চট্টগ্রাম সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

অতিথি সংকটে পাঁচ তারকা হোটেল

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অতিথি সংকটে পাঁচ তারকা হোটেল

রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেল। স্বাভাবিক সময়ে অতিথিতে পূর্ণ থাকে হোটেলটির মোট অতিথি কক্ষের ৮০ শতাংশ। পিক সিজনে খালি কামরা পাওয়াটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। হোটেলটির কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, পিক সিজন হওয়ায় চলতি বছরেও মার্চ পর্যন্ত সিংহভাগ কক্ষেই আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন অতিথিরা। কিন্তু গত এক মাসে এ আগাম বুকিংয়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি বাতিল করে দিয়েছেন তারা। সূত্র : বণিকবার্তা।

পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর ব্যবসার পিক সিজন ধরা হয় বছরের প্রথম তিন মাসকে (জানুয়ারি-মার্চ)। ব্যবসায়িক কারণে এ সময় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেন প্রচুর বিদেশী। এছাড়া বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনাও এ সময়টাতে থাকে তুলনামূলক বেশি। চাহিদা বেশি থাকায় বছরের এ সময় রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোয় কক্ষ খালি পাওয়াও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। আগাম বুকিং দেয়া থাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আগাম বুকিং দেয়া ছিল হোটেলগুলোর সিংহভাগ কক্ষের। কিন্তু বর্তমানে পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর এসব আগাম বুকিং বাতিলের হিড়িক পড়েছে অতিথিদের মধ্যে। যারা আসছেন, ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত ফিরে যাচ্ছেন তারাও। হোটেলগুলোয় এ অতিথি সংকটের পেছনে দায়ী করা হচ্ছে চলমান নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্ককে।

অতিথি আগমন ছাড়াও এসব হোটেলের রাজস্ব আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো ভেন্যু হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেলা-প্রদর্শনী আয়োজন। কভিড-১৯ আতঙ্কে এসব প্রদর্শনীও বাতিল হচ্ছে একের পর এক। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর ব্যবসায় ধস নেমেছে পিক সিজনেই।

রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হোটেলগুলোয় মার্চ পর্যন্ত ৭০-৮০ শতাংশ অতিথি কক্ষ আগাম বুকিং দেয়া ছিল। বিশেষ কিছু দিনে কোনো কোনো হোটেলে কোনো কক্ষই ফাঁকা ছিল না। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস ইস্যুতে শেষ মুহূর্তে এসে বেশির ভাগ বুকিং বাতিল করছেন ভ্রমণকারীরা। ফলে এসব হোটেলে অতিথির আগমন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সে সঙ্গে প্রতিদিনই বাতিল হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-প্রদর্শনীর আগাম বুকিংও। ফলে হোটেলগুলোর ব্যবসা নেমে এসেছে সক্ষমতার ৪০-৫০ শতাংশে।

জানা গেছে, বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যবসায়িক কারণে যেসব বিদেশী বাংলাদেশ ভ্রমণ করে থাকেন, তাদের বড় একটি অংশ পোশাক খাতের ক্রেতা। কারখানাগুলোয় আসন্ন গ্রীষ্মের পোশাকের অর্ডার দিতে এ সময় আসা-যাওয়া করেন তারা। কিন্তু এ বছরের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কভিড-১৯ আতঙ্কে পাশ্চাত্যের পোশাক খাতের ক্রেতাদের আগমন এখন একেবারে তলানিতে। পোশাকের কাপড় কিনতে তারা যেমন চীনে যাচ্ছেন না, তেমনি সেলাইয়ের অর্ডার দিতে আসছেন না বাংলাদেশেও। এছাড়া বিদেশী পর্যটকদেরও অধিকাংশই এখন বাংলাদেশ ভ্রমণ বাতিল করছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোয় বিদেশীদের বুকিং বাতিল শুরু হয় গত ২০ জানুয়ারির পর। চলতি মাসের শুরু থেকে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যারা আসছেন, ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে ফিরে যাচ্ছেন তারাও। এ অবস্থায় হোটেলগুলোর ব্যবসা অনেকটা স্থানীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকনির্ভর হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলের এক পরিচালক বলেন, নভেল করোনাভাইরাস বিশ্বের ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। কারণ সংক্রমণের ভয়ে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেউ আর ভ্রমণ করছেন না। ফলে রাজধানীর হোটেলগুলোর ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে গুলশানের তারকা হোটেলগুলোর ৯৭ শতাংশ অতিথিই বিদেশী, যারা মূলত পোশাক খাতের বিদেশী ক্রেতা এবং বিভিন্ন দূতাবাসসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পোশাক খাতের বিদেশী ক্রেতারা মূলত চীন থেকে কাপড় কিনে বাংলাদেশ আসেন তৈরির অর্ডার দিতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতারা যেহেতু চীনে যাচ্ছেন না, তাই তারা বাংলাদেশেও কম আসছেন। এরই প্রভাব পড়ছে  হোটেলগুলোর বুকিংয়ে।

