চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৪ মে, ২০১৯ | ২:০০ পূর্বাহ্ণ

সনেট দেব

চিত্রশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্যের ক্লান্তিহীন ছুটে চলা…

‘ছাত্র জীবনে আমরা বন্ধুরা মিলে প্রায় আউটডোরে জলরঙের মাধ্যমে আঁকার জন্য বের হতাম। অনেক দেখে কোন একটা নিসর্গ দৃশ্য পছন্দ করে কাজ করা শুরু করলাম। কাজ করতে করতে দেখা গেল আশেপাশে ছোট-বড় অনেকেই কি করছি দেখার জন্য এসে দাঁড়িয়েছে। আমি একমনে মাথা নিচু করে জলরং করে যাচ্ছি। হঠাৎ সামনের সাবজেক্ট দেখার জন্য মাথা তুলতেই দেখি; একি যা দেখে আঁকছিলাম তার আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সাবজেক্ট পিছনে রেখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় উৎসূক সব মুখ! তারপর হেসে বলতে হতো সামনে থেকে সরে আমার পাশে এসে দাঁড়াও তাহলে আমি কাজ করতে পারব। এইসব মনে পরলে খুব স্মৃতি কাতর হয়ে যাই।’ ছোট বেলার ঠিক এমননি একটি মজার স্মৃতি দিয়ে শুরু করেন শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য।
নামটি ওপার বাংলার আধুনিক গানের শিল্পীর সাথে মিললেও এপার বাংলার আমাদের শ্রীকান্ত কিন্তু একজন চিত্রশিল্পী। পাথরের টাইলস কেটে ম্যুরাল সৃষ্টিতে, মাটির নানা ধরনের টেরেকোটার কাজ করে ইতোমধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য। শিল্পী ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ১৯৯৬ সালে এস এস সি, ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম আর্ট কলেজ থেকে বি.এফ.এ.প্রি পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। ২০০৭ সালে চারুকলা বিভাগ থেকে চিত্রকলায় গ্রেজুয়েশান শেষ করেন এ শিল্পী।
শিল্পী ২০১৪ সালে দেশের ৪৫ টি জেলায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্সে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ৪৫ টি টাইলস মুর‌্যাল করেন। ২০১৫ সালে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেইটের একপাশে ৫২ থেকে ৭১ এর স্বাধীনতার ইতিহাস টেরাকোটা এবং অন্য পাশে বাংলাদেশের ১১ জন মহীয়সী নারীর টাইলস মুর‌্যাল তৈরী করেন। মহীয়সী নারীর মধ্যে স্থান পায় নভেরা আহমেদ, জাহানারা ইমাম, বীরকণ্যা প্রীতিলতা, ইলামিত্র চৌধুরী, কল্পনা দত্ত, কামিনী রায়, ফিরোজা বেগম, নীলিমা ইব্রাহিম, বেগম সুফিয়া ও বেগম রোকেয়া। এছাড়া ২০১৬ বরিশাল শিক্ষা একাডেমিতে ৭ বীর শ্রেষ্ঠ ও বান্দরবন নীলগিরিতে আদিবাসী জাতিসত্তা নিয়ে টেরাকোটায় কাজ করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন এ শিল্পী।
২০১৮ সালে জামালখান সেন্টমেরিস স্কুলের দেয়ালে ‘বরেণ্য বাঙালি’ শিরোনামে বিশ বরেণ্য ব্যক্তিকে নিয়ে টাইলস মুর‌্যাল করে শিল্পী সবার বেশ নজরে চলে আসেন। দৈনিক আজাদীর সৌজনে ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এই মুর‌্যালে স্থান পায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাই, মাইকেল মধুসুধন দত্ত, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সহ বিশজন খ্যাতিমান বাঙালি। এ প্রতিকৃতি স্থাপনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নতুন করে জানার সুযোগ পাবে। কাজটি উদ্বোধন করেন মাননীয় মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট রোডে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, শেখ হাসিনা ও মেয়র আ জ ম নাসির এর টাইলস মুরালও বেশ দৃষ্টি নন্দন হয়ে ওঠে।
