চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

সাহিত্যে এবারের নোবেল পিটার হ্যান্ডকের

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

আহমেদ মনসুর

সাহিত্যে এবারের নোবেল পিটার হ্যান্ডকের

২০১৯ সালের নোবেলজয়ী লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও অনুবাদক পিটার হ্যান্ডকের জন্ম অস্ট্রিয়ার গ্রিফেনে, ৬ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে। পিটার হ্যান্ডকে ও তার মা ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত স্লোভেনীয় অধ্যুষিত বার্লিনের পানকৌতে বসবাস করতেন। ১৯৫৪ সালে পিটার ক্যারিনথিয়া অঙ্গরাজ্যের তানজেনবার্গ ক্যাসেলে অবস্থিত ক্যাথলিক মারিয়াম বয়েজ বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই স্কুলের পত্রিকাতে তাঁর প্রথম লেখা ‘ফ্যাকেল’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৯ সালে তিনি ক্লাজেনপুর্টে চলে যান, সেখানে গিয়ে তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬১ সালে ইউনিভার্সিটি অব গ্রেজ এ আইন বিষয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালের মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেন, যোগ দেন আভা গার্দ আন্দোলনে। শুরু হয় ছবির চিত্রনাট্য লেখা। ১৯৭৮ সালে তাঁর নির্দেশনায় তৈরি ছবি ‘দ্য লেফট হ্যান্ডেড ওম্যান’ সে বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হয়। যুগস্লাভিয়া যুদ্ধের সমালোচনা করে তাঁর লেখা সারা পৃথিবীতে সমালোচনার ঝড় তোলে। যুদ্ধের কারণ ও ফল বিষয়ে বারবার পশ্চিমী দুনিয়াকে বিঁধে এসেছেন পিটার।

পিটার হ্যান্ডকে পড়াশোনা চলা অবস্থায় নিজেকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তরুণ লেখকদের সংগঠন গ্রেজার গ্রুপের সভ্য হন। সংগঠনটি সাহিত্যবিষয়ক লেখাজোকা প্রকাশ করতো। এর সদস্য ছিলেন অ্যালফ্রিয়েড জেলিনেক ও বারবারা ফ্রিস্কমুথ। জার্মান প্রকাশনী সুহারক্যাম্প ভার্লেগ তাঁর লেখা উপন্যাস ‘ডাই হর্নিজেন’ প্রকাশের জন্য গ্রহণ করার পর তিনি ১৯৬৫ সালে লেখাপড়া ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে গ্রুপ-৪৭ এর একটি সভা আমেরিকার নিউজার্সিতে তিনি তাঁর লেখা নাটক ‘অফেন্ডিং দ্য অডিয়েন্স’ উপস্থাপন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে প্রকাশনী ভার্লেগ ডার অটোরেন এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত গ্রেজার অটোরেন ভার্সামলুঙ দলের সদস্য ছিলেন। হ্যান্ডকে চলচ্চিত্রের জন্য অসংখ্য স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডাই লিঙ্কশানডিঙ’ এর পরিচালক ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে হ্যান্ডকে ইউরোপীয় সাহিত্য পুরস্কার প্যাট্রারকা প্রিস এ জুরি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। গ্রেজ থেকে চলে আসার পর তিনি বার্লিন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার সালজবার্গে চলে যান। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি প্যারিসের কাছাকাছি চ্যাভিলে বাস করছেন।

হ্যান্ডকে ‘দ্য গোলি’স অ্যাংজাইটি অ্যাট দ্য পেনাল্টি কিক’ চলচ্চিত্রের পরিচালক উয়িম ওয়েল্ডার্স এর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন, ‘দ্য রং মুভ’ চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখক এবং ‘উইংস অব ডিজায়ার’ ও ‘বিউটিডেস অব অ্যারানজুয়েজ’ এর স্ক্রিনপ্লে লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তাঁর লেখা উপন্যাস নিয়ে তৈরি করা চলচ্চিত্রের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘দ্য লেপ্ট হ্যান্ডেড উইমেন’ ও ‘দ্য অ্যাবসেন্স।’