এ বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে রাজধানীর বিমানবন্দর রোডে অবস্থিত একটি হোটেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে হোটেলটির ৮০ শতাংশের বেশি রুম অতিথিতে পূর্ণ থাকে। গত এক মাসে তা নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে। এ এক মাসেই কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে হোটেলটি।

বিদেশী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রায়ই বাণিজ্যিক প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন করে থাকেন বিভিন্ন খাতের দেশী ব্যবসায়ীরা। ভেন্যু হিসেবে এসব মেলা ও প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমেও বেশ ভালো ব্যবসা হয় পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে এ ধরনের অনুষ্ঠানও এখন বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমই) এবং তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান ইয়র্কারস ট্রেড অ্যান্ড মার্কেটিং সার্ভিস কোং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে গত ১২-১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ১৫তম আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক মেলা-২০২০। কিন্তু অনিবার্য কারণ দেখিয়ে জুন পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। একইভাবে স্থগিত করা হয়েছে বিটিএমইএর টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট মেশিনারি প্রদর্শনীও।

শঙ্কা বাড়াচ্ছে পর্যটন খাতের মন্দা ভাবও। হোটেল খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশই নয়, এশিয়াজুড়ে পর্যটক ও বিজনেস ট্রাভেলারদের সংখ্যা হ্রাস পাবে। সংক্রমণের আশঙ্কায় এ সময় কেউ কোনো দেশে খুব প্রয়োজন না হলে ভ্রমণ করবে না। এরই মধ্যে ফ্লাইটগুলোয় যাত্রী সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এর একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। চীন ও অন্যান্য আক্রান্ত দেশ ভাইরাসটিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলে এশিয়ার ভ্রমণ পর্যটন খাত সহসা গতি পাবে না। বিশেষ করে তারকা হোটেলগুলো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়বে।

এদিকে ট্যুর অপারেটররা বলছেন, কভিড-১৯-এর কারণে চলতি পর্যটন মৌসুমে দেশী-বিদেশী পর্যটক নিয়ে আসার উদ্যোগ আপাতত স্থগিতই বলা যায়। বিদেশী পর্যটকরা না আসায় পর্যটন খাতে শুধু ফেব্রুয়ারিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে কমপক্ষে শতকোটি টাকায়। এ পরিস্থিতি এপ্রিল পর্যন্ত চালু থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হবে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল লিমিটেড (পিএটিএ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব ও ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক পরিচালক তৌফিক রহমান জানান, খোঁজ নিয়ে জেনেছি সাম্প্রতিক সময়ে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের অতিথি বুকিং অন্তত ৪০ শতাংশ কমে গেছে। প্রায় একই অবস্থা অন্য তারকা হোটেলগুলোতেও। বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকদের ভ্রমণে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে বুকিং বাতিল করছেন তারা। এতে ট্যুর অপারেটররা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ক্ষতির মুখে পড়ছে এয়ারলাইনস ও হোটেলগুলোও। আবার অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করে দেয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকরাও আসছেন না। তারা সাধারণত বাংলাদেশে এলে এক-দুই মাসের জন্য হোটেল বুকিং দিয়ে রাখতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব নিয়মিত অতিথিও হারাচ্ছে হোটেলগুলো।

একই কথা জানালেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিহা) সভাপতি হাকিম আলীও। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চলমান অনেক প্রজেক্টে চীনা নাগরিকরা কাজ করছেন, যারা সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য হোটেল বুকিং দিয়ে থাকেন। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে তাদের প্রায় সবাই বুকিং বাতিল করছেন। পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও বিদেশীরা কম আসছেন। বর্তমানে হোটেলগুলোর মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫০ শতাংশ কক্ষের বুকিং রয়েছে। কিন্তু এ সংকট চলমান থাকলে হোটেলগুলো লোকসানে পড়বে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে পাঁচ তারকা হোটেল রয়েছে ১৭টি। এর মধ্যে ১০টির অবস্থান রাজধানী ঢাকায়, যেগুলোর কক্ষ সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এর মধ্যে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে ২৭৭টি, ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় ২২৬টি, র্যাডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ২০৫টি, ওয়েস্টিনে (ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড) ২৩৫টি, লা মেরিডিয়ান ঢাকায় ৩১৭টি, রেনেসাঁস হোটেলসে ২১১টি, ফোর পয়েন্টসে ১৪২টি ও হোটেল আমারিতে ১৩৪টি অতিথি কক্ষ রয়েছে।

 

 

 

পূর্বকোণ/আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 739 People

সম্পর্কিত পোস্ট