চট্টগ্রাম বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

সর্বশেষ:

কোভিড-১৯ ওষুধের ধুম্রজাল

২ জুন, ২০২০ | ২:৪১ পূর্বাহ্ণ

কোভিড-১৯ ওষুধের ধুম্রজাল

পর্যবেক্ষণ
আহমেদ শরীফ শুভ

কোভিড-১৯ মহামারী এখন দেশে এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক। কোভিড-১৯ এর মতো একটি মারাত্মক ও দ্রুত সংক্রমণশীল রোগ নিয়ে মানুষের উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য। কোভিড-১৯ এ মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি হওয়ায় এবং সেই সাথে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউনের কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকা স্থবির হয়ে পড়ায় সবাই দ্রুত এর আরোগ্যের সন্ধানে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ নিয়ে চলমান বিতর্ক।
এই বিতর্কে আলোচিত ওষুধগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে অধিকাংশ পাঠকই অবগত আছেন। প্রধানতঃ হাইড্রক্সি ক্লোরকুইন, এজিথ্রোমাইসিন, রেমডিসিভির এবং হালে আইভারমেকটিন ও ফ্যাভিপিরাভিরকে কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন মহলে অতিউৎসাহ চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মধ্যে উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই ওষুধগুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা দেখা দিলেও কোথাও অত্যুৎসাহ দেখা যায়নি বাংলাদেশ ছাড়া। তার কারণ, খুব বেশি উৎসাহ দেখানোর মতো কার্যকারিতা এই ওষুধগুলো এখনো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। অথচ যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণালব্ধ ফলাফল ছাড়াই দেশে এগুলোর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চলছে। তাতে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ভুল বার্তা। শুধু তাই নয়, এসব ভুল বার্তার কারণে ‘কোভিড হলে অমুক ওষুধ খেয়ে নেবো’- মানুষের মধ্যে এ ধরনের ভুল নিরাপত্তাবোধ কাজ করছে। এই ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধের কারণে কোভিড-১৯ মোকাবেলার অন্যান্য স্বীকৃত পথ ( যেমন শারীরিক দূরত্ব বাজায়, হাত ধোয়া ইত্যাদি) অনুসরণ করায়ও দেখা যাচ্ছে শিথিলতা।
কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে এখনো কোন কার্যকর ওষুধ বের হয়নি। এতো তাড়াতাড়ি কোন ওষুধ বের হওয়া সম্ভবও নয়। এই রোগটির সাথে আমাদের পরিচিতি ছয় মাসেরও কম। অথচ যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে গবেষণার ইতিবাচক ফলাফলের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি ওষুধ বাজারে আসতে লেগে যায় বছরের পর বছর। কিন্তু যেহেতু কোভিড একটি ভয়াবহ রোগ, তাই এই রোগের কার্যকর নিরাময়ের দীর্ঘ অপেক্ষায় চিকিৎসক মহলে বিকল্পের সন্ধান শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। যতক্ষণ না নতুন কার্যকর ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ প্রচলিত অন্য কোন ওষুধকে রি-পারপাস (উদ্দেশ্য পরিবর্তন) করিয়ে এই রোগে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা শুরু হয়।
এই প্রচেষ্টায় প্রথম হাতিয়ার হিসেবে আসে হাইড্রোক্সিক্লোরকুইন আর এজিথ্রোমাইসিন। এর কোনটিই ভাইরাসঘাতী ওষুধ নয়। প্রথমটি ম্যালেরিয়ায় বহুল প্রচলিত, অন্যটি একটি এন্টিবায়োটিক। তাই এগুলো করোনাভাইরাসকে মারতে পারবে না জেনেও ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাবকে কমিয়ে আনার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করা শুরু হয়। হাইড্রোক্সি ক্লোরকুইনের প্যারাসাইট বিরোধী ক্ষমতা ছাড়াও আরো কিছু গুনাগুনের জন্য অন্যান্য কিছু রোগেও ব্যবহার করা হয় ( যেমন লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থাইটিস ইত্যাদি)। সে কারণেই প্রথমদিকে এই ওষুধটি আলোচনায় আসে। বিভিন্ন দেশে কোভিডে হাইড্রোক্সি ক্লোরকুইনের কার্যকারিতা নিয়ে চলমান গবেষণা মাঝপথে বন্ধ করে দেয়া হয় যখন রোগীদের উপর তার ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তীব্রভাবে দেখা দেয়। এর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে আছে হৃৎপি-ের অনিয়ন্ত্রিত ও অনিয়মিত স্পন্দন (এরিদমিয়া), কানে কম