চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১৩ এপ্রিলের ট্র্যাজেডি ও অমৃতের পুত্র : শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী

১৩ এপ্রিল, ২০২০ | ১:০২ পূর্বাহ্ণ

নাসিরুদ্দীন চৌধুরী

১৩ এপ্রিলের ট্র্যাজেডি ও অমৃতের পুত্র : শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী

১৩ এপ্রিল, একাত্তরের চরম বিভীষিকাময়, বীভৎস, ভয়াবহ এবং ভীষণ রকম অশুভ একটি দিন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই এদিন ঝরে গেল পাঁচটি অমূল্য প্রাণ। কু-েশ্বরীতে অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহ, পাহাড়তলী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সম্মুখে জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র ছাত্রনেতা সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী, কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী, চাকসুর জিএস আবদুর রব, বোয়ালখালী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মোজাফফর আহমদ। এক একটি মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারি।
সাইফুদ্দিনÑরবের হত্যাকা- চট্টগ্রামের মুক্তি সংগ্রামরত ছাত্র-জনতার কাছে একটি বজ্রাঘাততুল্য দুঃসংবাদ। কারণ অসহযোগ আন্দোলন থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ পর্যন্ত তারা চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতার পুরোভাগে স্থান নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তদুপরি সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী ছিলেন তদানীন্তন চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত জননেতা, আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা, সংগ্রাম কমিটির মূল নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি ১৯৬৭ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই ছাত্র সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন। ৭০ সালে ‘অভিযাত্রিক’Ñএর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আর সিটি কলেজ ছিলো চট্টগ্রামের ছাত্র আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। সরাসরি ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে নির্বাচন করা যেত না বলে ‘অভিযাত্রিক’ নামে ছাত্রলীগ নির্বাচন করতো। কেবিনেট বরাবর ছাত্রলীগের দখলেই থাকতো। কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল করিম চৌধুরী ছাত্রবৎসল ও ছাত্ররাজনীতির বিশেষত ছাত্রলীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে সিটি কলেজ ছাত্রলীগের দুর্গে পরিণত হয়েছিলো।
সাইফুদ্দিন অভিযাত্রিক তথা ছাত্রলীগের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। পিতা জহুর আহমদ চৌধুরী সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলে নয়, আপন যোগ্যতা বলেই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। নেতৃত্বের সমস্ত গুণই তাঁর ছিলো, যেমন সাহস। পিতার ন্যায় শীর্ণ দেহটি ছিলো যেন জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, সময়ে জ্বলে উঠতে যার বিলম্ব হতো না। একটি ঘটনা এখানে উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে। পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে ফেরদৌস কোরেশী-আল মুজাহিদীর নেতৃত্বে বাংলা ছাত্রলীগ নামে একটি নতুন সংগঠনের সৃষ্টি হলে চট্টগ্রামে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব দেয়া হয় মহাবলী কিবরিয়াকে। এই সেই কিবরিয়া, একদা এনএসএফ-এর দৌরাত্ম্যের মুখে যার বাহুবলে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এবার তিনি খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ছাত্রলীগ ধ্বংসের মিশনে নামলেন। তা’ প্রথমেই তাঁর চোখ পড়লো সিটি কলেজের ওপর। কারণ একে তো তিনি এই কলেজের ছাত্র, তদুপরি তাঁর মারামারি, নেতাগিরি সব এই কলেজকে ঘিরেই। শহরের রাজনীতির ওপরও সিটি কলেজের বিরাট প্রভাব ছিলো। তাই কিবরিয়া সিটি কলেজ দখল করতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। একদিন তিনি সদলবলে কলেজ আক্রমণ করতে গেলে কিবরিয়া-ভীতির কারণে কেউ তার সামনে দাঁড়াবার সাহস তো পেলোই না, বরং পড়ি মরি করে ছুটে পালাতে লাগলো। কিন্তু না হঠাৎ দেখা গেলো হালকা পাতলা একটি ছাত্রই কিবরিয়াকে রুখে দাড়িয়েছে। সেটিই সাইফুদ্দিন।
