চট্টগ্রাম বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০

৯ অক্টোবর, ২০২০ | ২:৩৩ অপরাহ্ণ

এজাজ ইউসুফী

ধর্ষণ-ধস্ত বাংলাদেশ : আইনের কঠোর প্রয়োগ চাই

“Our society should be safe for women to live.They are prone to rape,domestic violence and all manners of abuses,we need to do all we can in order for us to protect them from harms.”

BAMINGBOYE OLUROTIMI
Nigerian writer,Poet,Technologist

একটি উৎপীড়ক সমাজের বড় লক্ষণ হচ্ছে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। দেশে নারী ও শিশুদের উপর যৌন-নির্যাতনের মাত্রা সহ্যের সীমা লংঘন করে যাচ্ছে। আমরা যেন বর্বরকালের অসভ্য সমাজের বাসিন্দা। শুধু নারী ও শিশু নয়, এর হাত থেকে ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। সাম্প্রতিক কয়েকটা ধর্ষণের ঘটনার কারণে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নব-বিবাহিত তরুণী-ধর্ষণ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে সংঘটিত বর্বরতা, চট্টগ্রামে বান্ধবীর বাসায় এসে ধর্ষণের শিকার হওয়া দুঃস্বপ্নকেও হার মানিয়েছে। দুর্বৃত্তরা নারীধর্ষণ করে ক্ষান্ত হচ্ছে না সেই ধারণ করা দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল করে দিয়ে দেশের আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। গত মঙ্গলবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে বাধ্য হয়েছেন, এই অপরাধের ধরন সকল ‘বর্বরতার চরম সীমা’ অতিক্রম করে গেছে। এই অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না গেলে সমাজে নারী-অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে এবং মদদদাতা স্থানীয় জন-প্রতিনিধিদের আস্কারার কারণে তা সামাজিক-মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এদের যারা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদেরও আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। একজন নারী কিংবা শিশু ধর্ষিতা হওয়া মানে জাতির বিবেক ধর্ষিত হওয়া।
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সালমা আলী দৈনিক সমকালকে ৭ অক্টোবর দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি তিন ধরনের মানুষ ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এক, যারা ক্ষমতা দেখাতে চায়; দুই, প্রভাবশালী বা অর্থশালী ব্যক্তির বখে যাওয়া সন্তান; তিন, বিকৃত রুচির মানুষ। যাদের মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, এদের বেশিরভাগই পড়াশোনা করেনি কিংবা বাড়িতে সে রকম পরিবেশ পায়নি। এরাই বড় হয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে একজন ‘নয়ন বন্ড’ হয়ে ক্ষমতা দেখাতে চায়। এরা কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শবান বা ত্যাগী নেতাকর্মী নয়। এদের দিয়ে একশ্রেণীর রাজনীতিক ও নানা ধরনের অপরাধ করায়। আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে পেতে তারা এমন এক পর্যায়ে চলে যায় যে, একসময় আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তারা দুর্বলের ওপর ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে নারীকে বেছে নেয়।”
ধর্ষক মানেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত কিনা এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে না। তারপরও কিছু কিছু ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মনে হয় অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হয়, দ্রুত বিচারের আওতায় এনে প্রকাশ্যে এদের শাস্তি দেয়া উচিত। অন্তত কয়েকটি প্রকাশ্যে হলে অন্যদের মধ্যে তা ভীতি তৈরি করবে।”
দেশে একদিকে মহামারী করোনার দৌর্দণ্ড প্রকোপ চলছে। তার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীধর্ষণ। newsbd.net এর মতে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এই সংখ্যা প্রতিমাসেই বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানী, সামাজিক সংস্থাগুলো, আইনজীবী এবং মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের মতে ধর্ষণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা। তরুণদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি, বেকারত্ব, পর্ন ভিডিও’র সহজলভ্যতা, ইউটিউব দেখার সুযোগ, সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়া, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা হওয়ায় নৈতিক-অবক্ষয় চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। দেশে সম্প্রতি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এগুলো শুধু বিকৃত যৌন-বাসনা চরিতার্থ করবার জন্য করা হচ্ছে না। এর পেছনে ধর্ষকের মনে ক্ষমতা জাহির করার মনোবৃত্তিও সু-স্পষ্ট। এসব ধর্ষণের পেছনে সরকারী দলের দলীয় শৃংখলাভঙ্গকারী কিছু নেতাকর্মী রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ধর্ষণের মহামারির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে; বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। বাংলাদেশে অব্যাহত ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার মামলাগুলোর দ্রুত বিচারে আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান। সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হচ্ছে।
নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হলে তা আদালতে বিচার প্রার্থনা করলে উল্টো এদেরই নাজেহাল হতে হয়। বিচারকালে ধর্ষিতার যৌন-সম্পর্কের অতীত ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে হয়। জেরায় তাকে নিস্তার দেয় না। বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনে ধর্ষণ কখনো শেষ হয় না। তাকে বিচারের ক্ষেত্রে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পরোক্ষে নারী আরও একবার ধর্ষিত হয়। মামলা গ্রহণ, সাক্ষ্য, বিচার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রক্রিয়া তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় শারীরিক ও মানসিকভাবে। ফলে, তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন আইনি লড়াই চালিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে ভিকটিমের শারীরিক আলামত সংগ্রহের নামে যে ডাক্তারী পরীক্ষা হয় তা ভয়াবহ। পরীক্ষায় নারীর স্পর্শকাতর গোপনাঙ্গসমূহের মাপ-জোক করা হয়। যা ধর্ষকের পক্ষে যায়। যেমন নারীর স্তনের আকার বড় হলে তাকে ‘হ্যাবিচুয়েটেড’ প্রমাণের চেষ্টা চলে। নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করার কথা থাকলেও তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এক্ষেত্রে ভিকারুননিসা নুন স্কুলের ছাত্রী শিক্ষক পরিমলের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করতে হয়। পরিমলের পক্ষে একাধিক উকিল দাঁড়ায়। তারা আদালতে মেয়েটির শারীরিক বর্ণনা দিয়ে বলেন, মেয়েটিকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা সম্ভব ছিলো না।
বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্ষণের সংজ্ঞা :
“যদি কোন পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তা বলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।”
অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারা মতে সাজা হচ্ছে, ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও আর্থিক জরিমানা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভিকটিমের মৃত্যু ঘটলে আসামীকে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এই বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ভিকটিমকে যে দুরূহ পথ অতিক্রম করতে হয় তা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। আমরা দেখেছি মিডিয়া ও প্রবল জনমতের চাপে কিছু দ্রুত বিচার পাওয়ার নজির আছে। তবে, তা দেশের বিপুল সংখ্যক ভিকটিমের পক্ষে পাওয়া সহজ নয়।
বিবিসি বাংলা ২২ এপ্রিল ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, “বাংলাদেশে আইনে দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক অভিযুক্ত পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ। তারা বলছেন, আইনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বেসরকারী সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ গবেষণাটির পরিচালক রওশন আরা বলেন, এ সময়ে ৪৩৭২টি মামলা হয়েছে। কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, “ ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের কিছু কিছু বিষয় পরিবর্তন করা প্রয়োজন।” bdnews24.com এর মতামত কলামে আহসান কবির ভারতীয় একটি সম্পাদকীয় মন্তব্য তুলে ধরেছেন। সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, “ধর্ষণ একান্তই পুরুষকেন্দ্রিক বাস্তবতা। যে আইনের ধর্ষণের বিচার হয় সেটা ব্রিটিশরা করেছিল একশ ত্রিশ বছর আগে। পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলেছে কিন্তু পুরুষের ধর্ষণেচ্ছা একবারেই বদলায়নি। একেবারে নতুন করা ডিজিটাল আইনে ধর্মকে কটাক্ষ না করা, রাজনীতি বা সরকার নিয়ে গুজব না ছড়ানো কিংবা সংবাদ প্রকাশের দায়িত্বশীলতাসহ অনেক ধারা সংযোজিত হয়েছে। ধর্ষণ সম্ভবত সৃষ্টির আদিকাল থেকে অ্যানালগ ছিল, এখন আছে।” (চলবে)

লেখক: এজাজ ইউসুফী কবি ও সাংবাদিক

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
  • 42
    Shares
The Post Viewed By: 119 People

সম্পর্কিত পোস্ট