চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

করোনাভাইরাসের প্রথম ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগ

২০ এপ্রিল, ২০২০ | ১০:১৮ অপরাহ্ণ

ড. সুব্রত বোস

চলতি সপ্তাহেই ব্রিটেনে মানবদেহে করোনা ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ

আশাবাদী অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা। সেপ্টেম্বরেই আসতে পারে ভ্যাকসিন। এ সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। প্রথমেই ৫৫ থেকে ৭০ বছর বয়সী সুস্থ মানুষের শরীরে। এরপর ৭০ ঊর্ধ্বদের। প্রথম ধাপে পরীক্ষার আওতায় আনা হবে ৫০০ জনের মতো। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকলে আরও মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে ট্রায়ালে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটেনের কয়েকটি দাতব্য সংস্থার অর্থায়নে ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় জেনার ইনস্টিটিউট। উদ্দেশ্য সংক্রমণজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা আর টিকা তৈরি। এডওয়ার্ড জেনারকে বলা হয় ভ্যাকসিনের জনক। প্রায় ২০০ বছর আগে গুটি বসন্তের টিকার অন্যতম আবিষ্কারক ছিলেন। গুটি বসন্তের টিকা আবিষ্কার করে থেমে থাকেননি তিনি। জনসংখ্যার একটা বড় অংশকে এই টিকার আওতায় নিয়ে আসতে তার অবদান চিরস্মরণীয়।

এই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ড. সারাহ গিলবার্ট। ভাইরাস নিয়ে কাজ করেন। সারাহার নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের একদল বিজ্ঞানী জানুয়ারি মাস থেকেই ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেন। মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকারের একটি সংস্থা ২২ কোটি টাকার অনুদান দেয় এই গবেষণায়। সারাহ ও তাঁর দল অন্য সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা করোনার পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত ৮০টির মতো ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। মানবদেহে প্রয়োগ করা হয়েছে দুটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে। অক্সফোর্ডের শুরু হলে এটি হবে তৃতীয় পরীক্ষা। যেখানে পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন মানবদেহের সরাসরি প্রয়োগ করা হবে। মাত্র চার মাসে ভ্যাকসিন তৈরি প্রাণিদেহে প্রয়োগ এবং মানুষের শরীরে দেওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া ভ্যাকসিন তৈরির ইতিহাসে নেই। এ পরীক্ষাটি সবার আগে শেষ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে এমন মানুষকে বাছাই করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি শর্ত একটা করোনায় আক্রান্ত বা সেরে ওঠা মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা যাবে না। জ্বর থাকলে অংশ নেওয়া যাবে না। কারণটা খুব সহজ। করোনায় আক্রান্ত মানুষের শরীরে এই ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করে থাকে। আর ভ্যাকসিনের উদ্দেশ্য অ্যান্টিবডি তৈরি করা। গবেষণার একপর্যায়ে দুটি গ্রুপ হবে।

একদলকে দেওয়া হবে পরীক্ষামূলক করোনার ভ্যাকসিন আর অন্য দলকে মেনিনজাইটিসের প্রচলিত ভ্যাকসিন। ডাক্তার বা রোগী জানবেন না কে কোন রোগের ভ্যাকসিন পেলেন। প্রত্যেকটি রোগীর একটি কোড থাকে। প্রত্যেকটি ভ্যাকসিন ডোজেরও থাকে নির্দিষ্ট কোড। একমাত্র কম্পিউটারে সংরক্ষিত থাকে কে কোন ভ্যাকসিন পেয়েছেন তার বিবরণ। এই পদ্ধতিকে বলা হয় র‍্যানডোমাইজড কন্ট্রোল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এতে কিছুদিন পর পর সবাইকে নিয়মিত পরীক্ষা করা হবে। যদি দেখা যায় যাদের মেনিনজাইটিস টিকা দেওয়া হয়েছিল তাদের কোন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে; আর যাদের করোনার পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল তাদের সংক্রমণ হয়নি তাহলে ভ্যাকসিনটি কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে।

এখানে বলে রাখা ভালো, আগামী কয়েক মাসে করোনা সংক্রমণ যদি প্রাকৃতিকভাবে অনেকটা কমে আসতে শুরু করে তাহলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মানুষেরাও কম সংক্রমিত হবেন। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য অংশগ্রহণকারীদের একটা অংশের সংক্রমিত হওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি। এই ভ্যাকসিন কার্যকরী এবং মানবদেহে নিরাপদ হলে উৎপাদন শুরু করতে হবে ব্যাপকভাবে।

প্রকল্পের প্রধান ড. সারাহ গিলবার্ট আশাবাদী। তিনি মনে করেন, এই ভ্যাকসিন কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। এই ভ্যাকসিন তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ১০টি রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে অতীতে। হাজার হাজার মানুষ ব্যবহার করছেন এই প্রযুক্তিতে তৈরি অন্য রোগের ভ্যাকসিন। সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেকটাই জানা। উদ্ভাবকদের ধারণা জ্বর বা একটু গা ব্যথা হতে পারে ভ্যাকসিনটি নেওয়ার পর। প্রায় সব ভ্যাকসিনেরই এই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিশ্চিতভাবে জানা যাবে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই।

কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। ড. সারাহ গিলবার্ট বলেছেন, কার্যকরী হলে শিশু থেকে বয়স্ক সবাইকে এই ভ্যাকসিনের আওতায় আনা যাবে। ডায়াবেটিস আছে এমন মানুষের শরীরে ও কার্যকরী হতে পারে ভ্যাকসিন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু এই অ্যান্টিবডি দীর্ঘস্থায়ী হয় কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের সংশয় রয়েছে। অর্থাৎ একবার আক্রান্ত হলেও পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সারাহ বলেছেন, এই ভ্যাকসিন একবার দিলে দীর্ঘ মেয়াদে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। করোনা তার রূপ পরিবর্তন করলেও ভ্যাকসিনটি কাজ করবে। সবচেয়ে আশার কথা, কার্যকরী হলে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সারা পৃথিবীর সব মানুষের জন্য এই ভ্যাকসিন উন্মুক্ত করবে দ্রুততম সময়ে। নাম মাত্র মূল্য নির্ধারণ করা হবে। কোনো মুনাফা করবে না অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। ভ্যাকসিন তৈরির খরচটাই দাম হিসেবে নির্ধারিত হবে। কার্যকরী প্রমাণ হলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই লাখ লাখ ভ্যাকসিন তৈরির জন্য ব্রিটিশ সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

সবার জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহের এই ঘোষণা আরেকবার প্রমাণ করল বিজ্ঞানের, বিজ্ঞানীদের সব দেশ, বর্ণ, জাতির প্রতি সমান আনুগত্য। পৃথিবীটা যেমন সবার তেমনি বিজ্ঞানের সুফল পাওয়ার অধিকারও সবার। অপেক্ষাটা শুধু সময়ের। সেই পর্যন্ত নিরাপদে থাকুন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনুন। সূত্র : প্রথম আলো।

লেখক : প্রবাসী বাংলাদেশি ও বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ক্লিনিক্যাল ট্র্যায়ালস এনালিটিকসের গ্লোবাল প্রধান।

 

 

পূর্বকোণ/আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 592 People

সম্পর্কিত পোস্ট