চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজসমূহে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ২:৫৬ অপরাহ্ণ

মো. জাওয়াদ উল আলম চৌধুরী

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজসমূহে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন

দেশের সরকারি ও বেসরকারি কলেজসমূহে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাশাপাশি স্নাতক (পাস) কোর্স ও স্নাতকোত্তর কোর্স পরিচালনা করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি অনুষদের অধীনে ৪৪টি বিষয়ে স্নাতক শ্রেণির পাঠদান করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভূক্ত কলেজের সংখ্যা ২২৪৯টি। এর মধ্যে ৮৫৭টিতে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। ১৪৫টিতে স্নাতোকোত্তর পড়ানো হয়।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে। বর্তমান সরকার কলেজসমূহের ভৌত সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের আওতায় ল্যাবরেটরী উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ রয়েছে।
ইউজিসির একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ থেকে পাস করা স্নাতকদের শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত নয়। এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের জন্য কলেজসমূহে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষকদের গবেষণা পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। সরকারি কলেজসমূহ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত ও পাঠদান হয়। সরকারি কর্মকমিশন পরিচালিত কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরিক্ষার (বিসিএস) মাধ্যমে অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো সরকারি কলেজসমূহে প্রভাষক পদে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে তাদের নিয়োগ ও কর্মজীবন শুরু হয়। কর্মজীবনে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাগণ না পায় অন্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো সুযোগ-সুবিধা, না পায় শিক্ষা ক্যাডারে ক্যারিয়ার গঠনে উচ্চতর ডিগ্রী ও গবেষণার সুযোগ। তাদের পদোন্নতি হয় অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে এমফিল, পিএইচডি, পোস্ট ডক্টরেট, জার্নাল প্রকাশনা ইত্যাদির কোন ভূমিকা নেই। প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত পদে পদোন্নতির কোন ধাপে গবেষণা, প্রকাশনার প্রয়োজন হয় না।
বেসরকারি কলেজসমূহে আনুপাতের ভিত্তিতে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদ পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আছে প্রশাসনিক, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আছে অবৈধ টাকা-পয়সার লেনদেন। বেসরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ রুদ্ধ রাখা হয়েছে। এখানে গবেষণার সুযোগ নেই। হাতেগোনা দু-চারজন শিক্ষক ব্যক্তিগত আগ্রহে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে গবেষণায় যুক্ত থাকলেও এ ক্ষেত্রে কোন প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা পায় না। সরকারিকরণ কলেজের ননক্যাডার শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
সরকারি বেসরকরি কলেজ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যমান পদোন্নতি ব্যবস্থার পাশাপাশি পদোন্নতিতে শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রী ও গবেষণা ও প্রকাশনার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ আশা রাখি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি হাজি মুহম্মদ মহসিন কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, রসায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞানী, ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলীর অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না হওয়া এবং এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায় এই সিনিয়র শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ৮ বছর যাবৎ সহযোগী অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। তাঁর ৩০টি জার্নাল প্রকাশনা আছে। তিনি ৭০টি এমএসসি থিসিস তত্ত্বাবধান করেছেন। তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদে অবসরে যাবেন এ আশক্সক্ষায় আছেন।
এটা হয়তো একটা উদাহরণ। এরূপ বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভূক্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজসমূহে অনেক যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে মেধাবী শিক্ষকরা গবেষণাবিমুখ হচ্ছেন, ঠিক তেমনি তাদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে হতাশার একটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে গবেষণা, প্রকাশনা ও উচ্চতর ডিগ্রীর কিছুটা সুযোগ যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত সরকারি-বেসরকারি কলেজসমূহ দেয় হতো তাহলে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পেত। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’ এ কথা যেমন সত্য তেমনি শিক্ষকদের মেরুদ- ঠিক রাখার জন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একান্ত আবশ্যক। এসব দাবী-দাওয়া আদায়ের জন্য শিক্ষকরা যদি রাস্তায় নামেন এর চেয়ে দু:খজনক বিষয় আর হতে পারে না। আমাদের দেশের শিক্ষকরা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল দেশের শিক্ষকরা উচ্চর বেতন স্কেল ভোগ করেন। এবং এসকল দেশে গবেষণা প্রকাশনার মূল্যায়ন আছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব শীর্ষক শিরোনামে বলা হয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সব স্তরে শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয় গভীরভাবে বিবেচনাপূর্বক পুনর্বিন্যাস করা হবে, যাতে তারা যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। শিক্ষা প্রশাসন অংশের ৫নং কৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে মেধা, দক্ষতা, ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন করা হবে এবং তাদের পদোন্নতির সুযোগ থাকবে। শিক্ষা প্রশাসন অংশের ৩নং কৌশলে বলা হয়েছে- বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার নিরিখে (উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন, মৌলিক গবেষণা কর্ম, শিক্ষদান পদ্ধতির উন্নয়ন ইত্যাদি) প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চতর পদে নিয়োগ দান করা হবে। যেমন প্রভাষক হতে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক হতে সহযোগী অধ্যাপক পদে। বেসরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত বিধিমালার আওতায় এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। বেতন বৃদ্ধি, সফল প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। বৃহত্তর পরিসরে শিক্ষকদের মৌলিক সুযোগগুলো নিশ্চিত করে অন্যান্য সুবিধা অর্জিত যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হবে। বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ তে শিক্ষকদের উচ্চতর পদগুলোয় পদোন্নতি সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বেসরকারি ডিগ্রী কলেজে কর্মরত এমফিল/পিএইচডি/প্রথম শ্রেণি প্রাপ্ত শিক্ষকরা পূর্বে ১০% সরাসরি কোটায় পিএসসির মাধ্যমে পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি কলেজে উচ্চতর পদে (সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে) নিয়োগ পেতেন। যা বিসিএস শিক্ষা সমিতির প্রবল বিরোধিতার মুখে সরকার স্থগিত করছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী লাভকারী শত শত গবেষক-শিক্ষক একদিকে যেমন সরকারি কলেজে যেতে পরেননি, অন্যদিকে বৈষম্যমূলক জনবল কাঠামো ও পদোন্নতি নীতিমালার কারণে উচ্চতর পদে পদোন্নতি লাভ এবং অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান নীতিমালায় তারা আরও বেশী বঞ্চিত হবেন।
শিক্ষাকে সহজতর করতে, শিক্ষকদের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষে সরকার আরো অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এ বিশ্বাস রাখি। আশা করি কোন যোগ্য শিক্ষক পদোন্নতির যাঁতাকলে পিষ্ঠ হবেন না। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রণায় ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা আশা করি আন্তরিক হবেন।

লেখক: মো. জাওয়াদ উল আলম চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, বি এ এফ শাহীন কলেজ।
পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
  • 83
    Shares
The Post Viewed By: 105 People

সম্পর্কিত পোস্ট