চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ওলগা তোকারচুক একের ভেতর অনেক

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

ড. মহীবুল আজিজ

ওলগা তোকারচুক একের ভেতর অনেক

১৯৯৬ সালে আমি ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজবাসী। সে-বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ভিস্লাভা শিম্বর্সকা। আমার পোলিশ বন্ধু ভয়েশ্চেক এতটাই খুশি আর উচ্ছ্বসিত, কেম্ব্রিজ থেকে একটা ফ্যাক্স পাঠিয়ে দিল পোল্যান্ডে। সেই বিকেলেই, যেদিন ঘোষিত হয় পুরস্কার। কেম্ব্রিজে বসবাসরত জনাবিশেক পোলিশের সই ছিল এ-ফোর সাইজের একটা কাগজে। সবশেষের সইটা ছিল আমার-বন্ধনীতে লিখে দেয় ভয়েশ্চেক- আমাদের বাংলাদেশের বন্ধু। আমাকে তার পছন্দ করবার একটা কারণ ছিল। ১৯৯৩-এর দিকে আমি বিখ্যাত পোলিশ কথাসাহিত্যিক আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের শোশা উপন্যাসটি অনুবাদ করেছিলাম। তাতে সে দারুণ আনন্দিত হয়। তার কাছ থেকেই আমি জানি, সিঙ্গারের উপন্যাসের বিখ্যাত ইহুদিপাড়া ক্রোখমালনা স্ট্রিট হিটলারের নরমেধযজ্ঞের পরে হয়ে গেছে ইহুদিশূন্য। শুধু তা-ই নয়, প্রাচীন সব ইহুদি নাম বদলে ফেলেছে রোমান ক্যাথলিক পোলিশরা। উপন্যাসের সেসব নাম রাওয়ারুস্কা, র‌্যাঝিমিন, গ্রিবাওস্কা সবই বদলে ফেলা হয়েছে। অথচ ইহুদিরা আট/নয়শ’ বছর ধরে বসবাস করে গেছে পোল্যা-ে। আমি বলি ভয়েশ্চেককে, এসব তোমাদের জাতিগত ঘৃণার প্রতিফলন। আমার কথার প্রতিবাদ সে করে না। ও রোমান ক্যাথলিক তবু স্বীকার করে, পোল্যা-ে ইহুদিরা জাতিবিদ্বেষের শিকার হয়েছিল। ভয়েশ্চেকের উৎসাহে আমি তখন পোলিশ সাহিত্যের অনেক লেখকের লেখা পড়বার সুযোগ পাই। শোশা উপন্যাসের নায়ক এ্যারন গ্রাইডিংগার এবং এর অন্যতম প্রধান চরিত্র মরিস ফাইটেলজোন। এ্যারন ধার্মিক এবং মরিস অবিশ^াসী। উপন্যাসে জ্যাকব ফ্রাংক সম্পর্কে কথাবার্তা থাকে বেশ খানিকটা জায়গায়। এমনকি মরিসকে মনে হচ্ছিল জ্যাকবের অনুরাগী। অসাধারণ এই ঐতিহাসিক চরিত্রটি সম্পর্কে পরে বিশদভাবে জানতে পাই। ঠিক যেন রাশিয়ার রাসপুটিনের ভিন্ন এক সংস্করণ। একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব উদ্ভাবনা দিয়ে এক বিশাল জনসমষ্টিকে এমনই মোহাবিষ্ট করে রাখে যে সমাজ-রাষ্ট্র-ইতিহাস সবখানে তার প্রভাব পড়ে। ২০১৪ সালে পোল্যান্ডের লেখক, সিঙ্গারের পরে আরেক পোলিশ এবং নিঃসন্দেহে বর্তমান বিশে^র অন্যতম সেরা লেখক ওলগা তোকারচুকের দ্য বুকস্ অব জ্যাকব প্রকাশ পেলে বোঝা গেল ইতিহাস-ধর্ম-রাজনীতি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা না থাকলে এমন লেখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জ্যাকব ফ্র্যাংকের মত জটিল চরিত্র এবং অষ্টাদশ শতকের রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউরোপিয় গ্যালাক্সির অষ্টাবক্র বাস্তবতা বিষয়ে একুশ শতকের লেখক যখন লেখেন কোন উপন্যাস তখন তাঁর শক্তিমত্তা নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না। ওলগা তোকারচুক হয়তো নিজেকে বামপন্থী, নিরামিষাশী এবং নারীবাদী লেখক হিসেবে তুলে ধরতে ভালোবাসেন কিন্তু তাঁর সামগ্রিক রচনার নিরিখে উপর্যুক্ত প্রতিটি বিশেষণ তাঁর জন্যে সংকীর্ণ বলেই মনে হবে। কেননা, ওলগা’র শৈল্পিক ক্ষমতাকে তাঁর নারীত্বের আয়তনে রেখে দেখা চলে না। তিনি বহু শক্তিমান পুরুষ রচয়িতার চাইতেও অনেক শক্তিশালী।

