চট্টগ্রাম বুধবার, ২৭ মে, ২০২০

৫ কোটি মানুষ খাদ্য সহায়তা পাবে

১৯ এপ্রিল, ২০২০ | ৩:০০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

৫ কোটি মানুষ খাদ্য সহায়তা পাবে

মাত্র সোয়া ঘণ্টা স্থায়ী ছিল জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশন। এর মধ্য গতকাল দেশের ইতিহাসে স্বল্পতম সময়ের অধিবেশনের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো একাদশ জাতীয় সংসদ।
সপ্তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। বিশ্ববাসী যেন এই ভাইরাস থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। আল্লাহর শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি। গতকাল একাদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে নিয়ম রক্ষার এই সংসদ অধিবেশন শুরু হয় বিকাল ৫টায়। অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রায় ২০৯টি দেশ আজ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। গত ডিসেম্বর থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন থেকেই আমরা সতর্ক ছিলাম। যখনি আমাদের দেশে দেখা দেয় তখননি আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, কতদিন এই অবস্থা থাকবে তা কেউ বলতে পারছে না। সারা বিশ্বে কত শক্তিশালী দেশ, কত অস্ত্র কোনো কিছুই কাজে লাগলো না। একটা ভাইরাস চোখে দেখা যায় না। তার কারণে আজ সারা বিশ্ব স্থবির, সারা বিশ্বের মানুষ আজ ঘরে বন্দী। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। কিন্তু স্বাস্থ্যে যে এমন ঝড় বয়ে যাবে তা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। পূর্বে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করেছি। সব রকম ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। বিনা পয়সায় চিকিৎসা হচ্ছে। প্রত্যেকটি বন্দরে টেস্টের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মানুষকে সচেতন করা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাদ্যে যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সে ব্যবস্থা আমরা করেছি।
৫ কোটি মানুষ সরকারি সহায়তা পাবে: করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প থেকে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদে তিনি বলেছেন, ‘করোনা সংকটে দেশের মানুষ যাতে খাদ্য সংকটে না থাকে তার জন্য বিদ্যমান ৫০ লাখ রেশন কার্ডের পাশাপাশি আরও ৫০ লাখ রেশন কার্ড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোট ১ কোটি কার্ড দেওয়া হবে। প্রতিটি পরিবার ৪-৫ জন করে ধরলে তাতে ৫ কোটি মানুষ সরকারি সুবিধাটা ভোগ করবে।’ এরআগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ঘণ্টাব্যাপী এই অধিবেশনের শুরু হয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ৬০ দিনের মাথায় এবারের অধিবেশন বসে। টানা এক ঘণ্টা চলার পর শেষ হয় ৭ম অধিবেশন। এটি দেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। শুরুর দিনেই অধিবেশন শেষ।
করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও সাধারণ ছুটির মধ্যে আহুত এই অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ স্বল্প সংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। তবে সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী এবং বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও উপনেতা গেলাম মোহাম্মদ কাদেরসহ সিনিয়র সংসদ সদস্যরা অনুপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সংসদ সদস্যরা বিগত দিনের আসন বণ্টন এড়িয়ে করোনা সতর্কতা মেনে আসন গ্রহণ করেন। অধিবেশন কক্ষে এক থেকে দু’টি আসন পর পর তারা বসেছিলেন।
অধিবেশনের প্রবেশ মুখে সবার তাপমাত্রা মাপা হয়
অধিকাংশ সাংসদের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ও মাথায় ক্যাপ ছিল। সংসদ পরিচালনায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও একই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সংসদ ভবনের প্রবেশমুখে সকলকেই জীবাণু নাশক স্প্রে করা হয়। সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের তাপমাত্রা মাপা হয়। এছাড়া নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সংসদ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি শুরুতেই বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকসহ মৃত্যুবরণকারী অন্যদের জন্য শোক প্রকাশ করেন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও অধিবেশন ডাকার কারণও ব্যাখ্যা করেন। সম্ভাব্য সকল স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন স্পিকার।