চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০

সর্বশেষ:

করোনার শিক্ষা : প্রকৃৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে

১৬ এপ্রিল, ২০২০ | ৩:২৬ পূর্বাহ্ণ

জহিরুদ্দীন মো. ইমরুল কায়েস

করোনার শিক্ষা : প্রকৃৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে

পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পরিবেশবিদেরা ছিলেন সবসময় সোচ্চার। পরিবেশ উন্নয়নকল্পে জাগ্রত সচেতন মানুষেরা ছিল সর্বদা বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। কিন্তু কোনভাবে পরিবেশকে দূষণমুক্ত করা যায়নি। যায়নি গাড়ী থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত বন্ধ করা, যায়নি শিল্পাঞ্চল থেকে পরিবেশ দূষণের উপাদান বন্ধ করা, যায়নি গ্রিনহাউজ থেকে জলীয় বাস্প আর কার্বন ডাই ওক্সাইড প্রদাহ বন্ধ করা। দূষণে দূষণে পৃথিবীতে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। পরিবেশ দূষণের কারণে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নানান ভয়ঙ্কর রোগ-বালাই। এই রোগ-বালাইয়ে বছরপ্রতি পৃথিবীতে মারা পড়েছে প্রায় আটাশি লক্ষ মানুষ। মানুষের অতি লোভে বন্ধ হয়নি দূষণযুক্ত কোন রুগ্ন কারখানাও। বেশিরভাগ মানুষই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এই পৃথিবীতে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে এই গ্রহ আর বেশিদিন টিকবে না বলে বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা ভবিষ্যৎবাণী করলেও মানুষের লোভের কাছে পরাজয় ঘটেছে সবকিছুর। মানুষ যখন ব্যর্থ হয়েছে পৃথিবী থেকে দূষণ বন্ধ করতে। পরিবেশবিদরা যখন ব্যর্থ হয়েছে তাদের কথা পৌঁছে দিতে বিশ্বশাসক শ্রেণির কাছে। তখন করোনা ছড়িয়ে পড়লো সারাবিশে^। এতে মানুষ ঢুকে গেলো ঘরে। প্রকৃতিতে আসলো সুদিন। দূষণের মাত্রা কমে গেলো বিষ্ময়করভাবে। ফলে অনেকে বলতে শুরু করেছেন, প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত তার ভ্রমা- বাঁচাতে কিনা নিজেই এগিয়ে এলো করোনাভাইরাস ছড়িয়ে! এ কথায় যুক্তি কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক আছে, সন্দেহ নেই। তবে আমরা যে প্রকৃতি ধংস করে নিজেদের জন্যে বিপদ ডেকে আনছি, সে বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।
একটু দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যাবে, করোনাভাইরাস শুরুর প্রাক্কালে চীনের উহান শহরের আকাশ ছিল ঘন কালো অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু মরণব্যাধী করোনাভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ছিল উহানসহ চীনের অন্যান্য অংশে, অনন্যোপায় হয়ে বাধ্য হয় উহান শহর তালাবন্ধ করতে। আর এই লকডাউনের কারণে মাস যেতে না যেতেই উহানের আকাশ ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় মাস খানেক আগের উহানের আকাশ এবং বর্তমান উহানের আকাশের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মানুষ যেখানে কারখানা বন্ধ করার জন্য কখনো রাজী ছিল না সেখানে মাসের পর মাস এতো বড় বাণিজ্যিকশহর তালাবন্ধ করে রাখা ছিল ধারণার অতীত। নিজের অস্থিত্ব বাঁচানোর জন্য মানুষের দ্বিতীয় কোন বিকল্প ছিল না। শুধু উহান নয়, করোনাভাইরাসের মরণছোবল মেরেছে এখন ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়াসহ সারা পৃথিবীতে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শহরই লকডাউনের মধ্যে। আর এই লকডাউন কিংবা কারফিউর সুযোগে সারা ভ্রমান্ডের মানুষ জান বাঁচাতে যখন ঢুকে পড়েছে গৃহে তখন প্রকৃতি তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে আপনমনে যেন নৃত্য করছে। গাছপালা যেমন দূষণমুক্ত পরিবেশে আনমনে দোল খাচ্ছে, তেমনিভাবে প্রকৃতির অন্যান্য সদস্যরাও যেমন পশুপাখি, মৎস্য, বন্যপশু থেকে শুরু করে সবকিছু যেন নবজীবন ফিরে পেয়ে প্রকৃতিতে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানোর এক অপূর্ব দৈবঘটনার জন্ম দিয়েছে। সত্তর লক্ষ মানুষের শহর চট্টগ্রামে জানালার পাশে আড়ি পাতলেই নানান প্রজাতির পক্ষিকূলের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিরল সবুজ প্রজাতির ডলফিনেরা খেলা করে বেড়াচ্ছে। এ এক নৈসর্গিক দৃশ্য। এ রকম কখনো শোনা যায়নি যে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কিনারে ডলফিনেরা খেলা করতে পারে। গত দশ দিনের টানা লকডাউনের কারণে একশত ত্রিশ কোটি জনবসতিপূর্ণ ভারতের অনেক দূষিত শহরের আকাশ হঠাৎ করে উন্নতি হতে শুরু করেছে। অনেক শহরে ঝঁকঝঁকে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটির প্রতিবেদনে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের ৩০টির মধ্যে ২১টি ছিল ভারতের। তারমধ্যে দিল্লী হলো সবচেয়ে দূষিত শহর। সরকারী দূষণ প্রতিবেদনে এক সপ্তাহেই দিল্লীর বায়ুতে ২.