ওলগার উপন্যাসের ভাষা আধুনিক জীবনের সঙ্গে দ্রুত ও সরাসরি যোগাযোগ রচনা করে। তাঁর আগেকার সিঙ্গার কিংবা শোলেম আলাইখেমের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবো পূর্বতনরা যেখানে গল্প বলার বর্ণনামূলক রীতির অনুসারী সেখানে ওলগার ভাষা নিরাবেগ, বিশ্লেষণপ্রবণ এবং কখনও কখনও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার স্পর্শযুক্ত। তাঁর নিজের বিষয় অবশ্য মনস্তত্ত্ব এবং ফ্রয়েড এবং ইয়ুং তাঁর মনোযোগের ক্ষেত্র- তাঁদের সম্পর্কে লিখেছেনও তিনি। ফ্লাইটস্ (পলায়ন এবং উড্ডয়ন দু’টো অর্থই বহন করে।) উপন্যাসের খানিকটা অংশ লক্ষ করা যাক-

“এই যে আমি
আমার বয়স হয় নি তেমন একটা। জানলার কার্নিশে বসে আছি এলোমেলো খেলনা, মাটিতে উল্টে থাকা ব্লক-টাওয়ার
আর ফোলা-ফোলা চোখঅলা পুতুলগুলোর ঘেরের মধ্যে। ঘরটা অন্ধকার। কামরার হাওয়া ক্রমে ঠা-া মৃদুমন্দ হয়ে আসছে।
আর কেউ নেই এখানে। জায়গাটা ছেড়ে গেছে তারা, চলে গেছে। যদিও তখনও তাদের মিয়ে আসা কণ্ঠস্বর তুমি শুনতে
পাচ্ছো। তাদের হৈ-চৈ, পদশব্দের প্রতিধ্বনি, দূরগামী হাস্যস্ফূর্তি এসব। জানলার বাইরে আঙ্গিনাটা ফাঁকা। হাল্কা আঁধার
আকাশ থেকে নামে। ছেয়ে যাচ্ছে চতুর্দিকে কালো শিশিরের মত। …
সেই জীবনটা আমার জন্যে নয়। আমি সেই জিনের উত্তরাধিকারী নই যে-জিনের স্বভাব হলো যখন কোথাও তুমি একটা
সময় ধরে থাকতে শুরু করলে আর তুমি শেকড় গাড়তে শুরু করে দিলে সেখানে। অনেকবার চেষ্টা করেছি আমি কিন্তু
আমার শেকড় সবসময়ই অগভীর। সর্বদা সামান্যতম হাওয়ার ধাক্কা টলিয়ে দিতে পারে আমাকে। আমি জানতাম না কী
অংকুরিত হতে হয়। মোটকথা সেই সব্জিসুলভ সক্ষমতা আমার নেই। মাটি থেকে পুষ্টি টেনে নিতে পারি না আমি। আমি
হলাম এ্যান্টিয়াসের বিপরীত। আমার শক্তি আসে গতিবিধি থেকে- বাসের দুলুনি থেকে, প্লেন আর ট্রেনের গুড়–গুড় শব্দ
থেকে, ফেরির দোদুল্যমানতা থেকে।”

কাহিনির সূত্র থাকে ওলগার উপন্যাসে কিন্তু সেটা এজন্যে, পাঠককে এগিয়ে যাওয়ার একটা সূত্র ধরিয়ে দিতে। ওলগার কথকতার ভঙ্গিটাই এমন যেন তাঁর উল্টোদিকে এমন একজন উপস্থিত যাঁর সঙ্গে চলছে তাঁর চাপান-উতরের পর্ব। শোনার চাইতেও শোনানোর দিকে তাঁর অধিক ঝোঁক। আর কে না জানে, সেটা করতে গেলে ইতিহাসের ধারা-প্রধারা, সমাজ-রাষ্ট্র-বিজ্ঞান-ধর্ম এসব সম্পর্কে প্রয়োজন যথেষ্ট ওয়াকিবহালতা। তাই, ওলগাকে পড়তে গেলে আগে থেকেই নিয়ে রাখতে হয় প্রস্তুতি। আমরা আশা করবো না, তিনি আমাদের সরলরেখার কোন গল্প শোনাবেন। তাঁর উপন্যাস দ্য বুকস্ অব জ্যাকব-এর কথা বলা যায়। ঐতিহাসিক চরিত্র জ্যাকব ফ্রাংককে কেন্দ্রতে রেখে সমগ্র পোলিশ জাতির সামনে ওলগা উপস্থাপন করেন তাঁর ডিসকোর্স। উপন্যাসে ১৫৪২ সালের প্রসঙ্গ আনেন তিনি যখন সেই বছরটা সংখ্যার অতিরেক এমন কোন ব্যঞ্জনা বয়ে আনে না। সেটা ১৫৪১ কিংবা ১৫৪৩-এর মতই একটা বছর। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমরা জানবো, ১৫৪২-এ লেখা হয় কোপার্নিকাসের ডে রিভল্যুশনিবুস অর্বিয়াম কোলেস্টিয়াম গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়। লেখা হয় ভেসালিয়াসের ডে হিউমানি কর্পোরিস ফ্যাব্রিকা-র গোটা অংশ। দু’টো বইয়ের একটাও সবকিছুকে ধারণ করে নি। ওলগা বলছেন, কোন কিছুই কী সবকিছুকে ধারণ করতে পারে। সেটা বাস্তবে অসম্ভব। কেননা, কোপার্নিকাস তখনও সৌরজগতের অনেকটাই জানতেন না। ইউরেনাস আবিষ্কৃত হলো আরও পরে, ফরাসি বিপ্লবের যুগে। তেমনই মানব-শরীরের অনেক কিছু সম্পর্কেই ধারণা ছিল না ভেসালিয়াসের। সেসব আবিষ্কৃত হয়েছে কালক্রমে। এবং একটা সময় পরে এসে সভ্যতা ছাড়িয়ে যায় কোপার্নিকাসকে, ভেসালিয়াসকে। কিন্তু তবু তাঁদের গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে প্রয়োজনীয়তা কোনটাই ফুরিয়ে যায় না। উপন্যাসের ভেরহেইয়েন এবং ভ্যান হোরসেন চরিত্রগুলো গবেষণাগারে আসলে সভ্যতাকে অতি সূক্ষ্মভাবে অনুবীক্ষণের নিচে এনে পরীক্ষা করে। বলা যায়, ওলগা তাঁর উপন্যাসে তেমনিভাবে সভ্যতা ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মানবমনের নানা উন্মোচনকে পরীক্ষা করেন তাঁর জ্যাকব ফ্রাংক চরিত্রের কেন্দ্রিকতায়। জ্যাকব একা একটা প্রবহমান ইতিহাসের গতিকে প্রচ-ভাবে টলিয়ে দিয়ে নতুন বাঁকের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারতো না যদি না তার পরিপাশর্^স্থ জনসমষ্টির পুঞ্জীভূত অপিচ যৌথভাবে একক মনোজগতটা তাকে অবলম্বন না যোগাতো। ঠিক এখানটায় একটু দাঁড়িয়ে আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের শোশা উপন্যাসের দিকে তাকাই। সেখানে একটা জায়গায় দেখছি, হিটলার আসছে, সমগ্র পোল্যান্ড হিটলার-আগমনের ঘটনায় তটস্থ। হিটলার আসে মানে গেস্টাপোরা আসে, নাজিরা আসে। কিন্তু তখন পোল্যান্ডের রোমান ক্যাথলিক লোকেরা কী ভাবছে- ভাবছে (নায়ক এ্যারন গ্রাইডিংগারের সূত্রে আমরা তা জানি) হিটলার এসে আট/নয়শ’ বছর ধরে পোল্যান্ডে (তাদেরই সঙ্গে তাদেরই পাশাপাশি) থাকা ইহুদিদের বিনাশ করে দেবে। তাহলে আর তাদেরকে ইহুদি-হত্যার দায় নিতে হবে না কাঁধে। মানে হিটলার একটি জার্মান চরিত্র কিন্তু হিটলার আরও আগে থেকেই পোল্যান্ডের জনমানসের মধ্যেই স্থিত ছিল। হিটলার এভাবেই হয়ে যেতে পারে পোলিশ, কিংবা হয়ে যেতে পারে লিথুয়ানিয় বোগদান স্মিয়েলনিকি।

এক সাক্ষাৎকারে ওলগা বলেছেন, তাঁর লেখক হওয়ার পেছনে ফ্রয়েড-পাঠ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। অল্প বয়সে তাঁর প্রিয় ছিল টি এস এলিয়টের কবিতা। এমনকি বয়সে তাঁর চাইতেও চৌদ্দ বছরের ছোট ইজরায়েলি লেখক য়ুভাল নোয়া হারারি’র রচনার প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা তিনি জানান অকপটে। নোয়ার হোমো ডিউস-কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় চিহ্নিত করেন তিনি। নোয়া’র এ-গ্রন্থকে বলা হয় আগামির ইতিহাস। নোয়া ইতিহাস, দর্শন এবং বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে এক অন্য ধরনের ভাষ্য নির্মাণ করেন বর্তমানের। তাঁর সেই বিখ্যাত মন্তব্য, মানুষ একসময়ে ঈশ^রকে আবিষ্কার করেছিল আর পরে মানুষই হয়ে গেছে ঈশ^র। বস্তুত ফ্রয়েডের বিয়ন্ড দ্য প্লেজার প্রিন্সিপল্ পড়েই দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হ’ন ওলগা এবং তাঁর মনে এমন ধারণা প্রবল হয়, জীবনের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করবার অসংখ্য উপায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতাকে রূপায়ণ করবার কাজটা সমস্ত উপায়ের মূলে। এছাড়া পোলিশ লেখক ব্রুনো শুলজ্-এর সংবেদনশীল-নান্দনিক ছোটগল্পের প্রতিও তাঁর পক্ষপাত কম নয়। এলিয়টের দ্য লাভ সংস্ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক এবং চেশোয়াভ মিয়োজ ওলগা’র মনোজগতে