নব্বই এর দশকে যুগোস্লাভিয়া যখন ভয়ানক গৃহযুদ্ধে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তখন সার্বিয়ার প্রখর সমর্থক ছিলেন অস্ট্রিয়ার এই লেখক। এমনকি তিনি যুগস্লাভিয়ায় সার্বিয়দের অবস্থানকে নাৎসিদের হাতে ইহুদিদের অবস্থার সাথে তুলনাও করেছিলেন। পরে যদিও সে বক্তব্য প্রত্যাহার করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন মুখ ফসকে বেরিয়েছে। সার্বিও নেতা স্লোবোদান মিলোসোভিচের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে তাঁকে সমাহিত করার অনুষ্ঠানে হ্যান্ডকে তাঁর প্রশংসা করে বক্তৃতা করেছিলেন।
বসনিয়া যুদ্ধে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোভোদান মিলোসোভিচের নেতৃত্বে সার্বিয় বাহিনী ১৯৯৫ সালের ১১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনে বসনিয়া ও হার্জেগোভিয়ার ¯্রেেব্রনিৎসা শহরের আট হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও ছেলেশিশু হত্যা করে। নারীদের বন্দি শিবিরে রেখে উপর্যপুরি ধর্ষণ করা হয়।
পুরস্কারের জন্য পিটার হ্যান্ডকের নাম ঘোষণার পরপরই এনিয়ে শুরু হয় বিশ^ব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা। বিশ^ব্যাপী অনেকে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে।

সাবেক যুগস্লাভিয়া পতনের সময়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে সার্বীয়দের সমর্থনের কথা বলতেন অতি দক্ষিণপন্থী সাহিত্যিক পিটার হ্যান্ডকে। এনিয়ে অ্যালবেনিয়া, বসনিয়া, কসেভোতে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অ্যালবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা টুইট করেছেন, “কোনও নোবেল পুরস্কারের কথা শুনে বমি পাবে, ভাবিনি!” বসনিয়ার মুসলিম নেতা সেফিক জাফেরোভিচ বলেন, “এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। অসংখ্য যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের সমর্থনে মুখ খুলেছেন হ্যান্ডকে, এ তথ্য কি করে ভুলে গেল নোবেল কমিটি।” কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিও বলেন, “যুদ্ধে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষকে সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিল হ্যান্ডকের এই শিরোপা।”
¯্রেেব্রনিৎসায় আট হাজারের বেশি মুসলিম হত্যার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন এমির সুলইয়াগিচ। তিনি বলেন, “একজন মিলোসোভিচ-ভক্ত এবং গণহত্যা অস্বীকারকারী কুখ্যাত ব্যক্তি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, বেঁচে থেকে এও দেখতে হলো।”

বিশ^জুড়ে লেখকদের সংগঠন পেন আমেরিকার সভাপতি জেনিফার ইগান টুইটারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, “এমন একজন লেখক যিনি তাঁর কণ্ঠকে ঐতিহাসিক সত্যকে মুছে ফেলতে ব্যবহার করেছেন, তাঁকে নির্বাচিত করা খুবই বিস্ময়কর।”
¯্রেেব্রনিৎসা শহরে সার্বিয় বাহিনী আট হাজার মুসলিম পুরুষ ও ছেলেশিশু হত্যা করে। ধর্ষণ করে নারীদের। ব্রিটিশ লেখক হারি কানজ্রু সমালোচনা করে বলেছেন, “যেকোন সময়ের চেয়ে আমাদের এখন এমন বুদ্ধিজীবী প্রয়োজন, যাঁরা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অবহেলা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের মুখে মানবাধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবেন। হ্যান্ডকে তেমন ব্যক্তি নন।”
পিটার হ্যান্ডকেকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের পক্ষে কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ভাষাগত সৌকর্যের সাথে প্রভাবশালী কাজকে উদ্ধৃত করে যা মানবিক অভিজ্ঞতার পরিধি ও সুনির্দিষ্টতা উন্মোচনের ক্ষেত্রে পিটার হ্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সাহিত্যিক আহমদ ছফা রচিত ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থের সাহায্যে আমরা জানতে পারি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্মন্ধে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বড় সাহিত্যিক হলেও ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতন বড় মানুষ নন। প্রসঙ্গটার অবতারনা আমরা এখানে এজন্য করেছি, একজন সাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি লিখতে গিয়ে যেমন সমৃদ্ধ এবং উৎকৃষ্টমানের রচনা লিখবেন, ঠিক তেমনি হবেন একজন সংবেদনশীল ও মানবিক চিত্তের উদার মানুষ। যাঁর চিন্তা, চেতনা, কর্ম ও সাহিত্য সৃষ্টির সবখানে থাকবে মানুষের অগ্রাধিকার। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের পর্যবেক্ষণ ছিল- ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি যে পরিমাণ মানব কল্যাণমুখী কর্মকা- সম্পাদন করেছেন এবং মানব কল্যাণে সমাজ সংস্কারমূলক কার্যাদি সম্পাদন করেছেন তা অনন্য। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের হৃদয়ের সুক্ষ¥ অনুভূতিগুলোর অনুসন্ধানে এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন সমাজ উন্নয়নে খুব বেশি সময় ব্যয় করা সম্ভবপর ছিলো না। তবু রবীন্দ্রনাথ সীমাহীন এক মানবিক হৃদয়সম্পন্ন মানুষ।

