চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

৩০ এপ্রিল, ২০১৯ | ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

গ্রাম আদালতে বিচারিক প্যানেল

নারীর অংশগ্রহণ ১০%

গ্রাম আদালতে বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। পক্ষান্তরে পুরুষের অংশ হচ্ছে ৮৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অথচ গ্রাম আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্যতম হচ্ছে জেন্ডার সমতা অজর্ন করা।
বিচারপ্রার্থী ও বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ করে যাওয়ায় বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, নারীরা দুর্বল ও আবেগপ্রবণ বলে দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এছাড়াও নারীদের সক্ষমতার বিষয়ে পুরুষের নেতিবাচক ধারণা ও নারীদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া। গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের আওতায় জেন্ডার ও গ্রাম আদালত বিষয়ক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সচেতনতামূলক কর্মশালায় এই তথ্য ওঠে এসেছে। গতকাল (সোমবার) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েল স্থানীয় সরকার বিভাগ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এই কর্মশালার আয়োজন করে।
চট্টগ্রামের ১৯১ ইউনিয়নে গ্রাম আদালত চালু রয়েছে। তবে জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৪৬ ইউনিয়নে দাতা সংস্থার অর্থায়নে প্রকল্প হিসেবে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ৪৬ ইউনিয়নে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে চলতি মাস পর্যন্ত বিচারপ্রার্থী ও বিচারিক প্যানেলের সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায় বিচার প্রার্থী হিসেবে ৮৮৭ জন নারী অংশগ্রহণ করেন। পুরুষের অংশগ্রহণ এক হাজার ৬৭৬ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ২৫০ জন। পুরুষের সংখ্যা দুই হাজার ১৬০ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
জেলার ফটিকছড়িতে বিচারপ্রত্যাশী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ হচ্ছে ২০১ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ৪৪৫ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ৬০ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ৪৯২ জন। লোহাগাড়ায় বিচারপ্রত্যাশী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ ১৪৯ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ২৬০ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ৪১ জন। পুরুষের সংখ্যা ৩০৫ জন। সন্দ্বীপে বিচারপ্রত্যাশী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ ১৫৪ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ৩৪৯ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ৬৬ জন। পুরুষের সংখ্যা ৫৭৭ জন। সাতকানিয়ায় বিচারপ্রত্যাশী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ ১৯৭ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ৪৩৫ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ৫১ জন। পুরুষের সংখ্যা ৫৪১ জন। সীতাকু-ে বিচারপ্রত্যাশী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ ১৮৬ জন। পুরুষের অংশগ্রহণ ১৮৭ জন। বিচারিক প্যানেলে নারীর অংশগ্রহণ ৩২ জন। পুরুষের সংখ্যা ২৪৫ জন।
স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, আদালতে মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গ্রামের মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ের ছোট-খাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে মানুষ অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে ও অতি সহজে বিরোধ মীমাংসা করার সুযোগ পায়। সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকার মূল্যমানের মামলা গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তি করা যায়। এখানে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ নেই। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দুইজন ইউপি সদস্য ও দুই গণ্যমান্য ব্যক্তির সমন্বয়ে জুড়িবোর্ড গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া করার বিধান রয়েছে। ফৌজদারি মামলায় ১০ টাকা ও দেওয়ানি মামলায় ২০ টাকা ফিস দিয়ে আবেদন করা হয়। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালতের বিচার কাজে আস্থা সৃষ্টি করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ছোট একটি মামলার বিচার কাজ অনেক সময় ১৫ বছরেও শেষ হয় না। মামলার পেছনে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তার থেকে মুক্তি পেতে গ্রাম আদালত সক্রিয় ও শক্তিশালী করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন থানায় বিচার-সালিশ করা হয়। থানায় তো বিচার হওয়ার কথা নয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে ভোটের রাজনীতি ও বৈষম্যমূলক মনোভাব থাকার কারণে গ্রাম আদালতকে পুরোপুরিভাবে কার্যকর করা হচ্ছে না। মানুষ থানা-আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছে। এজন্য গ্রাম আদালতের আইনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. নুরুল আলম নিজামী বলেন, গ্রাম আদালত হচ্ছে সত্যিকার আদালত। হাইকোর্ট ডিভিশনের মতো জুরিবোর্ডের মাধ্যমে বিচার কাজ সম্পন্ন করা হয়। গ্রাম আদালতে বিচারযোগ্য অনেক মামলা উচ্চ আদালতে চলে যায়। এতে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। গ্রাম আদালতে অভিযোগের ক্ষেত্রে ২০ টাকা ফি ছাড়া কোন ধরনের টাকা জমা নেওয়া হয় না। ৭ দিনের মধ্যে দুইপক্ষকে নোটিস দিয়ে অবহিত করতে হয়। ভোটের রাজনীতি ও পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির ডিস্ট্রিক্ট ফ্যাসিলিটেটর উজ্জ্বল কুমার দাস চৌধুরীর পরিচালনায় কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল হুদা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পটিয়া সার্কেল) মো. জসিম উদ্দিন খান, সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তসলিমা আক্তার, উন্নয়নকর্মী জেসমিন সুলতানা পারু, এডভোকেট জেবুন নাহার লীনা, ছদাহা ইউপি সদস্যা আমেনা বেগম প্রমুখ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 317 People

সম্পর্কিত পোস্ট