বাস্তবকে ভিন্ন অবলোকনে দেখবার প্রেরণা যোগায়। লিয়োনারা ক্যারিংটনের দ্য হিয়ারিং ট্রাম্পেট-এ বিরানব্বই বছর বয়েসী কথকের খানিকটা প্রভাব ওলগা’র নিজের উপন্যাস ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস্ অব ডেড-এ লক্ষ করা যায়। এসবকিছুকে একত্রে মিলিয়ে নিয়ে দেখলে তাঁর প্রস্তুতিপর্বের হদিস মেলে। তাঁর নিজের পোলিশ ভাষার বিপুল পাঠ এবং বিশে^র গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলীর পাঠ এবং তাঁর নিজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদির সংলগ্নতাকে তিনি পরিচালিত করেন বৃহত্তর অন্বেষণের দিকে। প্রথম থেকেই নিজের পোলিশ জাতিসত্তাকে তিনি সচেতনভাবে দার্শনিক জিজ্ঞাসার অনুসারী করেন। ফলে, তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার পরিবর্তে মানব-পরিস্থিতির সংকটের ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক অনুসন্ধান বড় হয়ে ওঠে। আর সে-অনুসন্ধানই তাঁর লেখাকে নিছক কাহিনি-আবর্তনের অতিরেক এক ব্যঞ্জনার দিকে নিয়ে গেছে। তাঁর ষষ্ঠ উপন্যাস ফ্লাইটস্-এর পা-ুলিপি তিনি যখন তাঁর প্রকাশকের কাছে পাঠান তখন পড়ে প্রকাশক তাঁকে জানান, এটি হয়তো ওলগা’র কম্প্যুটার থেকে ভুল করে পাঠানো অন্য কোন রচনার অনুলিপি, উপন্যাসের নয়। প্রকাশকের স্পষ্ট ধারণা ছিল, এটি উপন্যাস নয়। কিন্তু সেটি উপন্যাসই ছিল এবং ওলগা তাঁর সেই রচনার মধ্যেই নিজের পোলিশ জাতিসত্তাকে পরীক্ষার নিরিখে নিক্ষেপ করেছিলেন। পোল্যান্ডের ঐতিহাসিক বাস্তবতার বহুমাত্রিক রূপটিকে কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে চান নি তিনি। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে পোল্যান্ডের রাজনীতি-সীমান্ত শত-শত বছরের প্রেক্ষাপটে ছিল নিয়ত পরিবর্তনশীল। একরৈখিক দৃষ্টিতে সেই ইতিহাসকে পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। বহুজাতিগত, বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক উপাদানের নিত্য সংমিশ্রণকে কেবলমাত্র পোলিশ জাতিগত চেতনার আয়না দিয়ে দেখাটা বিভ্রান্তিকর- ওলগা সেটাই ভেবেছেন। ধরা যাক পোলিশ জাতিগত চেতনার প্রসঙ্গ উঠলে তার সমান্তরালে ইউক্রেনিয়, লিথুয়ানিয়, জার্মান, রুথেনিয়, ইহুদি সকলের কথাই অনিবার্য। ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির এক প্রিজমই বলা যাবে এমন অভিজ্ঞতাকে। ওলগা তাই বলেন, স্থির-অপরিবর্তনীয় অভিজ্ঞতার পরিবর্তে আবর্তময় অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করাটাই বাঞ্ছনীয়। এভাবেই তিনি অতিক্রম করে যান জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গ-ি। তাই উপন্যাসটিকে তিনি অভিহিত করেন ‘কন্সটেলেশন’-নভেল বলে, অর্থাৎ যেখানে এক পরিব্যাপ্ত নক্ষত্রম-লীর বাস্তবতা বিরাজমান।

ওলগা তোকারচুকের ভাবনার ঠিক বিপরীত মেরুতে বহমান পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা। বহুকাল থেকেই দেশটিতে রোমান ক্যাথলিক মূল্যবোধের প্রভাব-প্রসারী কিন্তু ২০১৫-র পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে। রক্ষণশীল দলের শাসন এক ধরনের পোলিশ জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতাকে সামনে নিয়ে এলে পোল্যান্ডও সংরক্ষণশীল মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে অভিবাসীদের ঠেকানো, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার উদ্বাস্তুদের স্থান না দেওয়ার কঠিন নীতিতে পোল্যান্ড অটল থাকে। তাছাড়া দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে হিটলারের নাজি-বাহিনির সঙ্গে পোলিশ সহযোগিতা সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইন প্রনয়ণ করা হয়। ওলগা’র মনোজাগতিক সংবেদনশীলতার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যায়্। আজীবন নিরামিষাশী ওলগা কসাইখানায় প্রাণিহত্যার প্রতিক্রিয়ায় নিজের ন্রিদাহীনতার কথা বর্ণনা করেন অকপটে। ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি তাঁর পরিবেশবাদী ও প্রাণি-অধিকারপন্থী মানসিকতার দৃঢ় অভিব্যক্তি তুলে ধরেন। এর প্রতিক্রিয়ায় রক্ষণশীল রোমান ক্যাথলিকদের অসহিষ্ণুতার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। অন্যদিকে, উদারপন্থীদের ভালোবাসা তাঁকে করে আপ্লুত। তাঁর অনুরাগী পাঠক তাঁর জন্যে নিয়ে আনে এমন বই যে-বইয়ে ১৯৪১ সালে হিটলার অধিকৃত অবস্থায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ইহুদি জনগোষ্ঠির কাহিনি বর্ণিত। হয়তো ওলগা’র নিজের জীবনের মধ্যেই নিহিত তাঁর উদারচেতনার আদি সূত্র।
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের কালে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের হাতে নিহত হয় হয়েক হাজার পোলিশ নাগরিক। ওলগা’র পোলিশ দাদা বিয়ে করেন এক ইউক্রেনীয় নারীকে যে-নারী সেই ভয়ংকর দাঙ্গার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান। যুদ্ধের পরে গ্যালিসিয়া দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলে এক ভাগের মালিক হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্য ভাগের মালিক পোল্যান্ড। ওলগা’র দাদীর গ্রামটি চলে যায় ইউক্রেনীয় অধিকারে। ঠিক তখন ঐ গ্রামের লক্ষ-লক্ষ লোক অভিযোজন করে চলে যায় জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রী অঞ্চল সাইলিসিয়ার দিকে। পোলিশরা সেখানে আস্তানা গাড়ে এবং তাদের প্রতাপে সেখানকার জার্মানরা স্থানত্যাগ করে চলে যায় অন্যত্র। ওলগা’র নিজের পরিবারের শেকড়ের মধ্যেই রয়েছে এক জটিল বিবর্তনের উপাদান। কথা হচ্ছে, এমন বাস্তবতা ছিল অনেকেরই কিন্তু সবাই ওলগা’র মত নিরপেক্ষ-প্রসারিত দৃষ্টি দিয়ে সেটিকে প্রকাশ করে নি। ওলগা বলেছেনও সেকথা, সেখানকার পোলিশদের কথা বলতে গেলে আপনি কী করে ইউক্রেন আর ইউক্রেনীয়দেও কথা বাদ দেবেন। লক্ষ-লক্ষ লোকের পূর্বসূত্র ইউক্রেন। যেজন্যে, কে পোলিশ আর কে ইউক্রেনীয় সেটা তাঁর নিকটে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছোটবেলায় জার্মান গৃহপরিচারিকার দেখাশোনায় বেড়ে ওঠেন ওলগা। তাঁর বাবা-মা তাঁকে এমন একটা স্কুলে পাঠান যেখানে অধিকাংশ ছেলেমেয়ে কৃষকের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুল লাইব্রেরিয়ান। ওলগা অধিকাংশ সময় কাটাতেন বাবার সঙ্গে। যা হাতের কাছে পেতেন, পড়তেন তা-ই- কবিতা, এ্যাপুলিয়াসের কাহিনি, জুল ভার্ন এমনকি এনসাইক্লোপিডিয়া। ১৯৮০-র দিকে ওয়ারশ বিশ^বিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া শুরু করেন তিনি। তাঁর ক্যাম্পাস ছিল এমন একটা জায়গা যেটা দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় ছিল জার্মান ক্যাম্প। যে-ডরমিটরিতে তিনি থাকতেন তার লাগোয়া একটা ইহুদি বসতি যেটা যুদ্ধের পরিণামে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর সেই সময়টা ছিল খুবই নিরানন্দকর। দেশ তখন সোভিয়েত-কবলিত। দোকানপাটে জিনিসপত্র ছিল না। শুধু ভিনিগার আর সরিষা পাওয়া যেতো। লোকজন ভুগছিল প্রবল হতাশায়। কেউই তখন স্বপ্নেও ভাবতোনা, দেশ একদিন সোভিয়েতমুক্ত হবে।