অসম লড়াই, কিবরিয়ার সামনে সাইফুদ্দিন কিছুই না, ফুৎকারেই উড়ে যাওয়ার কথা। তবুও টাইসনকে মুষ্ট্যাঘাত করে সাইফুদ্দিন বলেছিলেন, ‘কিবরিয়া গু-ামি করবি না, তোর দিন শেষ।’ তার পরের দৃশ্যে কিবরিয়ার প্রত্যাঘাতে সাইফুদ্দিন রক্তাক্ত। এতেই কাজ হয়। কিবরিয়ার আগমনে যারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো, তারাও এবার সম্বিৎ ফিরে পায় এবং সাইফুদ্দিনের সমর্থনে এগিয়ে আসে। এখানে সাইফুদ্দিন কিবরিয়াকে কতটা আঘাত করতে পেরেছিলেন, সেটা ধর্তব্য নয়। বিবেচ্য বিষয় হলো সাইফুদ্দিন একা কিবরিয়াকে প্রতিরোধ করতে গিয়েছিলেন এবং নিজের শরীরের রক্ত ঝরিয়ে ছাত্রলীগের দুর্গকে বেদখল হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এই ঘটনা থেকে সাইফুদ্দিনের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সাহস ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় ফুটে ওঠে।
সাইফুদ্দিন খালেদ অর্থ ‘ধর্মের তলোয়ার’। স্ত্রী জাহানারা বেগমের কোল আলো করে যখন প্রথম শিশুপুত্রটি জন্মগ্রহণ করে, তখন জহুর আহমদ চৌধুরী সাধ করে তার নাম রেখেছিলেন সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী। পুত্রটি বড় হয়ে সার্থকনামা হয়েছিলো। অন্যায় দেখলেই এই তরবারি ঝলসে উঠতো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হয়েও বীরের মতো লড়াই করতে করতে প্রাণ বিলিয়ে দিতে এতটুকু বুক কাঁপেনি তাঁর। ১৩ এপ্রিল বীর সাইফুদ্দিন, রব, দিলীপ, মোজাফফরের ট্র্যাজিক মৃত্যুর মহিমায় উদ্ভাসিত। ২৮ মার্চ চেরাগী পাহাড়ে বশরুজ্জামান, জাফর, দীপক, মাহবুবুল আলমের আত্মবলিদানের পর ১৩ এপ্রিলের হত্যাকা-ই ছিলো বড় ঘটনা, যেখানে চট্টগ্রামের দু’জন বড়ো মাপের ছাত্রনেতা, একজন কলেজের অধ্যাপক, আরেকজন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই স্বাধীনতার বেদীমূলে আত্মাহুতি দেন। সিটি কলেজের ছাত্রসমাজের অবিসংবাদিত নেতা সুলতান উল কবির চৌধুরী, যিনি দুর্জয় সাহসে কিবরিয়াকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও চলে যাচ্ছিলেন। ট্রেনিং, সাহস ও কৌশলের কারণে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান তিনি। এখন জানা যাচ্ছে হারুনুর রশিদ রুশ্নি নামে আনোয়ারার একজন ছাত্রনেতাও পাহাড়তলী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে মারা যান। সুলতান, সাইফুদ্দিন, রবদের দলে তিনি ছিলেন না। তাই তিনি কখন পাহাড়তলীতে মারা যান, সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তবে তিনিও সেখানেই শহীদ হয়েছেন বলে তাঁর ছোটভাই অধ্যক্ষ এনামুর রশীদ চৌধুরী জানিয়েছেন। মায়ের কাছে একটি টাকা চেয়ে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে আর মায়ের কোলে ফিরে যান নি।
সাইফুদ্দিনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে আরো ছিলেন ফিরোজ আহমদ, রামুর সিদ্দিক, ড্রাইভার ইউনুস ও তার সহকারি (নাম জানা যায় নি), মিরসরাইর রুস্তম ও জনৈক নুরুল ইসলাম। ড্রাইভার ইউনুসও পাক বাহিনীর হামলায় শহীদ হন। শহীদ রব, দিলীপ, মোজাফফরের কথা আগেই বলা হয়েছে। এই দলটি কিভাবে গঠিত হয়েছিলো, তা জানা সম্ভব হয় নি।
অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী ছিলেন কানুনগোপাড়া কলেজের গণিত শাস্ত্রের অধ্যাপক, মোজাফফর আহমদ বোয়ালখালী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ড্রাইভার ইউনুসও বোয়ালখালীর আকুবদ-ী গ্রামের বাসিন্দা। অসহযোগ আন্দোলন থেকে অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী বোয়ালবালী থানা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে থাকেন এবং কালুরঘাটে যুদ্ধরত বাঙালি সৈনিকদের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ করার পাশাপাশি তাদেরকে খাদ্য ও অন্যান্য রসদ সরবরাহ করেন। কালুরঘাট প্রতিরোধ ঘাঁটির পতনের পর অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী দলটিকে গাইড করে ১২ এপ্রিল বান্দরবানে নিয়ে যান। তারা ইতিমধ্যে বোয়ালখালীতে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণও নেন। সেদিনই পাহাড়ি চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পদুয়া হয়ে চন্দ্রঘোনা যাত্রা করে ভারতে থেকে যুদ্ধাস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরৗও তাদের সহযাত্রী হন। তারা ইতিমধ্যে বোয়ালখালীতে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণও নেন। ৯ এপ্রিল দিলীপ চৌধুরী তার দলের সদস্যদের সাতকানিয়া রাস্তার মাথায় জিপের উপর বসিয়ে রেখে ঢেমসায় গিয়ে তাঁর মায়ের সাথে দেখা করেন। তাঁরা যুদ্ধাস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে বান্দরবানে পৌছেন। এদিকে সুলতান, রব, সাইফুদ্দিন, সিদ্দিক, রুস্তম পটিয়া থেকে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সৈনিকদের সাথে তাদের গাড়িতে করে বান্দরবানে যান।
সেখানে তৎকালীন এসডিও আবদুস শাকুরের সাথে দেখা করে তাঁর কাছে ভারতে যাবার পথের সন্ধান চান। তিনি তাদেরকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক দিয়ে চন্দ্রঘোনা, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান হয়ে রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবার পরামর্শ দেন। তাঁর পরমার্শ মেনে সুলতান-সাইফুদ্দিনরা চন্দ্রঘোনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথে অনেক ইস্টবেঙ্গল ও ইপিআর সৈনিকের সাথে দেখা হয়, তারাও চন্দ্রঘোনার দিকে যাচ্ছিলেন। এক জায়গায় দ্রুতগামী একটি জিপ তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে দেখলে সেটি থামাতে চেয়ে ব্যর্থ হন। জিপটি বেশিদূর যেতে পারে নি, একটি পাহাড়ি ছড়ার ওপর উল্টে পড়ে যায়। ইতিমধ্যে সুলতান-সাইফুদ্দিনরাও সেখানে উপস্থিত হন।
জিপের আরোহীদের মধ্যে অন্তত দু’জনকে আগে দেখেছেন বলে মনে হলো সুলতানের। এবার জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন তাদের নাম অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী ও মোজাফফর আহমদ। সুলতান-সাইফুদ্দিনরাও পরিচয় দিলেন। সবার গন্তব্য অভিন্ন জেনে একসঙ্গে যাওয়া সাব্যস্ত হলো এবং সবাই ধরাধরি করে জিপটিকে খাড়া করে চড়ে বসলেন। রাতেই তারা চন্দ্রঘোনা পৌঁছলেন কিন্তু কর্ণফুলী পার হবার ফেরি পেলেন না। সকালে পার হলেন। দোভাষী বাজারে নাস্তা ফেরে আবার যাত্রা শুরুর উপক্রম করতে স্থানীয় লোকজন বাধা দিয়ে বললেন, শুনেছি, কাপ্তাই রোডে পাকিস্তানি আর্মি এসে গেছে, আপনারা এখন সেদিকে গেলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের উন্মাদনায় স্থানীয় লোকদের কথায় কর্ণপাত করার মানসিকতা কারো ছিলো না। তারা রওনা দিলেন। জিপের সামনের আসনে অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী, আবদুর রব ও মোজাফফর আহমদ।
