চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২০

করোনাভাইরাস উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সংকট, তবে বিপর্যয় নয়

৮ মে, ২০২০ | ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

এস্থার ডুফ্লো এবং অভিজিৎ ব্যানার্জি

দারিদ্র্য বিমোচনে কাজের জন্য অর্থনীতিতে ২০১৯ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী

করোনাভাইরাস উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সংকট, তবে বিপর্যয় নয়

সর্বজনীন মৌলিক আয়ের একটি ‘নতুন রূপ’ এখানে দেখিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোকে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়

পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলো ধীরে ধীরে তাদের অর্থনীতি পুনরায় চালু করার দিকে পদক্ষেপ নিচ্ছে, বিশে^র দক্ষিণাংশে অনেকেই ভাবছেন যে, মহামারীটি এখনও এর সবচেয়ে খারাপ রূপে আসেনি। অর্থনীতিবিদ হিসাবে যারা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করেন, তারা প্রায়শই আমাদের জিজ্ঞেস করে থাকেন, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকাতে করোনভাইরাসটির প্রভাব কী হবে। সত্য জবাবটি হলো, আমরা জানি না। ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ভাইরাসটি ইতিমধ্যে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে তা বলা অসম্ভব। কোভিড-১৯ সূর্যের আলো, তাপ এবং আর্দ্রতার মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে আচরণ করে সে সম্পর্কে আমাদের এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর যুব-জনগোষ্ঠী তাদেরকে মহামারী থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে দক্ষিণ-বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলো প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয় এবং দরিদ্রতার সাথে এই অসুস্থতা জড়িয়ে এতদঞ্চলের মানুষকে মারাত্মক স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলেছে নিঃসন্দেহে।
বিস্তৃত পরীক্ষার তথ্য সরবরাহ না করে অনেক দরিদ্র দেশ অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ২৪ মার্চ ভারত সর্বাত্মক লকডাউন চাপিয়েছিল দেশজুড়ে, কিন্তু ততক্ষণে দেশটিতে প্রায় ৫০০টি নিশ্চিত করোনা আক্রান্তের খবর আমাদের জানা হয়ে গেছে। রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো ভাইরাসটি শঙ্কিত পর্যায়ে পৌঁছার প্রত্যাশিত সময়ের অনেক আগে (মার্চের শেষদিকে) লকডাউন প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু কথা হলো- এই লকডাউন ব্যবস্থা চিরকালের জন্য স্থায়ী হতে পারে না। দরিদ্র দেশগুলি সময় বাঁচাতে রোগটি কীভাবে আচরণ করে সে সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং পরীক্ষা এবং ট্রেসিংয়ের কৌশল বিকাশ করতে পারে। দুর্ভাগ্যক্রমে, এর বেশি কিছু ঘটেনি। এবং, তাদের সহায়তায় আসা থেকে দূরে থাক, ধনী দেশগুলো নিজেরাই পিপিই, অক্সিজেন এবং ভেন্টিলেটর প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় দরিদ্র দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে।অনেক জায়গায়ই লকডাউনের মাশুল মানুষকে ইতিমধ্যেই গুনতে হচ্ছে। শিশুরা টিকা ছাড়াই রয়ে যাচ্ছে, ফসলাদি সঠিক সময়ে ঘরে তোলা যায়নি। নির্মাণ প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে আছে এবং বাজারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে চাকরি এবং আয় কমে গেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর দীর্ঘায়িত পৃথকীকরণের প্রভাব ভাইরাসের মতোই ক্ষতিকারক হতে পারে। কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আগে, দক্ষিণ বিশ্বে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৫ হাজার শিশু মারা যেতো দারিদ্র্যের সাথে জড়িত প্রতিরোধমূলক রোগের কারণে। সম্ভবত তাদের পরিবারগুলোকে আরও দারিদ্র্যে ডুবিয়ে দেওয়া হলে এ সংখ্যা অনেকগুন বৃদ্ধি পাবে।
