চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আলোর মুখ দেখেনি ৮ সুপারিশ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৭:১২ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

আলোর মুখ দেখেনি ৮ সুপারিশ

জীবনের ঝুঁকি জেনেও নিশ্চিত জীবন যাপনের স্বপ্নে সাগর পথে মালেশিয়া পাড়ি দিচ্ছে রোহিঙ্গা নারী পুরুষ। এতে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে মাঝ সাগরে, আবার অনেকে হয়তো পৌঁছে যাচ্ছে স্বপ্নের মালেশিয়ায়। কেউ অর্থের লোভে আবার কেউ যাচ্ছে সংসার করতে।

চব্বিশ বছর বয়সী রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ রফিক। সাগর পথে মালেশিয়া যাবার উদ্দেশ্যে গত বছরের ১৭ নভেম্বর বালুখালি ক্যাম্পের বাসা থেকে বের হয়ে যায়। মাঝ সাগরে ট্রলারে সে মারা যায়। রফিকের সাথে একই ট্রলারে ছিলো বালুখালি নয় নম্বর ক্যাম্পের মোহাম্মদ নুর (২১), আবদুল লতিফ (৩২) ও ১৮ নম্বর ক্যাম্পের মোহাম্মদ আলম। রফিক মারা গেলেও বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা কেউ জানে না। একই ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা দালাল মো. গফুর মিয়ার হাত ধরে তারা ক্যাম্প ছেড়েছিলো। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নুর বশর (২৫) জোবাইদা বেগম (১৬) হাসিনা বেগম (১৬) মালয়েশিয়া যাবার উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে চলে যায়। রোহিঙ্গা দালাল ছৈয়দুল ইসলাম ও মো. সেলিম তাদেরকে নিয়ে যায় বলে জানা যায়। এরপর থেকে তাদের আর কোন খোঁজ মেলেনি।

গত ১৮ ডিসেম্বর নোয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১৭৩ জন রোহিঙ্গা নারী পুরুষ সাগর পথে মালয়েশিয়া যাবার সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে শীলেরকুম এলাকায় মালেশিয়াগামী একটি ট্রলারডুবে ১৫ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে অর্ধশতাধিক। দালালের লোভনীয় প্রস্তাবে নিশ্চিত জীবনের স্বপ্নে জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও রোহিঙ্গারা সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খোন্দকার গোলাম ফারুক জানান, মাঝখানে বেশ কিছুদিন মানবপাচার বন্ধ ছিলো। পুলিশ নিয়মিত তদারকিতে রয়েছে। এরমধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারি একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। ডিআইজি বলেন, রোহিঙ্গাদের অনেকের আত্মীয় স্বজন মালয়েশিয়া রয়েছে। অনেকের সাথে আবার বিয়েও হচ্ছে। এ কারণে জীবনের ঝুঁকি জেনেও সাগর পথে মালয়েশিয়া যাবার ঝুঁকি নিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারের মতো বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা মানব পাচারের শিকার হয়েছে। এ সংখ্যা ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের দ্বিগুণ। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অনিয়মিত সমুদ্রপথে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করছে মানুষ।
মানবপাচার রোধে পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি ১১ জন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী, ২৩০ জন বাংলাদেশি পাচারকারী ও সাতজন হুন্ডি ব্যবসায়ী চিহ্নিত করেছিলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এগারো আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীর মধ্যে চারজন বিদেশি নাগরিক থাকলেও সাতজন বাংলাদেশের বাসিন্দা। তারা হলেন, মালয়েশিয়ার মানাকিং, থাইল্যান্ডের মং, থেনও, মিয়ানামারের চট্ট জেলার চট্টবার গ্রামের মৃত আবদুল মাবুদের ছেলে আবদুল গফুর। বাকি সাতজন হলেন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার জলিলুর রহমানের ছেলে মালেশিয়া প্রবাসী আবদুল আমিন, একই এলাকার মৃত ফজল হকের ছেলে মালয়েশিয়া প্রবাসী আক্তার হোসেন, মৃত সুলতান আহমদের ছেলে মালয়েশিয়া প্রবাসী আবু তৈয়ব, একই এলাকায় বাসবসারত রোহিঙ্গা মৃত সুলতান আহমদের ছেলে দিল মোহাম্মদ, তিন মালয়েশিয়া প্রবাসী শাহ পরীর দ্বীপের দক্ষিণ নয়াপাড়ার আবদুল হাশিমের ছেলে আনার আলী, রঙ্গিখালির দুধু মিয়ার ছেলে সলিম উল্ল্যাহ ও উখিয়া থাইংখালির মৃতে মৌলানা আবদুল করিমের ছেলে মো. সুমন।
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান), বর্তমানে পিবিআই’র (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্বে উক্ত তদন্ত কমিটির তিন সদস্য ছিলেন, চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) নিয়াজ মোহাম্মদ, নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাইমুল হাছান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহম্মেদ।
২০১৪ সালে দেয়া এ প্রতিবেদনে মানবপাচার রোধে আটটি সুপারিশের কথা বলা হয়েছিলো। মাঝখানে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও সেই সুপারিশ আলোর মুখে দেখেনি।

কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিলো তা হলো :
১. বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় তিন শতাধিক পাচারকারী বাংলাদেশ থেকে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারে জড়িত, মানবপাচার আইনে রুজুকৃত মামলাগুলো সঠিক ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে এদের সঠিক পরিচয় উদ্ধার ও আইনের আওতায় আনা সম্ভব। পুলিশ সদরদপ্তরের নেতৃত্বে এই মামলাগুলো তদন্ত তদারকির জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। এই মনিটরিং সেলের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞ এটর্নি জেনারেলের প্রতিনিধি থাকা আবশ্যক।
২. মানব পাচার আইনে রুজুকৃত মামলাগুলোর বাদি এবং সাক্ষীরা সাধারণত সমাজের দুর্বল শ্রেণির লোক হয়ে থাকে। প্রায় সময় তারা মামলায় সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আদালতে উপস্থিত হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। স্বল্প সংখ্যক আসামির শাস্তি নিশ্চিত করতে সাক্ষী হাজিরার বিষয়ে জেলা ও মেট্টোপলিটন পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।
৩. মানবপাচারকারীর সংখ্যা যেহেতু খুব বেশি নয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার মতো মানব পাচার আইনে রুজুকৃত মামলামগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে বিচার করা যেতে পারে।

৪. এ পর্যন্ত সাগরপথে মালয়েশিয়া মানবপাচারের যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশই কক্সবাজারের জেলার টেকনাফ থানার শাহ পরীর দ্বীপকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছে। অধিকাংশ পাচারকারির আবাসস্থল শাহ পরীর দ্বীপে। শাহ পরীর দ্বীপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন।এ লক্ষ্যে শাহ পরীরদ্বীপে একটি পুর্ণাঙ্গ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
৫. সাধারণত উপকূলীয় এলাকা গুলোতে মানবপাচারের ঘটনা ঘটে থাকে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া মানব পাচার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। উপকূলীয় অঞ্চলভিত্তিক মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানার অফিসার ইনচার্জ, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এবং উপকূলীয় পর্যায়ের এনজিও কর্মকর্তাগণ এ কমিটির সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। এদের সমন্বয়ে জেলা পর্যায়ে একই ধরনের কমিটি থাকা উচিত।
৬. থাইল্যান্ড, মালেশিয়ার প্রবাসী বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মানবপাচারের সাথে জড়িত। এইসব প্রবাসীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ছাড়া মালেশিয়া ও থাইল্যান্ড বংশোদ্ভূত মানব পাচারকারিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
৭. টেকনাফ থানার সাথে ৬০ কিলোমিটার এবং উখিয়ার সাথে ২০ কি. মি. নৌপথ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ রোধ ও মানব পাচার ঠেকাতে এসব এলাকার নৌ-পথে নৌ পুলিশের ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে।
৮. বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালেশিয়া এ চারটি দেশে মানবাপাচারের ঘটনা ঘটে থাকে। মানব পাচারকারিদের আর্থিক সমন্বয় ও লেনদেনের ক্ষেত্রে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এদের আইনের আওতায় আনাও জরুরি। ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে ৪২২টি। গত এক বছরে মামলার সংখ্যা বেড়েছে আরো ১৯৯টি। সবমিলিয়ে শুধু কক্সাবাজার জেলাতেই মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে ৬২১টি। ২০১০ সালের দিকে টেকনাফ পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মালেশিয়ায় প্রথম মানবপাচারের সূচনা হয়। ২০১২ সালের পর থেকে বেড়ে যায় মানবপাচারের প্রবণতা। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কৃত হবার পর ২০১৬ সালের পর মাঝখানে বছর দুয়েক মানবপাচার বন্ধ ছিলো।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 118 People

সম্পর্কিত পোস্ট