৫ (পিএম) বস্তুকণার পরিমাণ ৭১% হ্রাস পেয়েছে। টানা ২১ দিন লকডাউনে দিল্লীর বস্তুকণার পরিমাণ নিশ্চিতভাবে স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে চলে আসবে। গত ২৬ মার্চ তারিখ দিল্লীর এসপিএম রেটিং ছিল ৬৯ যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩০৬। কোলকাতায় নেমে এসেছে ৭৪; ১৫৩ থেকে। নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণও কমেছে ৭১%। দিল্লী, মুম্বাই, কোলকাতা, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোরসহ ভারতের সবগুলো শহরের পরিবেশের অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। বিবিসি সূত্রে জানা যায়, ইউরোপে লকডাউনের কারণে বৃটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, স্পেন, ইটালীসহ প্রায় প্রতিটি দেশের পরিবেশের আমূল পরিবর্তিত সাধিত হচ্ছে। দূষিত গ্যাসের পরিমাণ কমে আসছে। জীবাস্ম তৈলের থেকে নিসৃত নাইট্রোজেন ডাইওক্সাইড হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ ঘরে বসেই ফ্রেস এয়ারের ঘ্রাণ পাচ্ছে। যদিওবা করোনা থাবার কারণে বাহিরের খোলা আকাশে এখন সেভাবে বেরুতে পারছে না। ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঞ্জেলিয়ার প্রফেসর ড. ফিলিপ উইলিয়ামসন বলেন, লকডাউনের পর যে পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড সরে যাচ্ছে জলবায়ু বিপর্যয় রোধ করার জন্য লকডাউন আরো একবছর থাকা উচিত। শহরগুলো কয়েক সপ্তাহ আগে যেখানে ধোঁয়াশা ছিল সেসব শহরে এখন পরিস্কার নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। লন্ডন, রোম, মিলানের বায়ুদূষণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। করোনার থাবায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশের একটি ইটালি। এখানে এ পর্যন্ত সতেরো হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুই লক্ষের মতো মানুষ। তারপরেও ইটালি একটি বিষয়ে খুশি হতে পারে যে, ভেনিসের খালের পানি ক্রিস্টাল ক্লিয়ার হয়ে সেখানে এখন ডলফিনসহ নানা প্রজাতির মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ দৃশ্য বিগত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। এই সময়ে ভেনিসে সাতলক্ষ পর্যটক বেড়াতে আসেন নৌপথে। এখন সব নিস্তব্ধ। পুরোপুরি শান্ত এখন ভেনিসের পরিবেশ। ড. উইলিয়ামসন আরো বলেন- বর্তমানে বাতাসের দ্রুত গুণগতমান সাধিত হচ্ছে, যা বন্যজীবনের পাশাপাশি আমরাও উপকৃত হবো। করোনার তান্ডব থেকে রক্ষা পেতে হলে আরো অনেক দেশ লকডাউন্ করতে বাধ্য হবে। এভাবে পৃথিবীর আকাশ বাতাস আরো কমনীয় এবং উজ্জ্বল হবে। বিগত ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশেও চলছে লকডাউন স্টাইলে একটানা সরকারী ছুটি। এই টানা ছুটির কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশের আপামর পরিবেশ যে নির্মল হচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, বস্তুকণার পরিমাণ এবং বাতাসের গুণগতমান নিঃসন্দেহে উন্নতি হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বায়ুদূষণে বাংলাদেশে প্রতিবছর আশি হাজার লোকের মৃত্যু হয়।
করোনার মারাত্বক ছোবলে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়ে কোন হাসপাতালের বেডে শুয়ে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে কাতরাচ্ছে। করোনা কোন মায়ের বুক খালি করছে, কোন ছেলে তার মাকে হারাচ্ছে। ছেলে তার বাবাকে হারাচ্ছে বাবা তার ছেলেকে হারাচ্ছে। করোনার থাবায় অনেক পরিচিত মূখ আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছে। করোনার ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ডাক্তার আর স্বাস্থ্য কর্মীরাও। করোনা চিনে না কোন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-উঁচু-নিচু-জাত-পাত-উন্নত-অনুন্নত। করোনার কারণে বিশ্বে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ধ্বংস হচ্ছে, জিডিপি নেমে যাচ্ছে, পৃথিবীর সব শেয়ার বাজারগুলো ধসে পড়েছে, চাকুরী হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, উড়োজাহাজ আর পর্যটনব্যবসায় নেমেছে একেবারে ধস। যতদিন পর্যন্ত করোনার প্রতিরোধে একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন না বানানো যাচ্ছে ততোদিন হয়তো মানুষকে ঘরের মধ্যেই বন্দি করে রাখবে করোনা। মানুষের অবাধ স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে কোভিড-১৯। এতোকিছুর পড়েও আমাদের কাছে একটি সুখবর হলো করোনার কারণে পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশের যে অভাবনীয় উন্নতি ঘটছে এটা কোন টাকার অঙ্কে হিসাব করা সম্ভব নয়। পৃথিবী নামক গ্রহটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় আমাদের জন্যে আরো বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

জহিরুদ্দীন মোঃ ইমরুল কায়েস কলামিস্ট, পরিবেশকর্মী।

The Post Viewed By: 363 People

সম্পর্কিত পোস্ট