চট্টগ্রাম বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

১৯ অক্টোবর, ২০২০ | ২:৫৭ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

বিমানে স্বর্ণ পাচারে চার বন্ধু

চার বন্ধু মিলে দশ বছর আগে দুই কোটি টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন দুবাইতে। চারজনের একজন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা। বাকি তিনজনের দুইজন ফটিকছড়ি একজন হাটহাজারীর বাসিন্দা। চারজনের সিন্ডিকেটের একজন নগরীতে অবস্থান করলেও বাকি তিনজন থাকেন দুবাইতে। এ চারবন্ধুর পর্তুগালে রয়েছে হোটেল ব্যবসা। দশ বছর আগের সেই দুই কোটি টাকা থেকে চার বন্ধু এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তারাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন বিমানে স্বর্ণ পাচারের রুট। বিমানের সিটের নীচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে আনা হচ্ছে স্বর্ণের চালান। মাঝে মাঝে বহনকারী ধরা পড়লেও মূল পাচারকারীরা কখনো আইনের আওতায় আসেনা। প্রায় সময় শুল্ক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কখনো বিমানের সিটের নিচে, সিটের পাইপের ভেতর কিংবা শৌচাগার থেকে স্বর্ণের বার উদ্ধার করছে। মাঝে মাঝে দুই একজন বহনকারীর দেখা মিললেও অধিকাংশ সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় বিমানে স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটের সিটের ভেতর থেকে ১৬০ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার করে। স্বর্ণগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

স্বর্ণ পাচারের সাথে বিমানের কর্মকর্তা অথবা কর্মচারী জড়িত থাকতে পারে এমনটি ধারণা করছে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গত ১৫ অক্টোবর উদ্ধার করা স্বর্ণেরবারগুলো বিমানের সিটের ভেতরে যে কৌশলে নেয়া হয়েছে তাতে ওই বিমানে কর্মরত কারো সহযোগিতা ছাড়া নেয়া সম্ভব নয়।

শাহ আমানত বিমান বন্দর কাস্টমসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) মুনোয়ার মুরসালিন জানান, আমাদের কাছে খবর ছিলো সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই হতে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৮ বিমানে স্বর্ণের বার রয়েছে। সকল যাত্রী নেমে যাবার পর পেছনের দিকে তিনটি সিটের বসার জায়গায় লেদারের নিচে স্বর্ণের বারগুলো রাখা ছিলো। এ ঘটনায় কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে বিমানে যাত্রী উঠার আগেই এসব স্বর্ণবার সিটের ভেতরে ঢুকানো হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ যাত্রী উঠার পর এভাবে স্বর্ণবার নেয়া সম্ভব নয়।

এসি মুনোয়ার বলেন, একটি বিমান অবতরণের পর যখন সব যাত্রী নেমে যায় তখন পরিচ্ছন্ন, টেকনেশিয়ান ও খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত লোকজন কর্মচারী ছাড়া আর কেউ বিমানে উঠেনা। এসব বিভাগের কর্মীরা কাজ ­সেরে নামার সময় এসব ময়লা আবর্জনার সাথে কৌশলে স্বর্ণের বার নামিয়ে নেয়। নিয়ম অনুযায়ী স্বর্ণের বার উদ্ধারের পর আমরা সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করি। মূল পাচারকারী কিংবা অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদেরকে তদন্ত কর্মকর্তা আইনের আওতায় আনতে পারেন। ১৬০ টি স্বর্ণের বার পাচারের সাথে কারা জড়িত তা অনুসন্ধান চলছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানের ডিস্ট্রিক ম্যানেজার মীর আকতারুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ডেলমা থেকে এসেছে স্বর্ণবার : অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর উদ্ধার হওয়া ১৬০টি স্বর্ণবার এসেছে দুবাইয়ের ডেলমা থেকে। চারজনের সিন্ডিকেটের বহনকারী এসব স্বর্ণ এনেছে। স্বর্ণের সাথে নিয়োজিত বহনকারী ছিলো। স্বর্ণপাচারের মামলা তদন্ত করেছেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণপাচারকারীরা সাধারণত প্রকাশ্যে আসেনা। বর্তমানে যে চারজনের সিন্ডিকেট বিমানে স্বর্ণপাচারের রুট নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের নিয়ন্ত্রণে অর্ধশতাধিক যুবক রয়েছে যারা স্বর্ণ বহনের কাজ করছে।

পুলিশের উক্ত কর্মকর্তা জানান, বহনকারীদের সব দায়দায়িত্ব পাচারকারীরা বহন করেন। ৬০ পিসের নীচে স্বর্ণবার নিয়ে আসে প্রতিবারে ৩০ হাজার আর ৬০ পিসের উপরে থাকলে প্রতিবারে ৫০ হাজার টাকা পায় বহনকারী। এছাড়া পাচারকৃত স্বর্ণের লভ্যাংশের ২৫ শতাংশ বিভিন্ন খাতে খরচ করে পাচারকারীরা। যেমন- স্বর্ণপাচারকারী চার বন্ধু সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২৫ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে দেন। ৫ শতাংশ বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণকারী, ৫ শতাংশ প্রশাসনের বিভিন্ন লোকজন, আড়াই শতাংশ দান খয়রাত ও আড়াই শতাংশ বিবিধ খরচের জন্য রাখেন। তা ছাড়া আপদকালীন সময়ের জন্য প্রতি চালানে ৫ থেকে সাতটি স্বর্ণের বার দুবাইতে রেখে দেয় পাচারকারীরা। অধিকাংশ সময় এসব স্বর্ণ থেকে যায়। আপদকালীন সময়ের অর্থ দিয়ে দুবাইতে যাওয়া বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পেছনে খরচ করেন।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 349 People

সম্পর্কিত পোস্ট