চট্টগ্রাম সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নিভে গেল বাতিঘর

১৫ মে, ২০২০ | ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

ঢাকা অফিস

নিভে গেল বাতিঘর

ছিলেন করোনায় আক্রান্ত 

জাতীয় অধ্যাপক, খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও ডক্টর আনিসুজ্জামান আর নেই। প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস কেড়ে নিল জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা নাগাদ তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত এই ইমেরিটাস অধ্যাপকের ছেলে আনন্দজামান তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এদিন বিকালে শারীরিক অবস্থার হঠাৎ করে দ্রুত অবনতি হলে করোনারি কেয়ার ইউনিট থেকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কিছু সময় পর বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে মারা যান তিনি।
ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক এবং স্বজন ও অনুরাগীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বলা বাহুল্য, চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত দৈনিক পূর্বকোণের নামকরণ করেছিলেন প্রয়াত এই জাতীয় অধ্যাপক। ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করার নয়। শোক প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, পেশাজীবী নেতা অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আজ শুক্রবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় তার দাফন সম্পন্ন করা হবে। গতরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন তার ছেলে আনন্দজামান। তিনি বলেন, আব্বার শরীরে করোনা ভাইরাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার দাফন সম্পন্ন করা হবে। পূর্বঘোষিত দাফন কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। প্রয়াত অধ্যাপককে বাংলা একাডেমিতেও নেওয়া হবে না। এদিকে, আনিসুজ্জামানের ছোট ভাই মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘করোনা টেস্ট পজিটিভ আসায় এখন লাশ দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছু প্রক্রিয়া আছে সেগুলো ফলো করা হবে। আমাদের বাবা-মায়ের কবর আজিমপুরে। তাই আমাদের চাওয়া হচ্ছে বাবার কবরের পাশেই তাকে যেন দাফন করা হয়। ’
টেগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ আর্টসের ভিসি অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ জানান, গতকাল অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের শরীরে জ্বরের মাত্রা অনেক বেশি উঠেছিল। তাই চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন তার করোনা টেস্টের। তারই ফলাফল গতরাতে পাওয়া গেছে।
গত ২৭ এপ্রিল গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ঢাকার মহাখালীর একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে, শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রয়াত অধ্যাপককে সিএমএইচে স্থানান্তরিত করা হয়। হার্টের সমস্যার পাশাপাশি ৮৩ বছরের এই অধ্যাপক কিডনি, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের জটিলতায় ভুগছিলেন।
এক নজরে আনিসুজ্জামান
কিছু মানুষ নিজের কর্ম ও পরিচয়ের গুণে ধীরে ধীরে একটি জাতির জন্য মহিরুহসম আকার ধারণ করেন। জাতির বাতিঘর, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তেমনই একজন। কয়েক প্রজন্মের প্রিয় শিক্ষক এই বাতিঘর তাই সর্বজনমান্য ‘স্যার’ হিসেবেই পরিচিত ও গণ্য ছিলেন। তিনি একাধারে বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, সংবিধানের অনুবাদক, স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রবর্তী মানুষ। দেশ ও মানুষের যে কোনো বিপর্যয়ে তিনি অতন্দ্র বাতিঘরের মতো যুক্তিনিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে নিরাবেগ মতামত ও দিকনির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এটিএম মোয়াজ্জেম ও মা সৈয়দা খাতুন। বাবা ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক আর মা গৃহিনী হলেও সাহিত্যের প্রতি ছিল তার আন্তরিক ভালোবাসা। আনিসুজ্জামানের পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন তার সময়ের একজন বরেণ্য লেখক ও সাংবাদিক।
ভারত ভাগের পর তার পরিবার এপার বাংলায় চলে আসে। তিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এছাড়া ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী নানা কর্মকা-ে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আনিসুজ্জামানের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
আনিসুজ্জামানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার পার্ক সার্কাস হাই স্কুলে। বাংলাদেশে চলে আসার পর খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে ঢাকার প্রিয়নাথ হাইস্কুল (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকায় ফিরে আবারও শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরে ভারত গমন করে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে রয়েছে- মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, স্বরূপের সন্ধানে, Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, পুরোনো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, কাল নিরবধি, বাংলা-ফারসি শব্দসংগ্রহ, আইন-শব্দকোষ ইত্যাদিসহ প্রায় পঞ্চাশটি গ্রন্থ।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও ১৯৮৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। ভারত সরকারের দেওয়া তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদকও পেয়েছেন। এছাড়াও কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার দেওয়া আনন্দ পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট. ডিগ্রি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন ড. আনিসুজ্জামান। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।
ড. আনিসুজ্জামানের গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্যÍ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪), মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯), স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬), আঠারো শতকের বাংলা চিঠি (১৯৮৩), পুরোনো বাংলা গদ্য (১৯৮৪), Creativity, Reality and Identity (১৯৯৩), Identity, Religion and Recent History (১৯৯৫), আমার একাত্তর (১৯৯৭), মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর (১৯৯৮), আমার চোখে (১৯৯৯)। একক ও যৌথভাবে বহু গ্রন্থ সম্পাদনাও করেছেন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 148 People

সম্পর্কিত পোস্ট