের ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম এবং মনের ভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত অসংখ্য ধারণার সমন্বয় এসবই ভাষাবিদদের প্রতিনিয়তই আলোড়িত করেছে। কোন্ বিষয়টি বিশে^র এতোগুলো ভাষার মধ্যে বিদ্যমান কিংবা বিদ্যমান নয়, সেটা নির্ণয় করতে তাদের বিতর্কের শেষ নেই। যারা সাংকেতিক ভাষায় কথা বলে তারা প্রমাণ করেছে ভাষার জন্য শব্দ কিংবা ধ্বনি ব্যবহারেরও কোনো প্রয়োজন নেই।
তুরস্কের একটি অঞ্চলে প্রতিবেশীরা ভাবের আদান প্রদান করে শিস বাজিয়ে। শিসের ধ্বনি ও গঠন ব্যবহার করে এরা তাদের প্রয়োজনীয় আলাপ আলোচনা করে চলে। ভাষার এই বৈচিত্র্য অসংখ্য রূপ ও গঠন মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতা ও মানুষের ভাবের আদান প্রদানের ব্যাপক সামর্থ্যরেই পরিচয় বহন করে। ভাষার এই বৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। প্রতি বছরই কোনো কোনো ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কোনো ভাষা বলতে পারা শেষ ব্যক্তিটির মৃত্যু হলে ধরে নেয়া হয়, সে ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। বিশে^র প্রায় ৩৫ শতাংশ ভাষা দিন দিন বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। এগুলোর অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় নি।
সুতরাং এগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে। ভাষাবিদদের ধারণা আগামী ১০০ বছরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অনেকের মতে, ২১১৫ সালের মধ্যে বর্তমানে ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণ অনেক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংষ্কৃতিক কিংবা আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট। বিশেষ একটা ভাষা জানা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ধারণা করতে পারে যে ুতাদের সন্তানদের এমন ভাষা শেখাটাই শ্রেয় যেটা তাদের জন্য অর্থনৈতিক সাফল্য বয়ে আনবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় প্রজন্মের অধিকাংশ সদস্যই নিজ মাতৃভাষায় সাবলীল ভাবে কথা বলতে পারে না। তাদের জন্য ইংরেজিতে কথা বলতে পারা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সুবিধাজনক।
ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসন ভাষার পরিবর্তন ও বিলুপ্তির ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা পালন করে আসছে। অভিবাসন আধুনিক বিশে^র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর্মসংস্থান এবং আরো উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় তৃতীয় বিশ^ থেকে প্রথম বিশে^ অভিবাসন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর কারণে অভিবাসীদের ভাষাগত পরিবর্তন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের মাতৃভাষাটা না শেখা খুবই স্বাভাবিক। তবে, যুদ্ধ সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ^ব্যাপী বিপুল সংখ্যক মানুষ আজ অভিবাসী কিংবা শরণার্থীতে পরিণত। নিজ মাতৃভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ছেড়ে তাদের আরেক দেশের সীমান্তে পাড়ি জমাতে হয়। অচেনা পরিবেশ স্থানে নতুন জীবন ও পরিচয় গড়ে তোলার এক সংগ্রামে লিপ্ত তারা। এই সংগ্রামে তাদের মাতৃভূমির সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে ভাষা।
এসব অভিবাসী বেশিদিন নিজ দেশ ছেড়ে থাকলে দেখা যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মরা তাদের ভাষা আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছে এবং উক্ত দেশের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।
এতে করে তারা তাদের নিজস্ব ভাষাটিকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর কোনো ভাষাই একদিনে গড়ে ওঠেনি। ভাষা রপ্ত করে তা আবার লেখনির মাধ্যমে অন্যজনকে বুঝানো অনেক বিবর্তনের ফলে অর্জিত হয়েছে। সুতরাং পৃথিবীর যে ভাষাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে সে ভাষাগুলোকে অচিরে লিপিবদ্ধ করে রেখে উক্ত ভাষা সমূহের অস্তিত্ব রক্ষা করার আয়োজনই শ্রেয় কাজ।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকারকর্মী।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 394 People

সম্পর্কিত পোস্ট