চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১০ নভেম্বর, ২০২০ | ৮:৩০ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক ড. নারায়ণ বৈদ্য

বিশ্ব নদীদিবস এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী

এই পৃথিবীর ইতিহাস হাজার, লক্ষ কোটি বছরের। পৃথিবী নামক গ্রহটি সৃষ্টির পর থেকে প্রাকৃতিক কারণে সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল, বনভূমি ইত্যাদি সম্পদের সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ পৃথিবীর আকৃতির বা অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। পৃথিবী নামক গ্রহটি সূর্যের চতুর্দিকে পরিভ্রমণের কারণে ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে সূর্যের কিরণ সমভাবে পতিত হয় না। এ কারণে পৃথিবীর কোন অংশে দিন আবার কোন অংশে রাত দেখা যায়। তাছাড়া সূর্যের কিরণ বছরের কোন সময় পৃথিবীতে তির্যকভাবে এবং কোন সময় হেলে পতিত হয়। যেসব অঞ্চলে সূর্যের কিরণ তির্যকভাবে পতিত হয় সে সব অঞ্চলে তীব্র গরম অনুভূত হয়। অর্থাৎ ঐসব অঞ্চলে তখন গ্রীষ্মকাল। আর যেসব অঞ্চলে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের কিরণ হেলে পতিত হয় তখন ঐসব অঞ্চলে শীত বা ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। এ অবস্থায় তাকে এ সব অঞ্চলে শীতকাল বলা হয়।

আবার পৃথিবী নামক গ্রহটিতে এমন কিছু অঞ্চল আছে যে সব অঞ্চলে প্রতি দুই মাস পর পর আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যায়। এসব অঞ্চলগুলোকে ষড়ঋতুর দেশ বলা হয়। বাংলাদেশ পৃথিবী নামক গ্রহটির এমন এক স্থানে অবস্থিত যেখানে এরূপ ছয়টি ঋতু বছরে দেখা যায়। এ অঞ্চলে ঋতুভেদে বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ুকে মৌসুমী বায়ু বলে। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলের অনেক স্থানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আবার ভূপৃষ্ঠের সকল এলাকা সমতলও নয়। অনেক অংশে পাহাড় পর্বত, টিলা, উচ্চভূমি দেখা যায়। সাগর ও মহাসাগর থেকে উত্থিত প্রচুর জলরাশি বায়ুমন্ডলের সাথে মিশে স্থলভাগে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ সময়টাকে বলা হয় বর্ষাকাল।

বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে পাহাড়, পর্বত, টিলা বা উঁচু অঞ্চলের জলরাশি দ্রুত নিম্নের দিকে ধাবিত হয়। আবার ভূপৃষ্ঠের সে অঞ্চলে বৃষ্টিঝড়া জলরাশি ধাবিত হয় যে অঞ্চল তুলনামূলক নিম্ন। হাজার লক্ষ কোটি বছর ধরে জলরাশি একটি নির্দিষ্ট ধারা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য নদী, নালা, খাল।

গবেষণায় দেখা গেছে প্রাথমিক অবস্থায় এসব নদী, নালা, খাল এর তীরে কোন জনবসতি গড়ে উঠে নাই। কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি দেশে যখন জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে তখন মানুষ সেইসব জায়গায় জনবসতি গড়ে তোলার চেষ্টা করে যে সব অঞ্চলে সহজে খাদ্য সংস্থানের জন্য চাষাবাদ করা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, সাগর থেকে উত্থিত জলরাশি যা বৃষ্টি আকারে পতিত জলরাশি হয় মানুষের পানের উপযোগী। আবার চাষাবাদেরও উপযোগী। তাছাড়া বৃষ্টিবিহীন ঋতুতে নদী, খাল, নালা থেকে পানি তুলে সহজে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। এ কারণে মানুষ নদী, খাল এর তীরবর্তী ক্রমাগতভাবে বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন অঞ্চলে মানুষের ব্যবহায্য সকল পণ্য সমভাবে বা সহজে উৎপাদন হয় না। তাছাড়া উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় করে অধিক অর্থ আয় করার জন্য এবং নদী পথে যাতায়াতের সুবিধার জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চলে শহর-বন্দর গড়ে উঠে। এভাবে পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশে বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে নদী বা সমুদ্রের পাশে শহর বন্দর গড়ে উঠেছে।