শোনা, মাংশপেশীর তীব্র ব্যথা এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া। এজিথ্রোমাইসিনের কারণেও এরিদমিয়া হতে পারে, আবার যকৃতের (লিভার) মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোভিড নিরাময় কিংবা প্রতিরোধে এই দু’টি ওষুধের কার্যকারিতা তো প্রমাণিত হয়ইনি, বরং রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় গবেষণাই মাঝপথে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যেখানে এই গবেষণা এখনো চলমান সেখানে সুনিয়ন্ত্রিত ও কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত গবেষণার কাজে ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যদিও ভারতে এখনো ক্ষেত্রবিশেষে হাইড্রোক্সি ক্লোরকুইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এরপর থেকে হৈ চৈ হচ্ছে রেমডেসিভির নিয়ে। এটি মোটা দাগে একটি ভাইরাসবিরোধী ওষুধ। তাই এই নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকমহলে আগ্রহ বেশি ছিল। কিন্তু এটি সুনির্দিষ্টভাবে নব-করোনাভাইরাসঘাতী হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। এই নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। কেউ কেউ বলছেন এফডিএ (যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন) কোভিড চিকিৎসায় এই ওষুধটির অনুমোদন দিয়েছে। বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এফডিএ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সীমিত কিছু ক্ষেত্রে জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমতি দিয়েছে মাত্র। বলা হয়েছে এই অনুমতিপত্রটিকে কোনভাবেই কোভিড চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে রেমডেসিভির ব্যবহারের অনুমোদন হিসেবে গণ্য করা যাবে না। অবশ্য পূরণীয় শর্তগুলো হচ্ছে- ১। রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হবে, ২। তার অবস্থা এমনি সংকটাপন্ন যে তিনি ভেন্টিলেটরে আছেন, ৩। তার অক্সিজেনের পরিমাণ ৯৪% এর কম এবং ৪। তিনি এক্সট্রা করপোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশনে আছেন (তাদের হৃৎপি- ও ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করছে না বিধায় শরীরের বাইরে থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে এই অঙ্গের কাজগুলো করা হচ্ছে)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি যে কোন রোগীকেই রেমডেসিভির দেয়ার বিধান রাখা হয়নি। উপরন্তু দেখা গেছে এটি মৃত্যুহার তেমন কমাতে পারেনি, শুধু হাসপাতালে ভর্তির সময়কাল গড়ে ৪ দিন কমাতে পেরেছে। সুতরাং এই ওষুধটি নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশের সময় এসেছে বলে বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া রেমডেসিভিরের অপরিকল্পিত ও যথাযথ তত্ত্বাবধানবিহীন ব্যবহারের কারণে যকৃতের মারাত্মক ক্ষতিও হতে পারে।
এরপর যে ওষুধ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে তা হচ্ছে আইভারমেকটিন। এটি মূলতঃ একটি পরজীবীবিনাশী ওষুধ, যা উকুন এবং খোসপাঁচড়ায় ব্যবহার করা হয়। নব-করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এটি কাজ করে কিনা, করলে কিভাবে করে তা নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মানবদেহ বা কোন প্রাণীদেহের বাইরে পরীক্ষাগারের পাত্রে (ইন ভিট্রো) নব-করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আইভারমেকটিনের কার্যকারিতা পেয়েছেন। কিন্তু গবেষণা প্রক্রিয়ার বাইরে পৃথিবীর কোথাও এখনো কোভিডে আইভারমেকটিন ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবে কোথাও কোথাও কম্পেশনেট গ্রাউন্ডে (সহানুভূতির ভিত্তিতে) বিধিবদ্ধতার বাইরে (অফ লেবেল) এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, অনেকটা ঝড়উঠা সমুদ্রে খড়-কুটা আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করার মতো। তার মানে এই নয় যে, এটি একটি যাদুকরি ওষুধ। কিছুদিন আগে ঢাকার একজন বক্ষব্যধি বিশেষজ্ঞের সাফল্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আইভারমেকটিন নিয়ে মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় হয়ে গেল। বলা হয়েছিল তিনি ৬০ জন রোগীর উপর প্রয়োগ করে গবেষণায় ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। পরে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এটি কোন গবেষণা নয়, তিনি গবেষণার কোন স্বীকৃত পদ্ধতি অবলম্বন করেননি। এটি তার পর্যবেক্ষণমাত্র। চলমান স্বীকৃত গবেষণাগুলোর ফলাফল বের না হলে এর সাফল্য সম্পর্কে দাবি করার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করলে আইভারমেকটিনের কারণে শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টিহীনতা এবং রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
