চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০

৭ মে, ২০১৯ | ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভাটি অঞ্চলের সোনার কন্যার জন্য আর গাইবে না কেউ

বাংলা গানের কিংবদন্তী একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই। বাংলাদেশ সময় আজ মঙ্গলবার ভোররাত সাড়ে চারটায় সিঙ্গাপুর থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন সুবীর নন্দীর কন্যা ফাল্গুনী নন্দী। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা গানের জগতে একটি যুগের অবসান ঘটল।

ঢাকায় চিকিৎসা চলাকালীন একবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন সুবীর নন্দী । শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয় তাঁকে। সেখানে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ১৮ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এ চিকিৎসাধীন থাকার পর সাত দিন আগে গত ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় সুবীর নন্দীকে। সেদিন বিকেলেই সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে শিল্পীর চিকিৎসা শুরু হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের এমআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন দেশবরেণ্য এই সংগীতশিল্পী।

বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার দুই দিন পর তাঁর শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলেও এরপর ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালেও পরপর তিনবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। সবশেষে মঙ্গলবার ভোরের আলোয় অজস্র ভক্তকে কাঁদিয়ে বিদায় নেন সুবীর নন্দী।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বাংলাদেশে সুবীর নন্দীর চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয় করছিলেন। গতকাল সোমবার সকালে সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘বারবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় চিকিৎসকেরা যে আশা করেছিলেন, তা-ও ক্ষীণ হয়ে গেছে। এখন সুবীরের অবস্থা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।’ উল্লেখ্য, সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন।

হবিগঞ্জ জেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর জন্ম সুবীরের। শিল্পীর বাবা সুধাংশু নন্দী তখনকার একজন মেডিকেল অফিসার ছিলেন। বাবার চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে চা বাগানেই । পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত সেখানের একটি স্কুলেই পড়তেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময় কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে।

মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি সঙ্গীতের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তার মা পুতুল রানী খুবই চমৎকার গান করতেন। কিন্তু পেশাদারি সঙ্গীতে আসেননি কখনও। সুবীর নন্দীর বয়স যখন ৭-৮ বছর বড় ভাই তখন ওস্তাদের কাছে গান শিখতেন। মায়ের কাছে গান শেখার বায়না ধরেন সুবীর। মা বললেন, এখন তুমি আমার কাছেই শেখ। আরেকটু বড় হও তারপর ওস্তাদের কছে শিখবে। ভাই তপন কুমার নন্দীর কাছ থেকেও সুবীর নন্দী গানের তালিম নিয়েছেন। এরপর স্থানীয় জগদীশপুর হাইস্কুলেও গান শিখেছিলেন তিনি । তাছাড়া দীর্ঘদিন পরলোকগত ওস্তাদ বাবর আলী খান সাহেবের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন তিনি।

১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। জীবনের প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন ১৯৬৭ সালে রেডিওতে। পেশাগতভাবে সঙ্গীতে আসা হয় সত্তরের দশকে। সুবীর নন্দীর প্রথম প্লে-ব্যাক রাজা হোসেন খান ও সুজেয় শ্যামের (রাজা শ্যাম) সঙ্গীত পরিচালনায় আবদুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্য গ্রহণ’ ছবিতে ১৯৭৪ সালে। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করে চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।

সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ১৯৮১ সালে বাজারে আসে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে। দীর্ঘ ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রেও উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। এ বছরই সংগীতে অবদানের জন্য দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয় তাঁকে।

বিদায় সুবীর নন্দী, বিদায় কিংবদন্তী।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 417 People

সম্পর্কিত পোস্ট