চট্টগ্রাম বুধবার, ২৭ মে, ২০২০

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ আইনে অপরাধ ও শাস্তি

২০ এপ্রিল, ২০২০ | ৩:১১ পূর্বাহ্ণ

জিয়া হাবীব আহসান

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ আইনে অপরাধ ও শাস্তি

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরী অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে একটি বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। আইনটির নাম সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১ নং আইন)। বাংলাদেশের সম্প্রতি দুই-তৃতীয়াংশ জেলায় নভেল করোনা ভাইরাস (ঈঙঠওউ-১৯) ছড়িয়ে পড়ায় পুরো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছেন সরকার। উক্ত আইনের ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে গত বৃহস্পতিবার সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে উক্ত ঘোষণা প্রদান করে। আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ আইনটি সম্পর্কে একেবারেই নতুন ও অনবিজ্ঞ। কারণ এই ধরনের ভয়ংকর জীবাণুবাহী ছোঁয়াচে রোগ আমাদের জন্য একেবারেই নতুন। যেখানে পুরো উন্নতবিশ্ব এর মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে সেখানে এই রোগ প্রতিরোধে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা এক প্রকার ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ। কেননা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার এক একজন ব্যক্তি এক একটি মানববোমা, যার সংস্পর্শে আসলে শত শত মানববোমার সৃষ্টি হয়।

ইতিপূর্বে আমরা ম্যালেরিয়া, কলেরা, ফাইলেরিয়াসিস, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এভিয়ান ফ্লু, নিপাহ ভাইরাস, এন্যাথ্রাস, মারস-কভ, জাপানিস এনকেফালাইটিস, ডায়রিয়া, যক্ষ্মা, শ্বাসনালীয় সংক্রামণ, এইচআইভি এইডস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, মেনিনজাইটিস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা, চিকনগুনিয়া, প্লেগ প্রভৃতি সংক্রমক ব্যধির নাম শুনলেও করোনাভাইরাস সম্পূর্ণ নবোবদ্ভব বা পুনরুদ্ভব ছোঁয়াচে রোগ হয়। যার কোন ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। ফলে সরকার আইনটির ৪(ভ) ধারার বিধান মতে নতুন জীবাণুবাহী ব্যধি নভেল করোনাভাইরাসকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সংক্রামক ব্যধি ঘোষণা করেছে। সাথে সাথে পুরো দেশকে উক্ত বিশেষ আইনের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে তা প্রতিরোধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। পুরো সিভিল প্রশাসন যন্ত্রের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার বিধানমতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশন প্রাপ্ত অফিসার উক্ত সরকারী নির্দেশ তথা বিশেষ আইনটি কার্যকর করতে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করারও ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ও মোবাইলকোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্ত আইন ভঙ্গকারীকে তৎক্ষণিক সাজা, জরিমানা ইত্যাদি প্রদান করেছে বিধায় এই সম্পর্কে সুক্ষ্ম জ্ঞান থাকা জরুরী। বাংলাদেশ দ-বিধির ২৬৯, ধারায় অবহেলামূলক কাজ দ্বারা জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রামণ বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে বা বিস্তার করে তার ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত কারাদ-, ২৭০ ধারা বিদ্বেষপ্রসূত কাজ যার দ্বারা জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রামণ বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে তৎ ক্ষেত্রে ২ (দুই) বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয়দ- এবং ২৭১ ধারায় সঙ্গরোধ সংক্রান্ত নিয়ম অমান্য করার শাস্তি ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদ- বা অর্থদ- শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৬১ নং বিশেষ আইনটি প্রণীত হওয়ায় বর্তমানে দ-বিধির বিপরীতে স্পেশাল’ল প্রাধান্য পাবে।
আইনটির ৫ ধারায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অধিদপ্তর উক্ত আইনের আওতায় যেকোন উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে যেকোন গণজমায়েত, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষাণাসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। ৬ ধারার একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটি, ৭ ধারায় কমিটির কার্যাবলী, ৮ ধারায় কমিটির সভা সংক্রান্ত বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে, ৯ ধারায় বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার বিধি বিধানের অনুসরণ, ১০ ধারার সংক্রামক রোগের তথ্য সংগ্রহ, ১১ ধারায় সংক্রামিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান এবং ১২ ধারায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা, ১৩ ধারায় রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিকর্তৃক ব্যবহৃত দ্রব্যাদির বিশুদ্ধতা বা ধ্বংস করার ক্ষমতা, ১৪ ধারায় রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বিছিন্ন করনের বিধান, ১৫ ধারায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিদর্শন, ১৬ ধারায় সংক্রমিত স্থান বা স্থাপনা জীবানু মুক্তকরণ বা বন্ধকরণ ইত্যাদি, ১৭ ধারায় স্থাপনা ধ্বংসকরণ, ১৮ ধারায় যানবাহন জীবাণু মুক্তকরণের আদেশ প্রদানের ক্ষমতা, ১৯ ধারায় জীবাণুযুক্ত যানবাহন দ্রব্যাদি জব্দকরণ, ২০ ধারায় মৃত দেহের সৎকার, ২১ ধারায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, ২২ ধারায় আমদানী ও রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, ২৩ ধারায় সরকারী ব্যয়ের অর্থ ফেরত গ্রহণের ক্ষমতা ইত্যাদি সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়েছে।
উক্ত আইনের ২৪, ২৫, ২৬ ধারায় শাস্তি ও দ- সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়েছে। ২৪ ধারার মতে যদি কোন ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা ঘটাতে সাহায্য করেন বা জ্ঞাত থাকা স্বত্বেও অপর কোন ব্যক্তি বা সংক্রামিত ব্যক্তি বা স্থাপনার স্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার নিকট গোপন করেন তাহলে উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনুর্দ্ধ ৬ (ছয়) মাস কারাদ-ে বা অনুর্দ্ধ এক লক্ষ টাকা অর্থদ- বা উভয়দ-ে দ-িত হবেন। ২৫ ধারার বিধান মতে মহাপরিচালক, সিভিল সার্জেন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানালে উক্ত অপরাধের জন্য ৩ (তিন) মাস কারাদ- বা অনুর্দ্ধ ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয়দ-ে দ-িত হবেন। ২৬ ধারার বিধান মতে সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা স্বত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন তার শাস্তি দুই মাস কারাদ- বা অনুর্দ্ধ ২৫ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয়দ-ে দ-িত হবেন। অত্র আইনে অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপীল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য। ৩১ ধারায় আইনের অস্পষ্টতা, অসঙ্গতা দূরীকরণ, ৩২ ধারায় আইনের উদ্দেশ্য পূরণে বিধি প্রণয়ন গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি ও ৩৩ ধারায় তপশীল সংশোধন ইত্যাদির ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আইনটি সম্পর্কে আশা রাখি সংশ্লিষ্ট সকলের ধারণা পরিষ্কার হবে।

জিয়া হাবীব আহসান আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী।

The Post Viewed By: 252 People

সম্পর্কিত পোস্ট