ওষুধ নিয়ে এই তোলপাড়ে সর্বশেষ সংযোজন ফ্যাভিপিরাভির। এটি একটি ভাইরাসবিনাশী ওষুধ। প্রধানতঃ জাপানে এবং চীনে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ব্যবহার করা হয়। তবে নব-করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সম্ভাব্যতা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। ইতালি এবং চীনে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে গবেষণার আওতায়। ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রেও গবেষণায় ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পুরো বিষয়টি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। এমনকি ওষুধটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফুজিফিলম ফার্মাসিটিক্যালস নিজেও কোভিডে তার সন্দেহাতীত কার্যকারিতা দাবি করেনি।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ওষুধগুলো নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ হচ্ছে তাদের কোনটির কার্যকারিতাই কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সন্দেহাতীত ও নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষতঃ কোভিডের ভয়াবহতার সূচক মৃত্যুর হার এবং ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনীয়তার কোন কমতি হয়নি আলোচ্য ওষুধগুলোর কারণে। কেবলমাত্র রেমডেসিভিরের কারণে হাসপাতালে থাকার সময় গড়ে ৪ দিন কমেছে। এর বেশি কিছু নয়। বিশেষ শর্তসাপেক্ষে হাসতালে ব্যবহার্র্য রেমডেসিভির ছাড়া আলোচিত অন্য কোন ওষুধকে কোভিডে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ ঔষধপ্রশাসন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেননি। এর কোন একটি কোভিডে কার্যকর প্রমাণিত হওয়া অবধি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং বিশ্বস্বীকৃত চিকিৎসার উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই।
কোভিড-১৯ এর মারাত্মক ঝুঁকি হচ্ছে শ্বাসকষ্ট, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং রক্তে জমাট বাঁধাজনিত জটিলতায় হার্ট এটাক, স্ট্রোক ইত্যাদি। অধিকাংশ রোগী এসব জটিলতায়ই মারা যান। সুতরাং যতদিন স্বীকৃত ও অনুমোদিত ওষুধের সন্ধান না পাওয়া যায় ততদিন আমাদের মনোযোগ দিতে হবে উচ্চপ্রবাহমান (হাই ফ্লো) অক্সিজেন এবং রক্তের ঘনত্ব কমানোর ওষুধের প্রতি। কোভিড মোকাবেলায় এগুলোর কার্যকারিতা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। পক্ষান্তরে, আমাদের উচ্ছ্বাসের কারণ ঘটানো ওষুধগুলো এখনো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তদুপরি, কিছু কিছু ওষুধের দাম দেশের বাজারে অত্যন্ত চড়া। এক কোর্স ফ্যাভিপিরাভিরের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। যথাযথ তথ্য উপাত্ত ছাড়া মানুষকে এতো চড়া মূল্যের একটি ওষুধের পরামর্শ দেয়া কতটুকু যৌক্তিক ও নৈতিক তা ভেবে দেখতে হবে। এ সব ওষুধের স্বপক্ষে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে যে কোন ওষুধ কেনা যায়, সে দেশে বৈজ্ঞানিক সেমিনারে আলোচনা কিংবা চিকিৎসকদের নিজস্ব ফোরামে মতবিনিময়ের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য জনসাধারণের মধ্যে এ ধরণের অপ্রমাণিত ওষুধের প্রচারণা বিপজ্জনকও বটে। এসব ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ও সুষ্ঠু তদারকিবিহীন সেবনের কারণে প্রাণহানীও ঘটতে পারে।
আহমেদ শরীফ শুভ অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ও অনাবাসিক শিক্ষক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফ্যামিলি মেডিসিন এন্ড রিসার্চ, ইউএসটিসি।

The Post Viewed By: 270 People

সম্পর্কিত পোস্ট