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে আমরা ১০ টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছি। আমাদের ভিজিএফ, ভিজিডিসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্ড দেওয়া আছে ৫০ লাখ। এর বাইরে আরও ৫০ লাখ কার্ড এরইমধ্যে করতে বলা হয়েছে। আর ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন হটলাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। যখন কেউ সহযোগিতা চাইবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের যেন সহযোগিতা পাঠানো হয়।’ তিনি বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে যাতে প্রত্যেক জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থা থাকে, সেই ব্যবস্থা আমরা করব।’
সংসদ নেতা বলেন, ‘পরিবারগুলো যেন খাদ্যের কষ্ট না পায় সেই ব্যবস্থা করেছি। আমি নিজেও অনেক সময় খবর পাই, আমার কাছে এসএমএস করে আপা আমার ঘরে খাবার নাই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা কিন্তু উদ্যোগ নেই। শুধু ওই ঘরটাই না আশপাশে কোথাও এভাবে কষ্টে আছে কি না? যারা হয়তো হাত পাততে পারে না, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রীকে বলেছি ৩৩৩ বা আমাদের হটলাইনগুলোর সঙ্গে সংযোগ রেখে এধরনের পরিস্থিতিতে যারা পরবে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন ধান কাটার মৌসুম। আমাদের দিনমজুর যারা কাজ পাচ্ছেন না তাদের জন্য একটু সুযোগ। তারা অনেকেই ধান কাটতে যেতে পারেন বা সকলেরই যাওয়া উচিত। এখানে উঁচু নিচু ব্যাপার না। কাজ করা এটা সকলেরই দায়িত্ব। আমাদের ছাত্র-শিক্ষক, বিশেষ করে ছাত্রদের বলবো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যেন এগিয়ে আসে। ধানগুলো যদি ভালোভাবে তুলতে পারি আমাদের খাদ্যের অভাব হবে না। তাছাড়া যারা যেদিকে থেকে ধান কাটতে যাবেন তাদের যেতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমাদের এটাই চেষ্টা মানুষের জীবনটা যেন চলে আবার তারা যেন সুরক্ষিত থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প যেগুলো এখনই না করলেই চলে সেসব প্রকল্পের অর্থগুলো সাশ্রয় করার উদ্যোগ নিয়েছি। সেই অর্থ জনগণের কল্যাণে যেন কাজে লাগে। দেশের মানুষ যেন দুর্ভিক্ষের মুখাপেক্ষী না হয় সেটা মাথায় রেখে আগামী ৩ বছর অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’
দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঝড় ঝাপটা দুর্যোগ তো আসবেই। এই সময় হতাশ হওয়া বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাহসের সঙ্গে যার যার অবস্থান থেকে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। সেই প্রস্তুতি থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসলে দেশের মানুষ বেশি সাহসী হয়ে গেছে। তাদের বলা হয় আপনার ঘরে থাকেন, এখন কেউ যদি ঘরে না থেকে বৌ নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গেল। সেখানে করোনা ভাইরাসটি পৌঁছে দিল। বারবার অনুরোধ করছি, যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। এদেরকে যদি একটা জায়গায় ধরে রাখতে পারি, ওখান থেকে যদি সুস্থ করতে পারি তাহলে এটা বিস্তার লাভ করে না। কেন জানি মানুষ এটা মানতেই চায় না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘরে থাকতে অনুরোধ করছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট চেষ্টা করছে তারপরেও এখানে বসে আড্ডা ওখানে বসে গল্প। সবাইকে বলবো স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলবেন। নিজে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন, তাহলে কারও জীবন ঝুঁকিতে পড়বে না।’
অধিবেশনের প্রধান কর্মসূচি ছিল শোক প্রস্তাবের উপর সাধারণ আলোচনা। চলতি সংসদের সদস্য শামসুর রহমান শরীফসহ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে এই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা একইসঙ্গে শোক প্রস্তাবের উপর সাধারণ আলোচনা ও অধিবেশনের সমাপনী ভাষণ দেন। শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রবীণ সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, বেগম মতিয়া চৌধুরী ও শাহাজান খান। আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিতে শোক প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এরপর প্রয়াতদের স্মরণে নীরবতা পালন ও মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া। শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনা শেষে দিনের অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত করে অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশটি পড়ে শোনান স্পিকার।

The Post Viewed By: 232 People

সম্পর্কিত পোস্ট