পিটার হ্যান্ডকে সে অর্থে না রবীন্দ্রনাথের মতো এত বড় মাপের সাহিত্যিক, না ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগেরের মতো বড় মাপের কোন মানুষ। তিনি বরং অনেকটা কবি আল মাহমুদের মতন। কবি আল মাহমুদ সাহিত্য স্রষ্টা হিসেবে অন্য মর্যাদার আসন অর্জন করলেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যাদের ভূমিকা ছিল ত্রিশ লক্ষ নিরীহ বাঙালি হত্যার পক্ষে, শিশু হত্যা, অগ্নি সংযোগ, লুটতরাজ ও দুই লক্ষ নারী ধর্ষণের পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল সে জঘন্য মানুষ ও সংগঠনটির পক্ষে।
সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে জনমনে প্রভাব তৈরি করে সেটা যদি মানবতা বিরোধী কর্মকা-ে ব্যবহৃত হয় তার চেয়ে জঘন্য আর কী হতে পারে। পিটার হ্যান্ডকে বড় লেখক, তার লেখা মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। আনন্দ দেয়। কিন্তু মানব কল্যাণে তার অবদান শূন্য। তাঁর নৈতিক অবস্থানটা কোন অবদান তো রাখেই না, বরং মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশ^মানবতার চরম ক্ষতিসাধন করে। এর চেয়ে ঘৃণিত আর কী হতে পারে।

নোবেল কমিটি এমতিইে যৌন হয়রানি ও অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত কেলেঙ্কারীতে অভিযুক্ত। গেল বছরের পুরস্কারটাও তাই ঘোষণা করতে হলো এবছর। এছাড়াও সাহিত্যের বাইরের লোকদের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে হয়েছে সমালোচিত। অযোগ্য লোকদের পুরস্কার দিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়াই যেন সুইডিশ অ্যাকাডেমির সাংবাৎসরির কাজে পরিণত হয়েছে।
এবছর একই সাথে ২০১৮ সালের পুরস্কারও ঘোষণা করে সুইডিস অ্যাকাডেমি। পোলান্ডের সাহিত্যিক ওলাগা তোকারসুক ওই বছরের পুরস্কার প্রাপক। ৫৭ বছর বয়েসি লেখক তোকারসুক সাহিত্যেও জগতে পা রাখেন কবিতার হাত ধরে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সিটিজ অফ মিররস।’ ১৯৯৩ সালে তোকারসুকের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জার্নি অব দ্য বুক পিপল’ প্রকাশিত হয়। সতেরো শতকের প্রেক্ষাপটে লেখা এ উপন্যাসের আখ্যান এক প্রেমিক দম্পতির একটি হারিয়ে যাওয়া বই অন্বেষণ নিয়ে গড়ে ওঠে। ওলগা তোকারসুক এমন একজন আখ্যানকার যিনি কল্পনা দিয়েই দেশকালের সীমা ভেঙে দেন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 284 People

সম্পর্কিত পোস্ট