দরিদ্র দেশগুলো এই মহামারীটির সামনে কী করতে পারে- এবং ধনী দেশগুলো কীভাবে তাদের সহায়তা করতে পারে? প্রথমত, ইউরোপে মহামারী এবং লকডাউন ব্যবস্থাগুলো রক্ষার জন্য যে নিয়মতান্ত্রিক পরীক্ষার কৌশলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা দরিদ্র দেশগুলির জন্য ঠিক সহজ নয় বলাবাহুল্য। যে জায়গাগুলোতে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ভাইরাস সংক্রমণ সম্পর্কে তথ্য নেই এবং সংস্থানগুলো সীমাবদ্ধ রয়েছে, সেখানে করোনভাইরাসটির প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হটস্পটগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। এইভাবে, সর্বজনীন লকডাউন চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত ও আক্রান্তপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করতে পারে যেখানে পৃথকীকরণের ব্যবস্থা করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অসুস্থ মানুষের সম্ভাব্য আকস্মিক প্রবাহ মোকাবেলায় তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করতে হবে।
এবং তৃতীয়ত, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ হবে যদি দরিদ্র দেশগুলো সামনের মাসগুলোতে লোকদের একটি নিরাপদ জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়। এই ধরনের গ্যারান্টির অভাবে, লোকজন পৃথকীকরণ ব্যবস্থায় ক্লান্ত হয়ে উঠে এবং লকডাউনগুলো কার্যকর করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। চাহিদার পতন থেকে তাদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে, সরকারকে লোকদের আশ্বস্ত করতে হবে যে যতক্ষণ প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে।
আমাদের সাম্প্রতিক বইয়ের (করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগে লেখা) শিরোনামটি কিন্তু এখনকার সময়ের জন্য যথাযথভাবে উপযুক্তই হয়েছে- ‘গুড ইকনমিকস ফর হার্ড টাইমস’। এতে আমরা সুপারিশ করি- যাতে দরিদ্র দেশগুলো ইউনিভার্সাল আল্ট্রা বেসিক ইনকাম (ইউইউবিআই নামে অভিহিত) প্রবর্তন করে। এতে নিয়মিতভাবে ন্যূনতম নগদ অর্থ ছাড় দেয়া হবে যা হবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। এক্ষেত্রে ইউইউবিআইয়ের গুণাবলীগুলো হল এর সরলতা, স্বচ্ছতা এবং এর আশ্বাস যে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না। এটি অনেক কল্যাণ ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এড়িয়ে চলে যার ভাগিদার দরিদ্র ফান্ডের নামে অনেক ‘অদরিদ্র’ও হতো। এই মহামারী চলাকালীন সংকটময় অবস্থায় যখন সরকারগুলোর যতটা সম্ভব লোককে যত তাড়াতাড়ি সাহায্য করার দরকার পড়ে, তখন ইউইউবিআইয়ের সরলতা অনেক জীবন রক্ষা করতে পারে। এর মূল লক্ষ্য একটাই- জনগণকে আশ্বস্ত করা যে, ‘এই জীবিকা নির্বাহ সহায়তা’ থেকে কেউই বাদ পড়বে না।
