চট্টগ্রাম বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

৩ মে, ২০১৯ | ৩:১০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ধেয়ে আসছে ‘ফণী’

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’। এটি আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঘূর্ণিঝড়টি আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ কলকাতায় আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামীকাল শনিবার ভোর ৬টার দিকে বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব দিকে আঘাত হানতে পারে। সমুদ্র উপকুলীয় এলাকা মংলা ও পায়রাকে ৭ এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৪ নম্বর সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ৪-৫ ফুট জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও রয়েছে।
গ্লোবাল ডিজেস্টার এন্ড কো-অর্ডিনেশন সিস্টেম ঘূর্ণিঝড় ফণীর সম্ভাব্য গতিপথ প্রকাশ করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, পূর্ব ভারতে ওডিশা প্রদেশের পুরী শহরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আঘাত হানতে পারে ‘ফণী’। এরপর আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ কলকাতায় আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার ভোর ৬টা নাগাদ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে আঘাত হানতে পারে।
এদিকে ‘ফণী’র দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে কর্মস্থলে অবস্থান করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। গ্লোবাল ডিজেস্টার এন্ড কো-অর্ডিনেশন সিস্টেম ঘূর্ণিঝড় ফণীর সম্ভাব্য গতিপথও প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৯টায় ঘূর্ণিঝড়টি মংলা বন্দর থেকে ৯১৫ কিলোমিটার ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৬৫ ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুরসহ অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এজন্য উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্ত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ বাংলাদেশে আঘাত হানলে ক্ষতি কমিয়ে আনতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আব্দুল আজিজ আহমেদ। সাভার সেনানিবাসের ফায়ারিং রেঞ্জে সেনাবাহিনীর বার্ষিক ফায়ারিং প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন তিনি। এজন্য সেনাবাহিনীর সব ডিভিশন ও এরিয়া হেডকোয়ার্টারকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, জনগণ সাইক্লোন শেল্টারে আসার পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোনো অবনতি না হয়, পুলিশ, আনসার, কোস্টগার্ড সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। এজন্য ফায়ার ব্রিগেড, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার, কোস্টগার্ড প্রস্তুত রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ফণী’র সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্যোগ মোকাবেলায় চট্টগ্রামেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২৭৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। এতে আট লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ পাবে। ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে সিভিল সার্জন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক। এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর, সিটি কর্পোরেশন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, কোস্টগার্ড, পিডিবিসহ সরকারি-বেসরকারি, স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংস্থা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। জেলা ও উপজেলাসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ব ও পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে প্রস্তুতির বিষয়ে তদারকি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও দুই হাজার ২৬৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলে আট লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ পাবে। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় নগদ নয় লাখ টাকা, ৪২৭ মে.টন চাল, ৭শ বান্ডিল ঢেউটিন, সাড়ে ৬ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ৬ হাজার ৬৬০ জন সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক, রেড ক্রিসেন্টের ১০ হাজার ছাড়াও বিএনসিসি, স্কাউটের স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বিভাগ ৫০ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১ হাজার ৪শ পিস হাইজিন কিডস মজুত রেখেছে। আরও এক লাখ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী পূর্বকোণকে জানান, ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ উপজেলায় ৫টি করে ৭০টি, ২শ ইউনিয়নে ১টি করে মোট ২০০টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৫টি এবং নগরে আরও ৯টি আরবান ডিসপেনসারি টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি টিমে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট মিলিয়ে তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ৮৫২ জনের টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ৯ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও সাড়ে ৪ লাখ ওরস্যালাইনও মজুদ আছে। এছাড়াও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বলেন, প্রত্যেক উপজেলায়ও আলাদা-আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। উপকূলীয় উপজেলাগুলো সন্দ্বীপ, সীতাকু-, মিরসরাই, আনোয়ারা, বাঁশখালীতে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয় ও সাইক্লোন শেল্টারে চলে যেতে মাইকিং করে অনুরোধ করা হচ্ছে। সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যে কোনো তথ্য ও সেবা পেতে কন্টোল রুমের টেলিফোন নম্বরে (৬৩০৭৩৯, ৬৩৩৪৬৯) যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে চসিক। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নগরের পতেঙ্গাসহ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সহায়তা দিতে মেয়রের নির্দেশে চসিক কাজ শুরু করেছে। চসিকের পক্ষ থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। এজন্য চসিকের স্বেচ্চাসেবক, মেডিকেল টিমকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার ও স্যালাইন বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এদিকে, নগর ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা বলেন, পুলিশের সকল সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নগরীর ১৬টি থানাকে সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুর রহমান। থানার পাশাপাশি সিএমপি সদর দপ্তরও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করবে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের চৌকস সদস্যদের নিয়ে একশ সদস্যের একটি বিশেষ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটলে দলটি কাজ শুরু করবেন। ইতোমধ্যে সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ শুরু করা হয়েছে। নগরের পাহাড়তলী এলাকার বিজয় নগরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। পাহাড় পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করা লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসের শঙ্কা রয়েছে। এ জন্য পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করা লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং ও অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পাহাড়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ৮টি প্রি-পেইড মিটারসহ ১টি ট্রান্সফরমার জব্দ করা হয়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 358 People

সম্পর্কিত পোস্ট