চট্টগ্রাম বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২০

সর্বশেষ:

চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তন : কারণ ও প্রতিকার 1

১৮ মার্চ, ২০২০ | ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ডা. হাসান শহীদুল আলম

চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি

চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তন : কারণ ও প্রতিকার

পর্ব ৪

ফাগুনের প্রথম সপ্তাহ। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। পটিয়াস্থ চেম্বার। চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তনের কারণসমূহের পর্যালোচনা লিখছিলাম। তার ধারাবাহিকতায় আজকের লেখায় প্রথমে থাকছে : ঘ) দুর্বিষহ যাতায়াতব্যবস্থা : প্রসঙ্গক্রমে নিজের কথা কিছুটা লিখছি। ১৯৮৩ সাল। একসময় পোস্টিং হলো চরজব্বার হেলথ কমপ্লেক্সে উপজেলা মেডিকেল অফিসার হিসেবে। মাইজদী থেকে নোয়াখালী সদর অর্থাৎ সোনাপুর। সোনাপুর থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করে চরজব্বার যেতে হতো মুড়ির টিন নামক গ্যাস সিলিন্ডারচালিত বাসে। কোন রাস্তা না থাকাতে চরের মধ্য দিয়ে বাস চলতো।
ধু ধু চরের মাঝে বাস যান্ত্রিক গোলযোগে থেমে গেলে হাঁটা ছাড়া কোন উপায় থাকতো না। অফিসে বসার জন্য আলাদা টেবিল চেয়ার ছিলো না। স্বাস্থ্যসহকারীর সাথে চেয়ার ভাগাভাগি করে একই টেবিলে কাজ করতে হতো। বিদ্যুৎ, খাবার পানি, থাকার আবাসন কিছুই ছিলো না। ১৯৮৩ সাল থেকে ২০২০ সাল। বিগত ৩৮ বছরে কয়টি উপজেলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য রিক্সা-টেম্পু চলাচল উপযোগী রাস্তা হয়েছে?
কেন স্বাস্থ্যখাতে ১২৫০০০ কোটি টাকার জায়গায় মাত্র ২০ শতাংশ অর্থাৎ ২৬০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়? অনেক সরকারী চিকিৎসক চাকুরী জীবনের প্রথম দু’বছর যে সব জায়গায় পোস্টিং পান, যে ধরনের স্থাপনায় বসে অফিস করেন সেখানে একজন এএসপি/জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর জীবনে গাড়ী নিয়ে ঘুরতেও যাওয়ার কথা নয়। অনেক জায়গায় গাড়ী নিয়ে যেতেও পারবেন না।
কারণ রাস্তা নেই। কি পরিমাণ কষ্ট করে, সময় ব্যয় করে একজন উপজেলা মেডিকেল অফিসার তাঁর কর্মস্থলে পৌঁছান স্বচক্ষে না দেখলে বিশ^াস হবে না। এমন জায়গায় অনেকে পোস্টিং পান যেখানে শুধু হেলিকপ্টারে গিয়ে প্যারাসুট দিয়ে নেমে অফিস করে আবার হেলিকপ্টারে করে ফিরে আসা যাবে। সরকারী কোন ট্রান্সপোর্ট সুবিধে থাকে না। হয় হেঁটে অফিসে যান, নতুবা সারাদিনের জন্য রিক্সা ভাড়া করে নেন। অনেক জায়গা আছে যেখানে যেতে হলে নৌকা ছাড়া যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা। এ জেলার উত্তর ও উত্তরপূর্বে পাহাড়ীয়া অঞ্চল। সেই শেরপুরের পাহাড়ের কোলে যেখানে গোধূলির সাথে নেমে আসে বুনো হাতির পাল সেখানে পোস্টিং হয়েছিলো জনৈক সাংবাদিকের সদ্য মা হওয়া স্ত্রীর। ৫-৬ মাসের নবজাতককে নিয়ে সেই ডাক্তার মা বিদ্যুৎবিহীন এক একটা রাত সেখানে পার করেছিলেন। অন্য কোন ক্যাডারের কর্মকর্তা কি পারবেন ঐ জঙ্গলের মধ্যে এভাবে একা থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে? কারো প্রতি ইঙ্গিত আমি করছি না। তারপরও বলছি, সার্কিট হাউজের এসি রূমে বসে বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ পড়ে হলিডে উদযাপনের পরিকল্পনা করা আর ঝিঁ ঝিঁ পোকা এবং শিয়ালের পিলে চমকে দেয়া ডাকসমেত বসবাস করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা এক জিনিস নয়।
ঙ) কর্মস্থলের দূরবস্থা : বিসিএস (স্বাস্থ্য) পোস্টিং-এ জনৈক চিকিৎসককে কোন এক গ-গ্রামে পাঠানো হয়েছিলো। প্রমত্তা পদ্মায় ঝড়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে তাঁকে যেতে হতো। সেখানে তাঁকে ধ্বংসস্তূপে থাকতে বলা হয়েছিলো। বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে মোবাইলের টর্চলাইটে তাঁকে চিকিৎসা দিতে হতো। আয়রনযুক্ত সাপ্লাইয়ের পানির পাইপ মাটির নীচে ফেটে দুর্গন্ধময় পানি ছড়িয়ে পড়তো। চিকিৎসক নিজের পকেটের টাকা খরচ করে পানি কিনে খেতেন।
‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার বসার জন্য টেবিল, চেয়ার নেই, লিখার জন্য কলম নেই। রোগী দেখার জন্য সরকারী কাগজও নেই, রোগীকে দেয়ার জন্য ওষুধও নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন। সেখানে সহকারী সার্জন বা মেডিকেল অফিসার হলেন ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার (জনৈক চিকিৎসক, ডাক্তার, প্রতিদিন ডটকম ৩০-১২-১৭)।” আমার দেখা প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : তিন পেয়ে চেয়ার, ভাঙ্গা টেবিল এবং গ্রিল ভাংগা জানালা। উপজেলা পর্যায়ে অন্যান্য অফিসের তুলনায় সবচেয়ে বেশী নোংরা, অপরিচ্ছন্ন অফিস হচ্ছে উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারের কামরা। এমনি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য দায়ী হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে অপ্রতুল বাজেটের কারণে দশজনের জায়গায় দু’জন পরিচ্ছন্নকর্মী দিয়ে হাসপাতাল চালাতে বাধ্য হওয়া। আর এমনি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপজেলা মেডিকেল অফিসারের চাকুরীকে আকর্ষণহীন করে তুলছে।
অন্যান্য ক্যাডারদের সাথে তুলনা করে দেখলে চিকিৎসকদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ দেখা যায়। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ বা তথ্য কর্মকর্তার পোস্টিং হয় জেলা লেভেলে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পোস্টিং হয় উপজেলা লেভেলে। প্রকৌশলীদের পোস্টিং হয় উপজেলা লেভেলে। সবার জন্য গোছানো অফিস থাকে। যার যার কর্মচারীর বহর থাকে। বিশেষ করে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের অফিস স্ট্যাটাস আর স্টাইলের সাথে বাকীদের কোনভাবেই মেলানো যায় না। অফিশিয়াল নিরাপত্তা, খেদমতে ওস্তাদ কর্মচারী বাহিনী, সন্ধ্যা হলে টেনিস কোর্ট, গাড়ী, জনমানুষে এবং জনমানসে অবতারসম শ্রদ্ধা অথবা ভয়-কি নেই এই মহামহিমদের জীবনে।
যে কোন সরকারী দিবসে, খেলাধুলা, পরীক্ষার সময় মেডিকেল টীম গঠন করা হয়। সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে উপজেলা মেডিকেল অফিসার পাঠানো হয়। অধিকাংশসময়ই দেখা যায় চিকিৎসককে বসার চেয়ার পর্যন্ত দেয়া হয় না বা চিকিৎসক বসার জন্য চেয়ার ফাঁকা থাকে না। নিজেকেই একটা চেয়ার খুঁজে নিয়ে বসতে হয়।
চিকিৎসকের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব হচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন ও জনপ্রশাসনের। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য প্রশাসনের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে জনপ্রশাসন একই প্রোগ্রামে আগত অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের যতোটা গুরুত্ব দিতে দেখা যায় চিকিৎসকদের তার ছিঁটেফোঁটাও দিতে দেখা যায় না।
চ) কর্মস্থলে সহযোগিতার অভাব : ১) অপর্যাপ্ত সেবাকর্মী নিয়োগ : বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের সাথে তিনজন নার্স থাকা আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হচ্ছে প্রতি ১ জন চিকিৎসকের সাথে মাত্র ০.৪ জন নার্স। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় নার্স রয়েছে ১৩.৩ শতাংশ।
২) হাসপাতালের আউটডোরে সহযোগিতার অভাব : মেডিকেল অফিসার রোগী দেখার সময় রোগীদের সিরিয়াল বজায় রাখার জন্য কেউ থাকে না। তাছাড়া রোগীদের ভাইটাল উপসর্গ রেকর্ড করার জন্য সরকারিভাবে কোন সেবাকর্মী থাকে না।
উপসংহার : চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। এর ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ। চিকিৎসাদানের প্রধান দায়িত্ব চিকিৎসকদের। এ জন্য যে কোন জায়গায় সেটা শহর হোক, গ্রাম হোক, সভ্যতার ছোঁয়াবিহীন অজপাড়া গাঁ হোক চিকিৎসককে সেখানে কষ্ট স্বীকার করে অবস্থান করে জনগণের চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আমরা সবই স্বীকার করছি। কিন্তু সেখানে যাবার রাস্তাটা ঠিক আছে কিনা, চিকিৎসালয়ে চিকিৎসকের প্রাণ ধারনের ব্যবস্থা থাকছে কিনা, চিকিৎসকের নিরাপত্তা বিশেষ করে নারীচিকিৎসকের সম্ভ্রম বজায় থাকছে কিনা, রোগীদের দেয়ার জন্য ওষুধপত্র আছে কিনাÑ এগুলো দেখার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।
কিন্তু মাত্র বিশ শতাংশ অপ্রতুল বাজেট প্রদান করে রাষ্ট্র যদি উল্লিখিত দায়িত্বসমূহ পালন না করে তবে চিকিৎসালয়ে যদি চিকিৎসক পৌঁছতে না পারেন, থাকতে না পারেন, সেবাকর্ম করতে না পারেন, রোগীদের দেয়ার জন্য ওষুধ না পান, তবে সে জন্য চিকিৎসক একা কেন দায়ী হবেন? এ অবস্থায় চিকিৎসক যদি পেশা পরিবর্তনের চিন্তা করেন তবে সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, জাতির দুর্ভাগ্য। পরবর্তী লেখায় এ সম্পর্কে আরো থাকছে।

ডা. হাসান শহীদুল আলম ডায়াবেটিস ও চর্ম-যৌন রোগে ¯œাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 2 People

সম্পর্কিত পোস্ট