এই ধারণাগুলো নিছক কল্পনা নয়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ক্ষুদ্র টোগো, যার আট মিলিয়ন বাসিন্দা এবং এর জিডিপি (ক্রয় ক্ষমতা সমতা) মাথাপিছু ১,৫৩৮ ডলার, এই সমস্ত ফ্রন্টে কাজ করছে। সন্দেহভাজন আক্রান্তের ৭৯০০ জনের জন্য দেশটিতে ৫০০০ পরীক্ষাকেন্দ্র গড়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলো কখন এবং কোথায় মানুষের গতিশীলতা সীমাবদ্ধ করতে হবে তা নির্ধারণ করতে ফলাফলগুলো ব্যবহার করবে। সরকার জনগণের সেলফোনে একটি বৈদ্যুতিক ওয়ালেটকে সংযুক্ত নগদ স্থানান্তর প্রকল্পও চালু করেছে; ইতিমধ্যে এটিতে ১.৩ মিলিয়ন লোক নিবন্ধিত হয়েছেন এবং শুধুমাত্র গ্রেটার লোমিতেই (রাজধানী) ৫০০,০০০ অর্থ এভাবে প্রেরণ করা করেছে।
সুসংবাদটি হল অনেক দেশ, বিশেষত আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে ইতিমধ্যে সেলফোন ব্যবহার করে দ্রুত অর্থ স্থানান্তর করার জন্য যথেষ্ট অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। অনেক লোক ইতিমধ্যে বেসরকারি এক্সচেঞ্জগুলোতে এই সিস্টেমগুলো ব্যবহার করছে। যদি ফোনের ডেটা ইঙ্গিত দেয় যে কিছু অঞ্চল আরও বেশি অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছে, তবে সেই জায়গাগুলোতে অর্থ স্থানান্তরে সরকার সহজেই উদ্যোগী হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা যে সর্বাধিক প্রতিবন্ধকতাটির মুখোমুখি হচ্ছি তা হলো- এক্ষেত্রে অর্থায়ন করার ইচ্ছাশক্তি, পরিকাঠামো নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একটি ইউবিআইয়ের জন্য ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সাহায্যের প্রয়োজন হবে। কেউ কেউ এক্ষেত্রে আশঙ্কা করেন যে এতে করে স্ব স্ব মুদ্রার বিপরীতে ঋণ ও সুদ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাই ঋণ, ত্রাণ এবং অতিরিক্ত সংস্থান দেওয়ার ব্যাপারে সমৃদ্ধ দেশ ও বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করা দরকার। অনেক উন্নয়নশীল দেশকেই হার্ড কারেন্সির (স্থিতিশীল মুদ্রা) সাহায্যে খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ কিনতে হবে, যা তাদের রফতানি আয় ও রেমিটেন্স-ব্যবস্থার জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আয়ের এ অভূতপূর্ব পতন নিঃসন্দেহে মানুষকে হতবুদ্ধি, কিছু ক্ষেত্রে অস্থিরও করে তুলেছে। এসময় সরকারের নাগরিকদের এবং অর্থনীতিকে কম ব্যয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে সহায়তা করা দরকার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারগুলোকে এখন স্বল্প মেয়াদে হলেও কোনও ইউইউবিআই-এ অর্থায়নের জন্য বড় বাজেটের ঘাটতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। যখন দেশগুলো তাদের লকডাউনগুলো আলগা করতে এবং উৎপাদন পুনরায় শুরু করবে, তখন তারা প্রকৃত চাহিদার মুখোমুখি হবে। তখনও হয়তো নগদ অর্থ ছাড়ের কিছুটা প্রয়োজন থাকবে। লোকেরা যখন বাইরে যাওয়া শুরু করবে শুরু হবে অর্থের আদান-প্রদান। ঘুরেফিরে, এটি অর্থনীতির পুনর্জাগরণকে চালিত করবে।
এর কোনটির অর্থ এই নয় যে, সরকারগুলোকে কেবল ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কিত উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করা উচিত। তবে কীভাবে লকডাউনটি শেষ হবে, করোনভাইরাসের ধাক্কা কীভাবে সামলানো হবে, তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলটির সাথে মিলিয়ে একটি সুস্পষ্ট ব্যয় পরিকল্পনা করা গেলেই কেবল ‘ভবিষ্যতের বিপর্যয়’ মোকাবিলা করায় আশান্বিত হয়ে উঠা যাবে।
(৬ মে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ ছাপা হয়েছে এ নিবন্ধটি)

The Post Viewed By: 236 People

সম্পর্কিত পোস্ট