চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

২৭ জুন, ২০২০ | ৮:১৯ অপরাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক 

মহামারীতেও পরিবর্তন হয়নি ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’

করোনাভাইরাস সংক্রমণের টেস্ট করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন বুশরা বিনতে বাতেন। সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে তার শ্বশুর এবং শাশুড়ি দুজনই একদিনের ব্যবধানে মারা যান। বাসায় অসুস্থ হবার পরে এ দু’জনকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে বাতেন এবং তার পরিবারকে। একজন সাধারণ রোগী হিসেবে কোন হাসপাতালেই রোগী ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এ কাজ সমাধান করতে হয়েছে। বাতেন বলেন, ‘ওনাদের যে কয়েকটা হাসপাতালে ভর্তি করেছি, প্রতিটি জায়গায় রেফারেন্সের মাধ্যমে যেতে হয়েছে। কোন হাসপাতালে সরাসরি গিয়ে আমরা সেবা পাইনি। আমরা ১০ দিনের মধ্যে চারটা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। প্রতিটি হাসপাতালে যাবার আগে আমাদের একটা রেফারেন্স লেগেছে’। বাংলাদেশের সমাজে ক্ষমতাবান না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে যে কোন সেবা পাওয়া দুষ্কর। মিসেস বাতেনের পরিবার এর একটি উদাহরণ মাত্র। এই ক্ষমতা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিত্তশালী হবার ক্ষমতা এমনকি

ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা হবার ক্ষমতা। করোনাভাইরাস মহামারির এ সময়টিতে ক্ষমতার জোর আরো প্রকট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
ভিআইপি সংস্কৃতি কেন টিকে আছে?
ক্ষমতার সাথে যারা নানাভাবে সম্পৃক্ত তারা নিজেদের সুবিধার জন্য আলাদাভাবে লিখিত কিংবা অলিখিত একটি সিস্টেম চালু করেছেন, যেটি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথাকথিত এই ভিআইপি সংস্কৃতিকে সযতেœ লালন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও বিশ্লেষক গোবিন্দ চক্রবর্তী ব্যাখ্যা করছিলেন এই সংস্কৃতি দিনকে দিন কেন শক্তিশালী হয়ে উঠছে? মি. চক্রবর্তী বলেন, রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত কিছু পকেটস আছে। এগুলো বিভিন্ন শাসনামলে শক্তিশালী হয়েছে।
মহামারিতে ভিআইপি সংস্কৃতি প্রকট হয়েছে
দেশের ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাতে এমনিতেই বৈষম্য ছিল। কিন্তু এবার সেটি আরো প্রকট হয়েছে। মহামারির এই সময়টিও বাংলাদেশের তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতিতে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন।
যেখানে সাধারণ মানুষের কোন প্রবেশাধিকার সীমিত। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে-কাউকে ঢাকার বাইরে থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশ্য রোগীর চাপ এতোটাই বেশি যে ক্ষমতার সাতে সম্পৃক্ত সবাই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেননি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জায়গা পেতে বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নীনা গোস্বামী বলেন, ‘সুযোগ সুবিধা যেখানে খুবই অপ্রতুল সেখানে মহামারির সময় পরিস্থিতির কোন বদল আশা করা যায় না। স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা যখন সামনে চলে আসছে তখন তাদের মনে একটা ভয় কাজ করে। যারা ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত থাকে তারা সর্বোচ্চ সুবিধাটা নিতে চায়। সেখানে ইকুয়ালিটির প্রশ্নই আসে না’।
শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নয়, করোনাভাইরাসের টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে বৈষম্য চোখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে টেস্ট-এর ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা অগ্রাধিকার পায়। এছাড়া সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপ তাদের সংগঠনের সদস্যদের জন্য আলাদা টেস্ট করার ব্যবস্থা করিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ করোনাভাইরাসের টেস্ট করানোর জন্য রীতিমতো গলদঘর্ম হচ্ছেন।
ভিআইপি সংস্কৃতির মূলে রয়েছে রাজনীতি
সরকারি যে কোন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বহু কষ্ট করতে হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তথাকথিত এই ভিআইপি সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে পারতো রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা। কিন্তু তারাও যেহেতু এই সুবিধা অংশ পায় সেজন্য এটি পরিবর্তনে তাদেরও কোন আগ্রহ নেই।
গত প্রায় ৪০ বছর যাবত রাজনীতির সাথে যুক্ত আছেন নূহ-উল-আলম লেলিন। এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করলেও দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাথে তিনি যুক্ত। লেলিন মনে করেন, তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আগ্রহই সবচেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকরা বলেন, যেখানে জনসংখ্যার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা খুবই অপ্রতুল সেখানে দ্রুত সেবা পেতে তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি টিকে থাকবে। আবার অনেকে মনে করেন, ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্তরা যেহেতু আলাদা সুবিধা পান, সেজন্য সিস্টেমের পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে তাদের তেমন একটা মনোযোগও দেখা যায় না। তথ্যসূত্র : বিবিসি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 230 People

সম্পর্কিত পোস্ট