চট্টগ্রাম বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০

সর্বশেষ:

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ২:১২ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

নামাযে খুশুখুজুর মর্যাদা ও তাৎপর্য

‘নিঃসন্দেহে (সেসব) ঈমানদার মানুষরা মুক্তি পেয়ে গেছে-যারা নিজেদের নামাযে বিনয়াবনত থাকে, যারা অর্থহীন বিষয় থেকে বিমুখ থাকে, যারা (রীতিমত) যাকাত প্রদান করে, যারা তাদের যৌন অঙ্গসমূহের হেফাজত করে, তবে নিজেদের স্বামী স্ত্রী, কিংবা (পুরুষদের বেলায়) নিজেদের অধিকারভুক্ত (দাসী)-দের উপর (এ বিধান প্রযোজ্য) নয়, (এখানে যৌন অঙ্গসমূহের হেফাজত না করলে) কখনো তারা তিরস্কৃত হবে না, অতপর এ (বিধিবদ্ধ উপায়) ছাড়া কেউ যদি অন্য কোন (পন্থায় যৌন কামনা চরিতার্থ করতে) চায়, তাহলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। যারা তাদের (কাছে রক্ষিত) আমানত ও (অন্যদের দেয়া) প্রতিশ্রুতি সমূহের হেফাজত করে, যারা নিজেদের নামায সমূহের ব্যাপারে যত্নবান হয়, এ লোকগুলোই (হচ্ছে মূলত জমিনে আমার যথার্থ) উত্তরাধিকারী।-সূরা আল্-মোমেনুন- ১-১০।
নামায মুমিন জীবনের অন্যতম একটি সোপান। ঈমানের পরেই যে বিষয়টি সামনে চলে আসে সেটি হল নামায। একজন মুসলমানের জীবনে ইসলামের যে স্তম্ভটি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব বহন করে সেটি হল নামায। নামায সঠিকভাবে আদায় না হলে আল্লাহর কাছে যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না তেমনি নামাযি ব্যক্তির জীবনেও কোন সফলতা আসবে না। খুশুখুজু সহকারে নামায পড়ার মধ্যে রয়েছে মুমিনের আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি। নামাযকে আদায় করতে হবে পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে ও একাগ্রচিত্তে, কারণ নামায যখন বান্দা আদায় করেন তখন আল্লাহর সাথে যেন কথা বলেন। নামায পড়ার সময় মনে রাখতে হবে, আমার সামনে আল্লাহতায়ালা আমার নামায পর্যবেক্ষণ করছেন, পেছনে মালাকুল মাউত দাঁড়িয়ে আছেন, ডান পাশে জান্নাত আর বাম পাশে জাহান্নাম। নামাযে মনোযোগী হওয়ার অন্যতম উপাদান হচ্ছে, পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে হযরত ওমরের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। হযরত ওমরের পায়ে বর্শা বিধে গিয়েছিল। সাহাবিরা তা টেনে আনতে গেলেই হযরত ওমর চিৎকার দিয়ে উঠেন। প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ (সা) সাহাবীদেরকে বললেন, ওমর যখন নামাযরত অবস্থায় থাকবে তখন বর্শাটি তোমরা খুলে ফেল।
হযরত ওমর (রা) নামাযে মনোনিবেশ করলেন আর ঐ মোক্ষম সময়ে জনৈক সাহাবি বর্শাটি টান দিয়ে পা থেকে বের করে আনলেন আর ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে গেল। নামায শেষান্তে ওমর বললেন, আমার পায়ের বর্শাটি কোথায়? আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, হে ওমর-আমি জানি নামাযের সময় তোমার মন দুনিয়ায় থাকে না, তোমার মন চলে যায় আল্লাহর আরশে-আর সেই সুযোগটাই তোমার বন্ধু সাহাবিরা লুফে নিলেন। আল্লাহর সাহাবিরা ধূ ধূ মরুভূমির বালুচরে যখন নামায পড়তে দাঁড়াতেন তখন পাখীকূল সাহাবিদের মাথার ওপর এসে বসে পড়ত। তারা মনে করত, ঠাই দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের উপর আমরা বসেছি-যেন বৃক্ষের নেই কোন নড়াচড়া, নেই কোন অভিব্যক্তি।
বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানদের নামায আর সাহাবীদের নামায আকাশ পাতাল ফারাক। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, সালাত করা অবস্থায় তারা অত্যন্ত বিনয়ী হয় এবং তাদের মন আল্লাহর দিকে ঝুঁকে থাকে এবং অন্যদের প্রতি থাকে বিনম্র। হযরত আলী ইবনে আদি তালহা (রা) বলেন, খুশু এর অবস্থান হল অন্তরে।