পেছনের সিটে সুলতান, সাইফুদ্দিন, ফিরোজ, সিদ্দিক, রুস্তম, নুরুল ইসলাম ও ড্রাইভারের সহকারি। জিপে ছিলো বঙ্গবন্ধু’র স্বাধীনতার ঘোষণার কপি, প্রচারপত্র, অয়ারলেস সেট ও কিছু বেতার যন্ত্রপাতি। জিপের সামনে ছিলো একটি সাবমেশিন গান, কয়েকটি রাইফেল ও বেশ কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড। জিপ দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলো। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কিছু আগে একটি মাজারের মোড় পার হতেই হঠাৎ খোলা রাস্তা। একপাশে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, অন্য পাশে ইমাম গাজ্জালী কলেজ। চৈত্রের সকাল বেলার সূর্যের তেজ ঠিকরে পড়ছিলো, রাস্তায় সুনসান নীরবতা। হঠাৎ একটি লোক যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হলো। ড্রাইভার ইউনুস গাড়ির গতি শ্লথ করে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন রাস্তা পরিষ্কার আছে কি না। সে হ্যাঁ বলতে ড্রাইভার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। ইমাম গাজ্জালী কলেজ পার হবার সাথে সাথেই সেটআপটা ধরা পড়ে গেলো। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাহাড়ে ওঁৎ পেতে বসে আছে শত শত পাকিস্তানি সৈন্য। ড্রাইভার কড়া ব্রেক করলেন। কিন্তু তখন আর করার কিছু নেই। ঝাঁক ঝাঁক রাইফেল, মেশিনগানের গুলিবৃষ্টির সামনে উলঙ্গ জিপ। কোনো আড়াল নেই কোথাও।
প্রথম গুলিতেই চাকা ফেটে গাড়ি অচল হয়ে যায়। অরক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যুত্তর দেয়ার চেষ্টা করলেন। গুলি নিঃশেষ হয়ে যায়। টপ টপ করে একজন একজন করে পড়ে গেলেন চট্টগ্রামে ভবিষ্যতের অসীম সম্ভাবনাময় দুই নেতা। প্রথমে সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী, তারপর চাকসু ভিপি আবদুর রব। ততক্ষণে পাকিস্তানি সৈন্যরা পাহাড় থেকে নেমে এসে জিপ ঘিরে ফেলে, গাড়ি থেকে ধরে ধরে নামায় অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ, ফিরোজ আহমদ ও ইউনুসকে। সুলতান আঁকা বাঁকা দৌড়ে ও ক্রলিং করে পাহাড়ে ওঠে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সিদ্দিক, রুস্তমও তাকে অনুসরণ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান। ধৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পিছমোড়া করে বেঁধে উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা চালায়। তারপর সবার পকেট তল্লাশি করে সব বের করে নিয়ে ব্রাশ ফায়ার। গুলি খেয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরী, আবদুর রব, মোজাফফর আহমদ ও ইউসুস। ড্রাইভারের সহকারির কোনো খোঁজই আর পাওয়া যায় নি। ফিরোজ গুলি খেয়ে আহত হয় বটে, তবে বেঁচে যায়। পরে তাকে মেডিক্যালে দেয়া হয়। সেখান থেকে নিজেকে অবাঙালি পরিচয় দিয়ে বেঁচে যায়।
সাইফুদ্দিনের বন্ধু কলামিস্ট ইদরিস আলমের লেখা থেকে জানা যায়, তিনি ও সাবেক মন্ত্রী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এমএ মান্নান ২৮ মার্চ সাইফুদ্দিনকে পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরায় সিটি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়িতে রেখে আসেন। সম্ভবত কুসুমপুরা থেকেই সাইফুদ্দিন পরে কোনো এক সময় পটিয়া সদরে সুলতান ও ফিরোজের দেখা পান এবং তাদের সঙ্গে ভারত গমনকালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে পাক বাহিনীর এমবুশে পড়ে শাহাদাত বরণ করেন। সাইফুদ্দিন খালেদ ১৯৪৭ সালে দামপাড়া পল্টন রোডে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সিটি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মুক্তিযুদ্ধে লিবারেশন কাউন্সিল ইস্টার্ন জোনের চেয়ারম্যান এবং বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সদস্য জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তা’ দেশে-বিদেশে প্রচারের জন্য জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছেই পাঠিয়েছিলেন। সাইফুদ্দিনের মাতার নাম জাহানারা বেগম।

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র সাংবাদিক, সাস্কৃতিক সংগঠক।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 253 People

সম্পর্কিত পোস্ট