চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

৩০ অক্টোবর, ২০২০ | ২:০৬ অপরাহ্ণ

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

বিশ্বনবীর (সা.) শান ও মর্যাদা

‘(আল্লাহু) দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই, (কেননা) সত্য (এখানে) মিথ্যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, অতপর কোন ব্যক্তি যদি বাতিল (মতাদর্শ)-কে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর (দেয়া জীবনাদর্শের) উপর ঈমান আনে, সে যেন এর মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো যা কোনাদিনই ছিঁড়ে যাবার নয়; আল্লাহতায়ালা (সব) শোনেন (এবং সব) জানেন’-সূরা বাকারা-২৫৬।

ইসলাম যে একটি বাস্তবধর্মী ও আধুনিক স্বভাবসূলভ ধর্ম, এতে কোন সন্দেহ নেই। জাজিরাতুল আরবের সময় এক নৈরাজ্য ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আরবের মানুষেরা গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে পারস্পরিক সংঘাত ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এই বিশাল আকাশ-জমিনের একচ্ছত্র অধিপতি মহান রাব্বুল আ’লামিন আরশে আজিম থেকে তা রীতিমত পর্যবেক্ষণ করছেন। বিপথগামী আরবদের সু-পথে আনার জন্যে ঘোর অমানিশার আঁধারের ভেতর জেগে উঠেছে সত্য ও ন্যায়ের আলোর প্রদীপ।
ক্ষয়িষ্ণু বাগানে ফুটেছে প্রস্ফুটিত গোলাপ। মা আমেনার কোল জুড়ে এসেছে বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, খাতেমুন নাবিয়্যিন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। মক্কীজীবনের কঠিন ১৩টি বছর অতিক্রম করেছেন মহানবী (সা)। শে’বে আবি তালিবের কঠিন কারাগারে জেল খাটতে হয়েছে, বন্দিজীবনের প্রথম বছর খাসির মাংস, দ্বিতীয় বছর খাসীর চামড়া, তৃতীয় বছর গাছের বাকল খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়েছে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর সঙ্গীদের। তখনও তিনি দাওয়া মুস্তাজাবা (প্রত্যেক নবীদের স্পেশাল দোয়া) করেননি। সেটি রেখে দিলেন কেয়ামতের কঠিন দিনে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাঁর উম্মতের নাজাতের জন্যে।

৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর রাসূল (সা) মদিনার নগরীতে হিজরত করেন। এ সময় সেখানে বসবাসরত বনু আউস এবং বনু খাজরাজ সম্প্রদায় দু’টির মধ্যে ছিল গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষ। তাই কলহে লিপ্ত এ দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপন ও মদিনায় বসবাসরত সকল গোত্রের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল (সা) ৪৭ ধারার একটি সনদ বা সংবিধান প্রণয়ন করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে মদিনা সনদ নামে পরিচিত। এর প্রথম ১০ ধারায় বলা হয় যে, মুহাজির (দেশত্যাগী বা যারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিল) বনু আউফ, বনু সাইদা, বনু হারিস, বনু জুশাম, বনু নাজ্জার, বনু আমর, বনু নবিত ও বনু আউস পূর্বহারে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মনীতি এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পণের মাধ্যমে বন্দীদের মুক্ত করবে। ১১ থেকে ২০ ধারায় মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কিত আইন বিধৃত হয়। ২১ তারিখে ২৬ ধারায় হত্যাকারীর শাস্তি, কোন মুসলমান কোন অন্যায়কারীকে আশ্রয় দিলে তার শাস্তি, কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসা পদ্ধতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ক আইন সন্নিবেশিত হয়। ২৭ থেকে ৩৬ ধারায় সন্নিবেশিত হয় বিভিন্ন গোত্রের স্বরুপ সম্পর্কিত বিধান। পরবর্তী ধারাসমূহে যুদ্ধনীতি, নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ, নিজ নিজ ব্যয় নির্বাহ, এ সনদে অংশ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধে লিপ্ত হলে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা, বন্ধুর দুষ্কর্ম, যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ, নাগরিকের অধিকার, আশ্রয়দানকারী ও আশ্রিতের সম্পর্ক, নারীর আশ্রয়, সনদের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে শান্তিভঙ্গের আশংকা দেখা দিলে করণীয়, কোরাইশদের ব্যাপারে ব্যবস্থা, মদিনার উপর অতর্কিত আক্রমণ হলে করণীয় ইত্যাদি সন্নিবেশিত হয়।

বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম লিখিত চুক্তি ও সংবিধান। ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টির মতে-‘Out of the religious community of all Madinah the later and largest state of Islam arose’ অর্থাৎ মদিনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্থাপন করে। উক্ত সংবিধানে সকল পক্ষ মেনে নিয়ে স্বাক্ষর দান করেছিল।
এই সনদে মদিনাকে একটি হারাম (পবিত্র ভূমি) স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেখানে কোনো অস্ত্র বহন করা যাবে না এবং কোনো প্রকার রক্তপাত ঘটানো যাবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন আমার বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) তা মদিনা সনদের মাধ্যমেই প্রমাণিত। তিনি রাহামাতুল্লিল আ’লামিন- তিনি বিশ্বের সকল মানুষের রাসূল (সা), কোন বিশেষ গোষ্ঠীর রাসূল (সা) নয়। অতএব সর্বশেষ নবী হিসাবে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে তাঁকেই মানতে হবে-এটাই সর্বজনবিদিত সত্য ও কোরআন-হাদিস দ্বারা স্বীকৃত ও প্রমাণিত। অতএব আামাদের আদর্শ ও চরিত্র হতে হবে সেই রাসূলের (সা) মতন যাঁর কথা এখনো ব্রিটিশ মিউজিয়ামের শরীরে পাথর খোদাই করে রাখা হয়েছে, as a father, as a leader, as a social reformer, as a law maker, as a politician, Hazrat Mohammad (sm) is the superman of the world. ’

ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম, অন্য কোন জীবন বিধান, অন্য কোন মতবাদ, অন্য কোন মূলনীতি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সেটাই স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে সূরা আল্-ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে, ‘নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহতায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হবার পর) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহতায়ালা দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক চিকিৎসক, ইসলামি চিন্তক।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 135 People

সম্পর্কিত পোস্ট