চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর

১২ এপ্রিল, ২০২০ | ৩:০০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

নতুন কারাগারে প্রথম ফাঁসি

বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর

চিৎকার করে কেঁদে তওবা পড়েছেন ক্যাপ্টেন মাজেদ

বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি প্রাণদ-ের সাজাপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বহিষ্কৃত) আবদুল মাজেদের ফাঁসির দ- কার্যকর হয়েছে। কেরানীগঞ্জে স্থাপিত নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে গতরাত ১২টা ০১ মিনিটে এই দ- কার্যকর করেন জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে একটি দল। নতুন কারাগারে এটিই হচ্ছে প্রথম ফাঁসির দ- কার্যকরের ঘটনা। এ সময় কারাগারে আইজি প্রিজন, ঢাকার জেলার প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেল সুপারসহ সরকারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মাজেদের গলায় ফাঁসির রুজ্জু জড়ানোর আগে কারা নিয়ম অনুযায়ী সব রীতি অনুসরণ করা হয়। তাকে রাত ১০টার পর একজন মৌলানার মাধ্যমে তওবা করানো হয়। কারা সূত্র জানায়, চিৎকার করে কেঁদে তওবা পড়েছেন ক্যাপ্টেন মাজেদ। এর আগে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসির প্রস্তুতি দেখতে কারাগারে যান আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা। ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি আগে থেকে নিশ্চিত ছিল। ফাঁসি কার্যকরকে কেন্দ্র করে কেরানীগঞ্জের কারাগারের চারপাশে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তার মধ্যেই ফাঁসির দ- কার্যকর করার পর কারাগারে বাইরে অপেক্ষামান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করে মুহূর্মুহূ স্লোগান দেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই রায় কার্যকর হওয়ার পর স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ফাঁসির দ- কার্যকরের পর আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা ব্রিফিংয়ে বলেছেন, আবদুল মাজেদের ফাঁসির দ- কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো।
এদিকে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আবদুল মাজেদের স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করেন। বলাবাহূল্য, প্রায় ৪০ বছর এই খুনি নিরুদ্দেশ ছিলেন। গত মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফাঁসির দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে মাজেদের মরদেহ নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে তিনটি এম্বুলেন্স রাখা হয়েছে। জানা গেছে, মাজেদের মরদেহ ভোলায় দাফন করা হবে। সেখানে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে এম্বুলেন্স। তবে ভোলা থেকে তার মরদেহ দাফনের জন্য দেবে না এলাকাবাসী এমন দাবি উঠেছে। এ নিয়ে বিপাকে রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় মরদেহ পাঠানো হবে ও দাফনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। গতরাতে দ- কার্যকরের পর মাজেদের পরিবারের সদস্যরা কারাগারের ভিতরে প্রবেশ করে মরদেহ গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল আদালতে মৃত্যুর পরোয়ানা পড়ে শোনানোর পর সব দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চান আবদুল মাজেদ। পরে সেইদিনই প্রাণভিক্ষার আবেদনটি নাকচ করে দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুল মাজেদ গত ৭ এপ্রিল আদালতে সরকারের পিপি হেমায়েত উদ্দিনকে বলেছিলেন, ‘গত ২২-২৩ বছর তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। সেখান থেকে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। এরপর তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।’
জানা গেছে, খুনি মাজেদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে আরও কয়েকজন খুনির সঙ্গে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া চলে গিয়েছিলেন। এরপর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান তাঁকে সেনেগালের দূতাবাসে বদলি করেন। ১৯৮০ সালে দেশে ফিরে আসার পর মাজেদকে বিআইডব্লিউটিসিতে চাকরি দেন জিয়া। সে সময় উপসচিব পদমর্যাদায় তিনি চাকরি করেন। পরে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে তিনি সচিব পদে পদোন্নতি নেন এবং যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে পরিচালক পদে যোগদান করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার শুরু করে। সে সময় আত্মগোপনে চলে যান মাজেদ। তাঁর স্ত্রী ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন। মাজেদের চার কন্যা ও এক ছেলে রয়েছে। ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । কিন্তু এই হত্যাকা-ের বিচারে পদে পদে বাধা আসে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।
১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়ে রায় দেন। নি¤œ আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে এক আসামি আপিল করেন। কিন্তু এরপর ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ায় আটকে যায় বিচারপ্রক্রিয়া।
দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তদারকি সরকারের আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি আবার গতি পায়। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। আপিলের অনুমতির প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালের অক্টোবরে শুনানি শুরু হয়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করেন। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদ-াদেশ বহাল থাকে। এর মধ্য দিয়ে ১৩ বছর ধরে চলা এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়।
২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। ওই রায় কার্যকরের আগেই ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আসামি আজিজ পাশা।

The Post Viewed By: 148 People

সম্পর্কিত পোস্ট