এছাড়াও গত মাসে উদ্বোধন হলো কাজীর দেউরীর মিড আইল্যান্ড থেকে স্মরনিকা ক্লাব পর্যন্ত স্থাপন করা ‘ষড়ঋতুর স্বদেশ’ শিরোনামের চব্বিশটি প্যানেলের ম্যুরাল। ঋতু বৈচিত্রের বিষয় মাথায় রেখে ছবিগুলো নির্বাচন করেছেন শিল্পী। গ্রীষ্মের ফোঁটা কৃষ্ণচুড়া, স্বর্ণালু ফুল, কালবৈশাখীর ঝড় হাওয়া, কাঁঠাল যেমন বিষয় হিসাবে এসেছে, তেমনি বর্ষার বৃষ্টি ভেজা কদমফুল, গ্রাম্য বালিকার শাপলা সংগ্রহ, বৃষ্টি¯œাত গ্রাম্য বালকের মাছ ধরা ফুঠে উঠেছে নগরীর ব্যস্ত রাস্তায়। শরৎ এর নদী পাড়ের কাশফুলের পাশ দিয়ে জেলে নৌকার মাছ ধরার দৃশ্য বাংলার প্রকৃতিকে তুলে এনেছি শহুরে জীবনের ক্লান্তি গুছাতে। হেমন্তের ধান কাটা, ধান মাড়াই এর ছবিতে কৃষাণী বধুর মুখে স্তিমিত সোনালী দিনের হাসিতে গ্রামীণ শ^াসত বাংলার প্রতিছবি তুলে ধরেছি। উদ্বোধন করেন মাননীয় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। কাজটিতে সহযোগী শিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন মো ইমরান, মুন।
শিল্পী বার্ষিক প্রদর্শনী ২০০৪, চারুকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^দ্যিালয়; এনিমেটেড স্কাল্পচার ২০০৫ (আয়োজনে- পোড়াপাড়া স্পেস ফর আর্টিস্ট); ট্রায়াংগেল শিরোনামে ২০১৭, চিত্র প্রদর্শনীসহ আরও অনেক গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। শিল্পী বলেন, ‘আধুনিক শিল্পচর্চার জনপ্রিয় নানা মাধ্যমের একটি পারফরমেন্স আর্ট। একজন শিল্প চর্চাকারী হিসেবে শিল্পের নতুন নতুন মাধ্যমে কাজ করার জন্য মনের দরজা জানালা খোলা রাখতে আমি ভালবাসি। আমি পারফরমেন্স স্টেজ ১, ২০১৬ (আয়োজনে- পোড়াপাড়া স্পেস ফর আর্টিস্ট); গ্লোবাল পারফরমেন্স ডে, ২০১৬ (আয়োজনে- পোড়াপাড়া স্পেস ফর আর্টিস্ট) ও চিটাগং ওপেন আর্ট ভিয়েনাল, ২০১৯ এর পারফরমেন্স আর্টে অংশগ্রহণ করি।’ শিল্পীর পুরস্কার হিসেবে রয়েছে বার্ষিক প্রদর্শনী ২০০৪, চারুকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^দ্যিালয়ের চিত্রকলায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
আগামীর কাজ হিসেবে বলতে গিয়ে শিল্পী বলেন, ‘হাতে আছে ‘সমৃদ্ধির স্বদেশ’ শিরোনামের চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১৯টি প্যানেলে করা ম্যুরালিটির কাজ শেষ হয়েছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কাজটি জেলা পরিষদের বিপরীতের দেয়ালে স্থাপনের কাজ শুরু হবে। কাজ শুরু করছি ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে ৫২ থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের টাইলস মুরাল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাস্কর্য ও ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা দিবসের দলিলে স্বাক্ষর প্রদানের দৃশ্যটিও ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হবে।’

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 453 People

সম্পর্কিত পোস্ট