১৯৮৫ সালে গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর তিনি বিয়ে করেন মনোবিজ্ঞানের তাঁরই এক সহপাঠীকে। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন ওলগা। তাঁর কাজের ক্ষেত্র হয়ে যায় মদ্য আর মাদকাসক্তদের নিরাময় এবং চিকিৎসা। একপর্যায়ে নিজের পেশা আর নিরানন্দপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তিনি দেশত্যাগ করে চলে যান লন্ডন। নানারকম কাজ করেন সেখানে- টিভি’র এ্যান্টেনার কারখানা থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেলে পরিচারিকার কাজ কিছুই বাদ রাখেন না। তবে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার যাপনের পাশাপাশি লেখাপড়ার অবারিত সুযোগটাও কাজে লাগাতে ভোলেন না- বইপড়া। পৃথিবীর প্রায় সব বইই পাওয়া যাচ্ছে হাত বাড়ালে। এসময়টাতে তিনি লন্ডনের পাবলিক লাইব্রেরিতে এবং শহরের বইয়ের দোকানগুলিতে সময় কাটান নেশাগ্রস্তের মত। নারীবাদী সাহিত্যের নানা ধরনের পঠনে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন ওলগা। তাঁর এসময়কার অভিজ্ঞতার চিত্রণ লক্ষ করা যাবে ওলগা’র প্রথম দিককার একটি ছোটগল্পে- দ্য হোটেল ক্যাপিট্যাল। আবার তিনি ফিরে আসেন স্বদেশে। একটি পুত্রসন্তানের মা হ’ন তিনি। লেখালেখির কাজটা শুরু করেন নিবেদিতভাবে। নিজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে ইতিবাচক সচেতনতা যোগানোর উৎস হিসেবে দেখেন তিনি। বিশেষ করে লিখতে গিয়ে তিনি অনুভব করলেন, একটা জিনিসকে যখন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে তখন সেটা একই সঙ্গে একাধিক মাত্রার অবয়বযুক্ত হতে পারে।

বাস্তব এমন একটা অবস্থান তার একটি একক অবস্থা থেকে চরম বলে গ্রহণ করা আর সম্ভব হয় না। তাঁর এমন ধারণার প্রভাব তাঁর একটি লেখায় পাওয়া যায় যেখানে একটি পরিবারের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে দুই সহোদরের ভাষ্য সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।
১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তাঁর তৃতীয় উপন্যাস প্রাইমিভ্যাল এ্যান্ড আদার টাইমস্বলতে গেলে ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারচুকের স্বরূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই উপন্যাসটিকে উপলব্ধি করবার আগে আমাদের মনে করতে হয় আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের শোশা এবং আইজাকের বড় ভাই ইজরায়েল জশুয়া সিঙ্গারের ব্রাদার্স আশখেনাজি উপন্যাসের কথা। তবে আইজাকের কেবল শোশা-ই নয় দ্য ফ্যামিলি মস্কাট, দ্য ম্যাজিশিয়ান অব লুবলিন এবং আরও অনেক গল্প আরও অনেক উপন্যাসের কথা বলতে হবে যেখানে পোলিশ ইহুদি জীবনের বিচিত্র-বর্ণিল জীবন চিত্রিত হয় এর নানা খুঁটিনাটিসহ। জশুয়া’র উপন্যাসে বর্ণিত হয় ইউরোপে এবং বিশে^ বিভিন্ন ধারার ইহুদি জনগোষ্ঠির বিকাশ-বিবর্তনের কাহিনি। ওলগা’র উপন্যাসটিতে পোিলশ বাস্তবতার সেই দিকটাই উন্মোচিত হলো যেদিকটা মূলত রোমান ক্যাথলিক লেখকদের জন্যে