এ সত্য উপলব্ধি করে প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বের নদী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশের বড় বড় শহর বা নগরগুলোও গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হওয়া বিভিন্ন নদীর তীরে। যেমন- ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। রাজশাহী শহর গড়ে উঠেছে পদ্মা নদীর তীরে। সিলেট শহর গড়ে উঠেছে সুরমা নদীর তীরে। কুমিল্লা শহর গড়ে উঠেছে গোমতী নদীর তীরে। খুলনা শহর গড়ে উঠেছে রূপসা নদীর তীরে। রংপুর শহর গড়ে উঠেছে তিস্তা নদীর তীরে। বরিশাল শহর গড়ে উঠেছে কীর্তনখোলা নদীর তীরে। গাজীপুর শহর গড়ে উঠেছে তুরাগ নদীর তীরে। যশোর শহর গড়ে উঠেছে ভৈরব নদীর তীরে। কক্সবাজার শহর গড়ে উঠেছে নাফ নদীর তীরে। পঞ্চগড় শহর গড়ে উঠেছে করতোয়া নদীর তীরে। নাটোর শহর গড়ে উঠেছে আত্রাই নদীর তীরে। টাঙ্গাইল শহর গড়ে উঠেছে যমুনা নদীর তীরে। ভৈরব শহর গড়ে উঠেছে মেঘনা নদীর তীরে। বগুড়া শহর গড়ে উঠেছে করতোয়া নদীর তীরে। সিরাজগঞ্জ শহর গড়ে উঠেছে যমুনা নদীর তীরে। নারায়নগঞ্জ শহর গড়ে উঠেছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। কুষ্টিয়া শহর গড়ে উঠেছে গড়াই নদীর তীরে। আর চট্টগ্রাম শহর গড়ে উঠেছে কর্ণফুলী নদীর তীরে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় দুই কোটি লোকের খাদ্য, আয়, কর্মসংস্থান, জীবিকা, সর্বপরি জীবনচক্র আবর্তীত হয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে। অথচ আজ সেই কর্ণফুলী নদী সম্পূর্ণভাবে আক্রান্ত হয়েছে কিছুসংখ্যক স্বার্থান্বেষী লোক দ্বারা। তাদের নিকট থেকে কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে গেলে তারা দোহায় দেয় রাজনীতি ও প্রভাব প্রতিপত্তির। সরকার শত চেষ্টা করেও তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে বা বাঁচাতে পারছে না কর্ণফুলী নদীকে।

১৯৮০ এর দশকে এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ব্রিজঘাটা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ৯০০ মিটার। এই ঘাটের কাছাকাছি চাক্তাই এলাকায় ২০০৬ সালে শুরু হয় শাহ আমানত তৃতীয় সেতুর নির্মাণ কাজ। ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে সেতুটির আশেপাশে জেগে উঠা চর দখল করে বস্তি, পাকা অবকাঠামোসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠে। তারও ছয়বছর আগে নদীর জায়গা ইজারা দেয়া হয় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র তৈরির জন্য। ফলে সেতু এলাকায় নদীর প্রস্থ কমে হয়েছে প্রায় ৫১০ মিটার। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কর্ণফুলী নদীর শাহআমানত সেতু থেকে ফিরিঙ্গীবাজার মনোহরখালী খাল পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। উক্ত জরিপে দেখা যায়, সেতু এলাকায় জোয়ারের সময় নদীটির প্রস্থ ৫১০ মিটার আর ভাটার সময় তা হয় ৪১০ মিটার। অথচ ২০১৪ সালে এডিবি (এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক) কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, সেতু এলাকায় নদীর প্রস্থ ছিল ৮৮৬ মিটার। চাক্তাই খালের মুখে প্রস্থ ছিল ৮৯৮ মিটার।

মাত্র সাত বছরে তা কমে হয়েছে ৪৩৬ মিটার। কর্ণফুলী নদীর তৃতীয় সেতুর আশেপাশে জেগে উঠা চর দখল করে বস্তিবাণিজ্য চালাচ্ছে কিছু প্রভাবশালী, রাজনীতির সাথেও তাদের সম্পর্ক রয়েছে। ছিন্নমূল দরিদ্র লোকদেরকে ভাড়া দিয়ে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মুখে অন্তত ৩০ একর সরকারি খাস জমি ২০ বছর ধরে দখল করে আয় করছে তারা। আবার এ দখলদারিত্ব স্থায়ী করার জন্য গঠন করা হয়েছে ‘ভেড়া মার্কেট শ্রমজীবী সমবায় কল্যাণ সমিতি’। এসব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করার জন্য সরকার উদ্যোগ নিলে উচ্ছেদ ঠেকাতে ২০১৪ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে একজন দখলদার। এ রিট এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ হয় ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’।

উক্ত গ্রন্থের তথ্য অনুসারে ১৮৬০ সালে সদরঘাটে চট্টগ্রাম বন্দর জেটি নির্মাণ করা হয়েছিল। খেয়া পারাপারের জন্য এ ঘাট সবসময় ব্যস্ত থাকতো। মাত্র বছর দেড়েক আগে এ ঘাটটির পাশে ছিল ‘সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি’-এর কার্যালয়। এটাও ছিল একটি অবৈধ স্থাপনা। কর্ণফুলীকে রক্ষা করার জন্য এক রিটের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৬ আগষ্ট হাইকোর্ট কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা  উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। তারও তিন বছর পর ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়। দুই দফা উচ্ছেদ অভিযানে সদরঘাট ও পতেঙ্গা লালদিয়ার চর এলাকায় প্রায় ৪০ একর জমি উদ্ধার করা হয়। এরপর উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন এ নিয়ে একে অপরের দোষারোপ শুরু করে। তাছাড়া আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রিট তো আছেই। ফলে উদ্ধারের জায়গা অনেকাংশে আবার বেদখলে চলে গেছে। এদিকে কর্ণফুলীর মত একটি জীবন্ত সত্ত্বা নদী আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আসুন, আমরা দখলদারদের বিরুদ্ধে এক হয়ে কাজ করি।

লেখক: প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 80 People

সম্পর্কিত পোস্ট