চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২০

কিংবদন্তী শিল্পী মুর্তজা বশীরের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৮ আগস্ট, ২০২০ | ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

মিরাজুল ইসলাম

কিংবদন্তী শিল্পী মুর্তজা বশীরের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

এক. আমাদের শিল্পাঙ্গনের প্রবাদপ্রতীম পুরুষ মুর্তজা বশীর ৮৯ বছরে পদার্পণ করার ঠিক দুই দিন আগে চিরবিদায় নিলেন। ১৫ আগস্ট থেমে গেল তাঁর ৮৮ বছরের পথচলা। সফল শিল্পী-জীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। যদিও তাঁর ইচ্ছে ছিল পাবলো পিকাসো থেকে অন্তত এক দিন হলেও বেশী বাঁচবেন। কিন্তু তা আর হলো না।
মুর্তজা যৌবনে নিজেকে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করলেও পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন, ‘আজ আমার বলতে মোটেও দ্বিধা নেই যে আমি মুর্তজা বশীর। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লার পুত্র।’
১৯৪৯ সালে তদানীন্তন ঢাকা আর্ট কলেজের ২য় ব্যাচে ভর্তি হওয়া কালোত্তীর্ণ শিল্পীদের মাঝে একমাত্র মুর্তজা বশীরই কালের সাক্ষী হয়ে এতোদিন বেঁচে ছিলেন আমাদের মাঝে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ এর মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তানে সর্বপ্রথম যে চারুকলা প্রদর্শনী হয় তরুণ মুর্তজা অংশ নিয়েছিলেন জয়নুল আবেদীন, শফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল হাসান প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পীদের সাথে। সেই থেকে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন পথ চলা শুরু।
চিত্রকলার উপর শিক্ষাগ্রহণ করেছেন ইতালীর ফ্লোরেন্সে। সংগ্রামী শিল্পীজীবন কাটিয়েছেন লন্ডন, প্যারিস, করাচি, লাহোর ও কলকাতায়। ১৯৫৯ সালে করাচিতে বাঙালি শিল্পী হিসেবে মুর্তজার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিলো।
১৯৫২ সালে ভাষাসৈনিক হিসেবে এঁকেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের জন্য অসামান্য ড্রয়িং। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়েছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ম্যুরাল। এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঝামা পাথরের ম্যুরাল হিসেবে স্বীকৃত।
তাছাড়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি উৎসর্গকৃত ‘এপিটাফ’ সিরিজ, সমাজের দমবন্ধ করা বৈষম্য ও ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের বিমূর্ত ক্যানভাসের ‘দেয়াল’ সিরিজ, অন্তর্গত বোধের আনন্দ আখ্যানমূলক রঙ মাখানো ‘পাখা’ সিরিজ, আধ্যাত্মিক অনুভাবনার ‘কলেমা’ সিরিজসহ মূর্ত-বিমূর্ত অসংখ্য শিল্পকর্মে আমাদের শিল্পজগৎকে মুর্তজা ঋণী করে গেছেন।
১৯৮০ সালে ‘একুশে পদক’ ও ২০১৯ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ শিল্পীর কাজের স্বীকৃতির প্রাপ্তিকে সম্পূর্ণ করেছে।
আঁকাআঁকি জগতের বাইরে মুর্তজা’র রয়েছে নিজস্ব লেখক ও গবেষক সত্তা। ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র ঈদ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত উপন্যাস ‘আল্ট্রামেরিন’। তবে শিল্পীর প্রথম ছোট গল্প ‘পার্কের একটি পরিবার’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায়। তাছাড়া মুর্তজা প্রকাশ করেছেন গল্প সংকলন ‘গল্পসমগ্র’ ও চারটি কাব্যগ্রন্থ। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের নাম ‘সাদায় এলিজি’। গবেষক হিসাবেও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র কনিষ্ঠ পুত্র মুর্তজা নিজস্ব কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলার হাবশী সুলতানদের নিয়ে করেছেন মৌলিক গবেষণা। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির একজন সম্মানিত সদস্য।
দুই.
পুরোনো আমলের দুর্লভ মুদ্রা সংগ্রহ করা ছিল মুর্তজা’র প্রিয় নেশা। বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে তাঁর মতো মুদ্রা সংগ্রাহক বিরল। বিশেষ করে তাঁর সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন মুঘল সম্রাটদের আমলের এক শিক্কা মূল্যমানের মুদ্রাগুলো সংগ্রাহকের দৃষ্টিকোণ থেকে অমূল্য।