হয়তোবা এক ধরনের ট্যাবু-ই। বস্তুত এসব গল্পের অবতারণা তাঁর শৈশবেই। গল্পগুলো তাঁর হাতে লিখিত হওয়ার আগে একবার রচিত হয়- সেটা অবশ্য লিখিত আঙ্গিকে নয়। এরকম নানা গল্প শৈশবে তাঁর নানীর কাছ থেকে শোনেন তিনি। তাঁর নানীও নিশ্চয়ই সেসব গল্পের প্রাথমিক উৎস নন, হয়তো এক পরম্পরার মধ্যেই গল্পগুলোর অভিযাত্রা। সেই অভিজ্ঞতার ওলগায়িত রূপই হলো তাঁর উপন্যাস। বিশ শতকের কালপরিধিতে এক কাল্পনিক পোলিশ গ্রামের দু’টো পরিবারের কাহিনি উপন্যাস। এর অধিকাংশই পোলিশ এবং ইহুদিদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার বিন্যাসে গড়া। দেখা যাচ্ছে পোলিশ গ্রামবাসীরা যাচ্ছে ইহুদি চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসার জন্যে, কেনাকাটা করতে যাচ্ছে ইহুদিদের দোকানে। এক পোলিশ রমণি এবং এক ইহুদি পুরুষের ব্যর্থ প্রেমের উপাখ্যান এটি। কিন্তু এতে পোল্যান্ডে পোলিশ-ইহুদি মেশামেশি ও বহমানতার নানামাত্রিক প্রতিফলন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। পুরাণ, ইতিহাস, কিংবদন্তী প্রভৃতিকে ব্যবহার করে এবং একটা গণমনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে খাড়া করে ওলগা প্রচলিত জাতিগত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এর অনেকটাই যে আরোপিত ও পূর্বনির্দিষ্ট সেটাই আমরা অনুভব করি উপন্যাসের নিরিখে। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাস হাউজ অব ডে, হাউজ অব নাইট বলতে গেলে তাঁর আরেক ধাপ মোচড়। কেননা, এটির বিষয়বস্তু সবদিক থেকেই অভিনব। উপন্যাসটি রচনার পূর্বে ওলগা এবং তাঁর স্বামী দক্ষিণ সাইলিসিয়া অঞ্চলে একটা কাঠের ফ্রেমের ঘর বানান বসবাস করবার জন্যে। এলাকাটা চেক প্রজাতন্ত্রের সীমান্তবর্তীও বটে। অঞ্চলটির ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট হ’ন ওলগা। এখানে আমাদের মনে রাখা দরকার পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে এই চেকোশ্লোভাকিয়াতেই রিফর্মেশন-পর্বের ইতিহাস রূপান্তরের এক জটিল-বহুস্তর অধ্যায় অতিক্রম করেছিল। রিফর্মেশন যুগের দোমাৎস্লিস্-এর যুদ্ধ হয় এখানেই। চেক জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে রোমান ক্যাথলিকত্ব বিসর্জন দেবার যে-ধারণা প্রাধান্য পেয়েছিল এখানে তার নেতা জন হাস এক কিংবদন্তীর চরিত্র নিয়ে বিরাজমান। হাসপন্থীদের সঙ্গে গোঁড়া রোমান ক্যাথলিকপন্থীদের চলে দীর্ঘ যুদ্ধ। তাছাড়া আরেক বিখ্যাত শিক্ষাবিদ হিথক্লিফও এখানকার ইতিহাসের অমর উপাদান। স্থানীয় একটি চার্চে সেইন্ট উইলগেফোর্টিসের একটি মূর্তি দেখেই প্রথম তাঁর মনে উপন্যাসটির ধারণা এনে দেয়। প্যাস্কালিস নামের জনৈক সন্ন্যাসীর লেখা একটি পুস্তিকা চার্চের স্যুভেনিরের দোকান থেকে কিনে পড়তে গিয়ে ওলগা দেখলেন সেটি মধ্যযুগের এক সেইন্টের কাহিনি। কিংবদন্তী’র বিবরণ পুস্তিকাটিতে বিধৃত। তা থেকে জানা যায়, উইলগেফোর্টিস মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন নান বা মহিলা পাদ্রী হতে কিন্তু তাতে প্রবলভাবে বাধ সাধেন তাঁর পিতা। তাঁরই পিতা তাঁকে কনভেন্ট থেকে অপহরণ করেন এবং তাঁকে বাধ্য করেন বিবাহ করে সংসার নির্বাহ করবার জন্যে। তখন উইলগে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে থাকেন যিশুখ্রিস্টের কাছে, তিনি যেন তাঁর মধ্যে এমন কিছুর অবতারণা করেন যা তাঁর হবু স্বামীর মধ্যে