চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

যত টেস্ট তত সুফল

৫ এপ্রিল, ২০২০ | ৩:০০ পূর্বাহ্ণ

আহমেদ শরীফ শুভ

মন্তব্য প্রতিবেদন

যত টেস্ট তত সুফল

  • যত বেশি মানুষকে টেস্টের আওতায় আনা যাবে সুফল মিলবে ততটাই
  • জার্মানি আর অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে

ধরে নিচ্ছি, রোগতত্ত্ব,রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর ) আমাদের যে তথ্য উপাত্ত দিচ্ছে তা সঠিক এবং তাদের দাপ্তরিক পরিসংখ্যানে কোন অসাবধানতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিও নেই। সেই সাথে অনেকেই মনে করছেন, গুজব আর আতংকের উপত্যকায় কোভিড-১৯ এর ব্যাপকভিত্তিক টেস্ট করিয়ে সংখ্যার আধিক্য দেখা গেলে তা জনমনে ভীতির সঞ্চার করবে,আক্রান্তদের একঘরে করে বিভিন্ন সামাজিক ও নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করবে। কিন্তু তার উল্টো চিত্রটি কিন্তু মোটেও নিরাপদ বিকল্প নয়। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের আপাত ধীরগতি কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তায় ভ্রান্ত উপলব্ধির জন্ম দিয়ে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমরা যে যুদ্ধে আছি তাতে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগে যদি আমরা বিষয়টি হাল্কাভাবে নিতে শুরু করি তবে তা আমাদের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসে অনেক সেনানায়ক চূড়ান্ত বিজয়ের ঠিক আগে প্রতিরক্ষা শিথিল করে দিয়ে কিংবা আগাম বিজয় উদযাপন করতে গিয়ে পরাজিত হয়েছেন। আমাদের সে পথে হাঁটলে চলবে না।
চীনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা গেছে, সেখানে ১২% সংক্রমণ হয়েছে উপসর্গবিহীন মানুষের সংস্পর্শ থেকে। অর্থাৎ এই মানুষগুলোর কোন উপসর্গ ছিল না। তারা জানতেনই না যে তারা করোনাভাইরাস বহন করে চলেছেন এবং তা নীরবে ছড়িয়ে গেছেন। চীন কিন্তু প্রথম থেকেই ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে টেস্টের আওতায় নিয়ে এসে করোনা পজিটিভ পাওয়া রোগীদের আইসোলেশনে নিয়ে গেছে এবং মারাত্মক উপসর্গের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। সেই চীনেই ১২% রোগী রয়ে গিয়েছিল সন্দেহের বাইরে। আমাদের দেশে যেখানে অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় টেস্ট করা হচ্ছে সেখানে উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানো শুরু করলে তা কী মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে তা বলাই বাহুল্য। আর এভাবে যে ছড়ানো শুরু হয়ে যায়নি তার নিশ্চয়তাই বা কি!
কোভিড-১৯ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। অধিকাংশ ভাইরাসজনিত রোগের মতো কোভিড-১৯ এরও আপাততঃ কোন সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে হাইড্রোক্সি ক্লোরকুইন, এজিথ্রোমাইসিন ও জিঙ্কের সমন্বয়ে চিকিৎসায় সুফল পাওয়া গেছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে কিংবা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে এখনো গবেষণা চললেও মারাত্মক রোগাক্রান্তদের নিরাময়ে আপাততঃ এই চিকিৎসা কিছুটা হলেও আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা যদি টেস্টের সংখ্যা সীমিত রেখে রোগাক্রান্তদের চিহ্নিত না করি তাহলে তারা এই চিকিৎসার সুফল থেকে বঞ্চিত হবে, অনেকে মারাও যাবে। অথচ এসব রোগীকে টেস্টের আওতায় এনে চিহ্নিত করতে পারলে তাদের নিরাময়ের সম্ভাবনা প্রবল।
তাছাড়া যেহেতু টেস্টের সীমিতায়নের কারণে করোনার উপসর্গে ভোগা অনেকেই টেস্ট করিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারছেন না, তারা এই ওষুধগুলো বিনা ব্যবস্থাপত্রে খাওয়া শুরু করে দিতে পারেন। এর মধ্যেই এই ওষুধগুলোর প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। পর্যাপ্ত টেস্টের অভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যদি জ্বর কিংবা শুকনো কাশির সব রোগী গণহারে এই ঔষধগুলো খাওয়া শুরু করেন তাহলে অনেকেরই মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। উপরি সমস্যা হিসেবে তখন বাজারে এই প্রয়োজনীয় ঔষধগুলোর সংকট দেখা দেবে, যাদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজন তাদের জন্য পাওয়া যাবে না।
কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই প্রায় বিনাচিকিৎসায় কোন প্রকার সমস্যা ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠেন। কিন্তু তাদের আইসোলেশনে না রাখলে তারা অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে দেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরণের অনেক রোগী কোভিড-১৯ এর জটিলতা হিসাবে পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের কারো কারো পালমোনারি ফাইব্রোসিস হয়ে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তারা এও বলছেন যে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের অনেকেরই পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত হার্ট এটাকের সম্ভাবনা থাকবে। এ ধরনের রোগীরা যদি জানতে পারেন যে তারা করোনা আক্রান্ত, সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও তারা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারবেন, নিয়মিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও শ্বাসরোগ বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকতে পারবেন। যদি পর্যাপ্ত টেস্টই না করা হয় তাহলে তো তারা তাদের বর্ধিত ঝুঁকির কথা জানতে পারবেন না।
জনস্বাস্থ্য সমস্যাসহ যে কোন বিপর্যয় মোকাবেলায় আমাদের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে গুজব এবং আতংক। গুজবের কারণে যেমন আতংকের সৃষ্টি হয় তেমনভাবে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষও বুঝে না বুঝে গুজব ছড়াতে সাহায্য করেন। এই গুজব এবং আতংকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন অন্য রোগের রোগী, যাদের কোভিড-১৯ নেই। কিন্তু যেহেতু পর্যাপ্ত টেস্ট করা হচ্ছে না, জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্টের রোগীদের মধ্যে কাদের করোনা ভাইরাস আছে, কাদের নেই সেটা বুঝা মুশকিল। এর ফলে এ ধরনের রোগীরা চিকিৎসা নিতে গেলে সবার মধ্যে আতংক সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ, টেস্টের মাধ্যমে করোনা পজিটিভ রোগীদের আইসোলেট করে অন্যদের নেগেটিভ রেজাল্ট জানিয়ে দিলে এই জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না। তাতে উভয় ধরণের রোগীরই সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
করোনা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য এবং গতি-প্রকৃতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা চলছে। এর মধ্যে কিছু কিছু উপাত্ত এর মধ্যে জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। কোন কোন তথ্যসূত্র বলছে বেশি তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস বাঁচতে পারে না তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে এর সংক্রমণ কমে আসবে। আবার অন্য সূত্রে জানা গেছে টিউবারকলোসিসের (যক্ষ্মার) ভ্যাকসিন (টিকা) করোনা প্রতিরোধে কার্যকর, তাই আমাদের দেশে কোভিড-১৯ এর তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম। তবে সব গবেষণাই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই উপাত্তগুলো শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হতে পারে, আবার নাও পারে। এখনই চূড়ান্ত সত্যি মনে করে আমরা যদি সাবধানতার বাঁধন হাল্কা করে দেই তাহলে তা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় করোনার সংক্রমণের গতি কমে এলে হয়তো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কমে যাবে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের কারণে ছড়ানোর গতি খুব একটা কমাতে পারার কথা নয়। তাছাড়া যে কোন তাপমাত্রায় মানবদেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সমান হওয়ায় একবার শরীরে প্রবেশ করতে পারলে জীবাণুটির কার্যকারিতা কমে যাবার সম্ভাবনা নেই। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় ৭০জন বাংলাদেশি অভিবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের তো অধিকাংশেরই যক্ষ্মার টিকা দেয়া থাকার কথা। সুতরাং এই তত্ত্বটিকে একেবারে বেদবাক্য হিসেবে ধরে নেয়ার সময় এখনো আসেনি। যতক্ষণ না এই উপাত্তগুলো সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত যত বেশি সম্ভব রোগী চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। আর তার জন্য বাড়াতে হবে টেস্টের সংখ্যা। যদিও কিছুটা দেরি হয়েছে, তবু বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। না হলে করোনা পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই আয়ত্বের বাইরে চলে যেত। কিন্তু টেস্টের সংখ্যা বহুগুণে বাড়িয়ে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী চিহ্নিত করে সুস্থ জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা (আইসোলেট) করতে না পারলে এই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এ প্রসঙ্গে জার্মানি ও অষ্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি প্রণিধানযোগ্য। জার্মানিতে করোনাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অজস্র হলেও মৃত্যুর হার খুবই কম (০.