হাসান বসরী (রা) বলেন, তাদের খুশু থাকে তাদের অন্তরে আর তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে। এ বিনয় ও নম্রতা ওই ব্যক্তি লাভ করতে পারে, যার অন্তকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, সালাতে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা সালাতে বেশি আগ্রহী। তখন মন হয় আনন্দে আপ্লুত এবং চোখে আসে শীতলতা। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন, আমার কাছে সুগন্ধি ও মহিলা খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু শীতলকারী হল সালাত-আহমদ ৩/১৯৯, নাসাঈ ১৭/৬১, ৬২। মহান আল্লাহতায়ালা মুমিনদের যে বিশেষত্ব বর্ণনা করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হল : তারা তাদের সালাতে যত্নবান থাকে অর্থাৎ তারা সালাতের সময়ের হেফাজত করে। ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, আমি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রসূল, আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা কোন আমলটি অধিক পছন্দনীয়? উত্তরে তিনি বললেন, সময়মত সালাত আদায় করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেন, মাতা-পিতার খেদমত করা। আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, এরপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, তোমাদের আমল সমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হল সালাত। আর ওজুর হেফাজত শুধু মুমিনই করে থাকে। সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের মুখ কালো হবে তারা হল নামায তরককারী। জাহান্নামে মালহাম নামক একটি অঞ্চল আছে। সেখানে বহু সাপ থাকে, তার প্রতিটি সাপ উটের ঘাড়ের মত মোটা এবং প্রায় ১ মাসের পথের সমান লম্বা। এই সাপ নামাজ তরককারীকে দংশন করবে। তার বিষ শরীরে ৭০ বছর ধরে যন্ত্রণা দিতে থাকবে। নামাযে কোন শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। তাদের জন্যে ওয়েল নামক দোযখ নির্ধারিত রয়েছে অর্থাৎ যারা রুকু ও সিজদা ঠিকমত করে না এবং কেবল ঠোকাঠুকি করে। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, সবচেয়ে বড় চোর হল সেই ব্যক্তি যারা নামাযে চুরি করে। আল্লাহর রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল, কিভাবে নামাযে চুরি করা হয়। রাসূল (সা) বললেন, যথাযথভাবে রুকু-সিজদা না করা ও বিশুদ্ধভাবে কোরআন না পড়া (আহমদ)। রাসূল (সা) বলেছেন, যখনই কেউ নামাজ পড়ে তখন একজন ফেরেস্তা তার ডানে এবং একজন ফেরেস্তা তার বামে থাকে। সে যদি সুষ্ঠুভাবে নামায শেষ করে তবে তারা উভয়ে সেই নামাজকে নিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছায়, নচেৎ তারা তা তার মুখের উপর ছুঁড়ে মারে (দারকুতনি)।
রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুষ্ঠুভাবে অযু করে, অতঃপর নামাযে দাঁড়ায়, সুষ্ঠুভাবে রুকু সেজদা ও কোরআন পাঠ দ্বারা নামায সম্পন্ন করে, তার নামায তাকে বলে, তুমি যেমন আমাকে সংরক্ষণ করেছ, তেমনি আল্লাহতায়ালা তোমাকে রক্ষা করুন অতপর তা আলোকরশ্মি ছড়াতে ছড়াতে আকাশের দিকে উঠে যায়। অতপর তার জন্য আকাশের দুয়ার খুলে যায় এবং আল্লাহর নিকট পৌঁছে গিয়ে উক্ত নামাযীর পক্ষে সুপারিশ করে। আর যখন রুকু সেজদা ও কোরআন পাঠ সুষ্ঠুভাবে করে না তখন নামায তাকে বলে, তুমি যখন আমাকে নষ্ট করলে, আল্লাহ তেমনি তোমাকে নষ্ট করুক।
অতপর তা অন্ধকারে আচ্ছন্ন অবস্থায় আকাশে উঠে যায়। তার জন্য আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অতপর তাকে পুরানো কাপড়ের মতন গুটিয়ে নামাযীর মুখের উপর ছুঁড়ে দেয়া হয়। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে একাগ্রচিত্তে ও মনোযোগ সহকারে নামাজ পড়ার তৌফিক দিন। আমিন।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 197 People

সম্পর্কিত পোস্ট