তাঁর প্রতি প্রত্যাখ্যানের ভাব সৃষ্টি করবে। এবং অদ্ভুত হলেও দেখা যায়, তাঁর মধ্যে পুরুষসুলভ বৈশিষ্ট্যাদি প্রকট হয়ে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর থুতনিতে গজিয়ে উঠতে থাকে দাড়ি আর সে-দাড়ি দেখতে একেবারে স্বয়ং যিশু খ্রিস্টের দাড়ির মতন। এমন ভয়ংকর বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারেন না উইলগেফোর্টিসের পিতা। শেষে পিতার হাতে নিহত হয় কন্যা। উপন্যাসটি ধর্ম-সমাজ-মানব পরিস্থিতিনির্ভর এক নতুন ধরনের ব্যাখ্যার সামনে নিয়ে যায় পাঠককে। আত্মপরিচয়ের সঠিক মাত্রিকতা ও বিভ্রান্তি সম্পর্কে ধারণা কাহিনি ছাপিয়ে প্রধান হয়ে দেখা দেয় ওলগা’র সাহসী এ-উপন্যাসে।

বস্তুত বিষয়বস্তুর অনন্য স্বাতন্ত্র এবং বহুস্তর গভীরতার জন্যেই ওলগার উপন্যাসগুলো পাঠকের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাঁর ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস্ অব দ্য ডেড উপন্যাসের কথা বলা যায় যেটি কেবল অভিনবই নয় চিন্তা-উদ্রেককারী এক নতুন ধরনের দার্শনিক উপন্যাসও যেটিতে অপরাধের এক ভিন্ন মাত্রিকতার প্রকাশ ঘটে। এটির স্থানিকতা চেক-পোলিশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল। জানিনা ডুশেস্কো নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেতু-প্রকৌশলী উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি আবার ইংরেজির শিক্ষকও এবং একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীও। উপন্যাসে ইংরেজ কবি উইলিয়ম ব্লেকের প্রসঙ্গ ও পুনরাবর্তন লক্ষণীয়। এতে কবির বিখ্যাত পংক্তি “স্বর্গ ও নরকের মধ্যে বিবাহ” কথাটাকেও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতেই ব্লেকের উদ্ধৃতি। বস্তুত ব্লেকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কিংবদন্তীকে পোলিশ অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ওলগা অতীত-বর্তমানের বাস্তবতাকে ভিন্ন স্থানিকতা ও কালিকতার আঙ্গিকে পরখ করে দেখতে চেয়েছেন। উপন্যাসটিতে আছে অপরাধ, হত্যা, আবেগ, বেদনা, শোক এবং সবকিছু ছাপিয়ে এক অনিঃশেষ শোকগ্রস্ততার উদ্যাপন। ওলগা নিজেই বলেছেন শোকগ্রস্ততা তাঁর মনের সবচাইতে প্রবল আবেগের রূপ। সেদিক থেকে দেখলে তাঁকে এক অতি সংবেদনশীল মানুষ বলেই ধরে নিতে হবে। হয়তোবা তাঁর চিরনিরামিষাশী সত্তার ব্যাপারটি নিহিত রয়েছে তাঁর মনোজগতের এই অবস্থানের মধ্যেই। ওলগা একবার বলেছিলেন যে কখনও কখনও তাঁর নিজেকে মনে হয় যে আমরা আসলে বিপুলাকার এক সমাধির মধ্যে বসবাস করছি- একটাই সমাধি কিন্তু এর ভেতরে অসংখ্য মানুষ। এবং তাঁর দৃষ্টিতে বাইরের দৃশ্যমান কারাগারে নয়, মানুষ বন্দি তার নিজস্ব অন্তরের কারাগারে।
আজ থেকে সাতাশ বছর আগে ইংল্যান্ডে বসবাসরত অবস্থায় অনুবাদ করেছিলাম পোলিশ-মার্কিন লেখক আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের উপন্যাস। ১৯৯৬ সালে আমার কেম্ব্রিজ বাসকালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান আরেক পোলিশ ভিস্লাভা শিম্বর্সকা। তেইশ বছর পরে পুনরায় নোবেল পেলেন আরেক শক্তিমান লেখক- পোল্যান্ডেরই। হয়তো এসবই কাকতালীয় ঘটনা কিন্তু আমার ভাবতে ভাল লাগছে, ওলগা তোকারচুকের বয়সও আমারই মতন- সাতান্ন। অক্টোবর ২০১৯

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 298 People

সম্পর্কিত পোস্ট