৯%)। সেখানে জ্বর, সর্দি, কাশির সব রোগীকেই পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে পজিটিভ রোগীর সংখ্যাও বেশি। কিন্তু পজিটিভ রোগীদের দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসা দেয়ার কারণে মৃত্যুর হার সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। অষ্ট্রেলিয়ায় যদিও উপসর্গে ভোগা সব রোগীকে পরীক্ষা করা হচ্ছে না, তবুও সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীকে পরীক্ষা করে পজিটিভদের আলাদা করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বা হোম আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে। যাতে সংক্রমণের গতি এবং মৃত্যুর হার (০.৪%)ও সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। নামেমাত্র সংখ্যায় টেস্ট করলে তা অর্জন করা সম্ভব হত না। বাংলাদেশের তাই উচিত জার্মানি আর অস্ট্রেলিয়ার পথে হাঁটা।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি উপজেলায় অন্ততঃ দিনে দুইজনকে টেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশটি সঠিক পদক্ষেপ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল। যদি স্থানীয় প্রশাসন এই ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা বজায় না রেখে সন্দেহভাজনদের টেস্ট না করে কেবল নেগেটিভ রোগীদের আধিক্য দেখানোর জন্য যে কাউকে টেস্ট করে সংখ্যা পূরণ করতে চান তাহলে এই নির্দেশ তার অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে।
করোনা ভাইরাসে মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে তার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা এবং আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাতে তারা অন্যদের সংক্রমণের কারণ হতে না পারেন। টেস্টের পরিধি বিস্তার না করলে অনেক রোগী পর্যবেক্ষণের বাইরে থেকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটাতে থাকবেন। যে কারণেই হোক, আমরা যদি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম দেখাতে চাই তাও কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমাদের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের অংশীদার দেশগুলো নিশ্চয়ই আমাদের করোনা পরিস্থিতির উপর নজর রাখবে, যেমন আমরা চোখ রাখবো তাদের উপর। সেসব দেশের কাছে যদি আমাদের করোনা নিয়ন্ত্রণ বিশ্বাসযোগ্য মনে না হয় তাহলে তারা নিজেদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার স্বার্থেই সংক্রমণের ভয়ে আমাদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনে অনীহা দেখাবে, যা আমাদের অর্থনীতিতে সুদূর প্রসারী নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এই মুহূর্তে আমাদের পর্যাপ্ত টেস্ট কিট নেই এটা সত্যি। গণস্বাস্থ্য আগামী সপ্তাহেই তাদের উৎপাদিত টেস্ট কিট সরবরাহ করতে পারবে বলে জানিয়েছে। সেই সাথে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে টেস্ট কিট আমদানির ব্যবস্থা করা জরুরি। আমাদের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ভেন্টিলেটারের চেয়েও টেস্ট কিট বেশি দরকার। যে ২-৫% রোগীর ভেন্টিলেটারের প্রয়োজন হতে পারে তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও আনুষঙ্গিক ওষুধের সরবরাহ আমাদের নেই, নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ। কিন্তু ব্যাপক হারে টেস্ট করে আক্তান্ত রোগীদের আলাদা করে সাপোর্টিভ চিকিৎসা দিলে এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করলে আমরা একদিকে যেমন ৯৫-৯৮% রোগীকে ভালো করে তুলতে পারি, তেমনি এর সংক্রমণও প্রতিহত করতে পারি। যেসব দেশ এখনো পর্যন্ত কোভিড-১৯ এ সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 392 People

সম্পর্কিত পোস্ট