চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৭ আগস্ট, ২০২০

সর্বশেষ:

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’

২৩ মে, ২০২০ | ১১:১১ পূর্বাহ্ণ

রতন কুমার তুরী

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’

খুশির ঈদে নজরুলের চিরকালিন আহবান ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন হাত মেলাও হাতে’। নজরুলের রচিত গানগুলো বর্তমানে নজরুল সঙ্গীত এবং নজরুলগীতি হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। মুলত নজরুল যে গানগুলো নিজে লিখে নিজেই সূরারোপ করেছিলেন সেগুলোকে নজরুল সঙ্গীত হিসেবে ধরা হয়। আর যে গানগুলো নজরুল লিখেছিলেন ঠিকই কিন্তু সূর দিতে পারেননি সেগুলোকে নজরুলগীতি বলা হয়। নজরুল তার সীমিত জীবদ্দশায় চার হাজারেরও অধিক গান রচনা করে গেছেন।
এসব গান প্রায়ই তার সূরারোপ করা। এরমধ্যে ‘চল, চল, চল ঊর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল’ গানটি বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বেশ জনপ্রিয়। নজরুলের অসংখ্য গান জনপ্রিয় হয়েছে দেশি-বিদেশি চমৎকার শব্দ ব্যবহারের কারণে। সেই ধরনেরই কিছু আরবি শব্দমালার একটি অসম্ভব জনপ্রিয় ঈদের গান হচ্ছে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে বিলিয়ে দে আজ শোন আসমানি তাগিদ।’ এই গানটি নজরুল মূলত বাংলাদেশের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে রচনা করেছিলেন। ১৯৩১ সালে এই গানটি নজরুল রচনা করে তৎকালিন কলকাতার নামি রেকর্ডিং কোম্পানি এইচএমভিকে দিয়ে রেকর্ড করিয়েছিলেন শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠেই। ঠিক এর পর থেকেই এই গানটি ভারতীয় উপমহাদেশে বেশ জনপ্রিয়। ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই এই একমাত্র গানটি বাজবেই বাজবে। নজরুল গানটির প্রথম ছত্রেই এক হৃদয়ভেদি ফরিয়াদ করেছেন। তিনি বলেছেন- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে বিলিয়ে দে আজ শোন আসমানি তাগিদ/তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ দে যাকাত/মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙ্গাইতে নিদ… ওমন রমজানের..।’
ঈদের দিনে নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়ার এই আহবান ঈদের পরিবেশকে এক অন্যমাত্রা দান করেছে। অপরদিকে সোনাদানা বালাখানা মসজিদে কিংবা গরীবকে যাকাত হিসেবে দান করার যে আকুতি নজরুল এই ঈদের গানটিতে জানিয়েছেন, তাতে করে অনেকেই এই গান শোনে গরীবদের প্রতি তাদের ধন-সম্পদের কিছু অংশ বিলিয়ে দিতে কিংবা যাকাত হিসেবে দিতে উৎসাহিত হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে নজরুল, ইসলামের গভীরতত্ত্বগুলো পড়াশোনার মাধ্যমে আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এমনকি তিনি খুব সফলভাবে পবিত্র কুরআন শরীফ পড়ে তার বাংলা বুঝতে পারতেন আর তাই তিনি গানটির প্রথম চরণে আসমানি তাগিদ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। এই আসমানি তাগিদ হলো পবিত্র কুরআন শরিফের বাণী।
এখানে উল্লেখ্য যে, জীবনের প্রথম দিকে তিনি মক্তবে ছাত্রদের আরবি শিক্ষা দিতেন। ফলে নজরুলের ইসলামি জ্ঞান ছিলো প্রখর। আর তাই তিনি ঈদের গানটিতে বেশকিছু ইসলামি শব্দ বসিয়ে আরো হৃদয়গ্রাহি করে তুলতে পেরেছিলেন। এর ফলে গানটি ব্যাপক মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলো। নজরুলের জনপ্রিয়
এই ঈদের গানটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সবচেয়ে অর্থবহ চরণটি হলো- ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন, হাত মেলা হাতে/তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামের মুরিদ।’
নজরুল ঈদের দিন বন্ধু কিংবা শত্রুর কথা ভুলে গিয়ে এক হয়ে ইসলামের জন্য কাজ করতে সবাইকে আহবান করেছেন, যা সত্যিই অভাবনীয়। গানটির সর্বশেষ চরণে নজরুল এক অপরিসীম সাম্যের বাণি উচ্চারণ করেছেন তিনি বলেছেন- ‘তোরে মারল ছুঁড়ে জীবনজুড়ে ইট পাথর যারা/সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ/ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,/তুই আপনাকে বিলিয়ে দে আজ শোন আসমানি তাগিদ।’
সারাজীবন যারা মানুষকে অত্যাচার করেছে তাদেরকে এই ঈদের দিনে ভালোবাসা দিয়ে প্রেমের মসজিদ তৈরির করার নজরুলের এমন অসাধারণ আহবান আমাদের মুহূর্তের মধ্যেই পার্থিব জগৎ থেকে কয়েক মিনিটের জন্য অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়। আর ঠিক তখনি ঈদ হয়ে ওঠে আরো স্বর্গীয়।

রতন কুমার তুরী কলেজশিক্ষক।

The Post Viewed By: 319 People

সম্পর্কিত পোস্ট