বাবর-হুমায়ূন-আকবর-জাহাঙ্গীর-শাহজাহান-আওরঙ্গজেব-শাহ আলম-২য় আকবর শাহ ছাড়াও তাঁর সংগ্রহে আছে নূরজাহান ও শাহজাদা মুরাদের নামাঙ্কিত মুদ্রার দুর্লভ সব সংগ্রহ। তাছাড়া দিল্লি সুলতানী আমলেরও অনেক দুর্লভ মুদ্রা তাঁর সংগ্রহে আছে। সম্ভবত আমাদের জাতীয় যাদুঘরও অতটা সমৃদ্ধ নয়। শেষ বয়সে মুর্তজা অবসর সময় কাটাতেন বিভিন্ন দেশের দুর্লভ মুদ্রা সংগ্রহের মাধ্যমে। তাঁর এই নেশা ছিল আমৃত্যু।
তিন.
গত দুই দশকের বেশী সময় মুর্তজার সাথে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ সূত্রে একান্তে শিল্পীকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। চট্টগ্রাম ছিল শিল্পীর আঁতুড়ঘর। মুর্তজার শিল্পী সত্তার সর্বোচ্চ উন্মেষকাল কাটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। সেইসব স্মৃতি রোমন্থনে মুর্তজা ছিলেন সহজাত ও স্বচ্ছন্দ। ২০১৪ সালে একটা ব্যক্তিগত মজার গল্প শুনিয়েছিলেন আমাদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উচ্চারণ বিভ্রাট নিয়ে। মুর্তজা বশীরের বয়ান থেকেই তা তুলে ধরলাম।
‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন মুর্তজা। ডিপার্টমেন্টের জিনিষ-পত্র রিকুইজিশন দেবার সময় বিভিন্ন আইটেমের নাম বলছিলেন আর অফিস স্টাফ তা কাগজে লিখে নিচ্ছিল। এইসব দ্রব্যাদির বাজেট পাশ করতেন ভিসি মহোদয়। কিছুদিন পর মুর্তজা বশীরের ডাক আসলো তৎকালীন ভিসি আবদুল করিম সাহেবের কক্ষে।
‘কি এমন হলো?’ চিন্তা করতে করতে বশীর গেলেন তাঁর কাছে। ভিসি স্যার একটা কাগজ দেখিয়ে জানালেন চারুকলা ডিপার্টমেন্টের ‘চাহিদা-তালিকা’ তিনি পেয়েছেন কিন্তু একটা বিষয় তিনি বুঝতে পারছেন না। কি বিষয় জানতে চাইলে করিম সাহেব বললেন, আপনার বিভাগে এতোগুলো ‘প্রেমের কাঠ’ কেন লাগছে বুঝতে পারছি না আর সেটাই বা কি?
ব্যাপারটা বুঝতে মুর্তজা বশীরের নিজেরও খানিক্ষণ সময় লাগলো …। পরে বুঝতে পেরে হেসে দিলেন।
আদতে শব্দটা ছিল ‘ফ্রেমের কাঠ’।
খাস চাঁটগাইয়া অফিস সহকারীটি তা লেখার সময় ভেবেছিলেন মুর্তজা আঞ্চলিক উচ্চারণে ‘ফ্রেম’ কে ‘প্রেম’ বলতে চেয়েছেন..’।
চার.
মুর্তজা বশীর চট্টগ্রামে এসেছিলেন ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন আগস্ট মাসের ১ তারিখে।
মুর্তজা তাঁর উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবী হতে শিশিরের মতো ঝরে যাবে বছর।’ মুর্তজা নিজে বহুবার বলেছিলেন চট্টগ্রামে কাটানো স্মৃতি তাঁর মানসলোক থেকে কখনো ম্লান হবে না।
তার প্রমাণ দিতে মুর্তজা ২০০৩ সালে তেলরং-এ আঁকা আত্মপ্রতিকৃতিতে জুড়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এর স্মৃতিচিহ্ন। চট্টগ্রামের প্রতি ভালোবাসার স্মারক।
মুর্তজা ছিলেন আগাগোড়া আত্মমগ্ন শিল্পী। শিল্পের বাজারে বাণিজ্যকরণের দিকে ঝুঁকেন নি। কাটিয়ে গেছেন সংগ্রামী শিল্পীজীবন।
ক্ষণজন্মা চিত্রপরিচালক জহির রায়হান ১৯৬৯ সালে মুর্তজার সার্বিকতা নিয়ে লিখেছিলেন, ‘মুর্তজা বশীর একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। নিঃসঙ্গ চিত্রকর। নিঃসঙ্গ লেখক। তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গতার অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তিনি চান হীরের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি। তিনি মানুষকে ঘৃণা করেন। ঘৃণা করেন বলেই হয়তো তাদেরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেও জানেন।’
আজ এতো বছর পরও কথাগুলো প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
মনে হয় মুর্তজা এখনো মাথা নেড়ে বলছেন, ‘জানো তো, আমার মতো করে কেউ আগে এই কাজটি করে নি। আমিই প্রথম এমন করে আঁকলাম।’
মুর্তজার গড়া মূর্ত-বিমূর্ত কাজগুলোর দিতে তাকালে কথাটা অমূলক মনে হয় না।
১৯৮০ সালে যে বছর শিল্পী একুশে পদক পেয়েছিলেন তখন মুর্তজা বশীর নিজ সমাধির জন্য এপিটাফে লিখেছিলেন,
‘সে পাখী হতে চেয়েছিলো, কিন্তু ডানা ছিলো না।’
মুর্তজা গত ১৫ আগস্ট সকালবেলা অবশেষে পাখী হয়ে উড়ে গেলেন, স্বর্গের কাছাকাছি কোন এক অজানা গন্তব্যে।

লেখক: মিরাজুল ইসলাম কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট।
পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 196 People

সম্পর্কিত পোস্ট