চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

বদ্রুন্নেসা সাজু

বাস্তবতার বিস্ময়

সাহিত্যিক রমা চৌধুরী

‘একদিন তো হারিয়ে যাবো
রাখবে না কেউ ধরে
থাকবে আমার লেখাজোখা
সবার ঘরে ঘরে।’
একাত্তরের জননী বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃত সাহিত্যিক রমা চৌধুরী (১৯৪১-২০১৮) চলে গেছেন। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর রচনার সাহিত্য সম্ভার। তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামের বোয়ালখালী পোপাদিয়া গ্রামে। তিন বছর বয়সে বাবা রোহিনী চৌধুরীকে হারিয়ে মা মোতিময়ী চৌধুরীর অক্লান্ত শ্রমে রমা বেড়ে ওঠেন। মায়ের মতো তিনিও একজন সফল জীবন সংগ্রামী হয়ে উঠেছিলেন। এইচ.এস.সি এর শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় রমা চৌধুরী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে পড়ালেখায় নিয়োজিত থেকে ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর বিভিন্ন স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য তাঁর প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ হলেও সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তিনি লিখেছেন। গল্প-উপন্যাসের কিছু আত্ম-জৈবনিক প্রসংগে তিনি চরম সত্য সরল সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেছেন। হাজারো প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও অবিরাম লেখালেখির চর্চায় রমা চৌধুরী সফল হয়েছেন। এগুলো তার স্মৃতিময় জীবনের বাতিঘর হয়ে ওঠেছে। এ আলোতেই (থেমে না থেকে) তাঁর মহিমান্বিত পথচলা।
১৯৭১-এ রমা চৌধুরীর জীবনে নেমে এসেছিল কঠিন দুঃসময়। তাঁর রচিত ‘আগুন রাঙা, আগুন ঝরা অশ্রুভেজা একটি দিন’-এ তিনি তুলে ধরেন সুরেলা ও অন্যান্য বাঙালি মেয়ে ও বধূদের ধর্ষণ কাহিনী। এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুর অত্যাচারের কাহিনী। এতে সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারের বহু মূল্যবান প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের সাথে পুড়ে যাওয়া বাংলা সাহিত্য সম্ভাবের দুর্লভ কিছু গ্রন্থ, লেখিকার সৃষ্ট সাহিত্য কর্ম ও অপ্রকাশিত রচনার পা-ুলিপি। এর সাত মাসের মধ্যে ৫ বছর বয়সী এক শিশুপুত্র সাগরের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তী এক মাস আটাশ দিনে ৩ বছরের অন্য শিশুপুত্র টগরের মৃত্যু ঘটে। এসব করুণ কাহিনীর শোকগাথা রমা চৌধুরীর লেখাকে পূর্ণতা দান করে পাঠকের হৃদয় আকুল করে তুলেছে।
এরপর আরেক করুণ কাহিনী! তাঁর ৪র্থ পুত্র একুশ বছর বয়েস বিজয় দিবসে দুর্ঘটনায় চিরবিদায় নেয় ১৯৯৮ সালে। জীবনদ্দশায় সেই ছেলে ছবি আঁকতো, ছড়া ও কবিতা লিখতো। মায়ের বন্ধুর মতো পাশে থেকে ঘরের কাজ করতো, রান্না করতো। কাজের ফাঁকে গানও করতো। সেই ছেলে দীপংকর টুনু কোনদিন মায়ের দোষ দেখতো না। মাকে সব সময় খুশী করার চেষ্টায় থাকতো, সুখ দেবার চেষ্টা করতো সে। আবার গাছে উঠে বন্ধুদের জন্যও সে ফল পাড়তো থোকা থোকা কালোজাম নিচে ফেলতো। এমন বুকের ধন মানিক রতন হারিয়ে রমা চৌধুরী আগের চেয়েও বেশী শূন্য রিক্ত রোগক্লিষ্ট হয়ে পড়েন। কারণ সন্তান হারা মায়ের মতো এ পৃথিবীতে দুঃখী আর কেউ নেই। সেজন্য শান্তি হারিয়ে এমন মাতা বলতে থাকেনÑ ধরণী দু’ভাগ হও, আমি তোমার মধ্যে ঢুকে পড়ে জীবনের জ্বালা থেকে ম্ক্তু হই। কারণ, সন্তানের শূন্যতায় চোখের জলে ভাসতে ভাসতে মায়ের যুগ পার হয়ে যায়। যুগের পর যুগ কেঁদে কেঁদে অন্ধকার ঘরে আর কতো থাকা যায়? তবু মা একলা ঘরে বসে পথের দিকে চেয়ে থাকে, সন্তানেরা ফিরে আসার আশায় থাকে। মাতা চায়না কোন পুরস্কার, টাকা-পয়সা, সোনা-দানা, চায় শুধু সন্তাদের ফিরে পেতে। এভাবে সন্তান হারালো বিদীর্ণ হৃদয়ের ভাষা রমা চৌধুরীর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। পশু-পাখি ভালোবেসে বিড়াল পুষে তিনি মাতৃহৃদয়কে শান্ত করতে চেয়েছেন। এবং একই সাথে কলমকে সাথী করে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন।
সন্তান নিয়ে তিনি যেমন লিখেছেন তেমন লিখেন বিড়াল নিয়ে। এমন বিড়ালপ্রেমী মানুষ লিখেছেনআমি জীবনে দেখিনি। জীবদ্দশায় তিনি আমার কাছে বাস্তবতার বিস্ময় একজন মহৎ লেখক ও সাহিত্যিক হিসেবে পছন্দনীয় ছিলেন। হয়তো নিজের হারানো সন্তানদের উপস্থিতি ফিরে আসা রমা চৌধুরী পোষা বিড়ালের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন বা দেখেছিলেন তার বিড়ালছানা বসে থাকে দরজায়, বেড়ায় সুখে বারান্দায়। প্রাতঃভ্রমণ, সন্ধ্যা ভ্রমণ সারে ছাদে। বেড়ানোর সময় হলে ওরা ছটফট করে কাঁদে। এদের মুত্যুতে রমা চৌধুরী ব্যথিত হন। এমন চারটি হারিয়ে যাওয়া আদরের বিড়াল মণি, সুমু, তুতুলু শুভ ও বিন্দুকে। তাঁর গ্রন্থ ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’ উৎসর্গ করেছেন। আবার বইয়ের প্রচ্ছদের ভিতরের দিকে শুভু সোমা তুতুল নামে রঙিন ছবিতে ৩টি বিড়ালকে দেখানো হয়েছে। লেখালেখি এবং বিড়াল সাথীর মাধ্যমে তিনি একাকী জীবনের শূন্যতা দূর করেছেন। তাছাড়া তার বইয়ের প্রকাশক এবং প্রথমআলো বন্ধুসভার আলাউদ্দিন খোকন তার প্রাত্যহিক জীবনের অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছেন; রোগে সেবাযতœ করেছেন। রান্না করে খাইয়েছেন, চিকিৎসা করিয়েছেন। সুস্থ অবস্থায় আলাউদ্দিন খোকনসহ তিনি বই ফেরি করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেতেন। তাঁর ছড়া কবিতার পদ্যে এসবের স্বীকারোক্তি আছে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত খ্যাতিনামা ছড়াকার, সাহিত্যিক সাংবাদিক রাশেদ রউফের ছড়ার কথা আছে রমা চৌধুরীর লেখায়। রাশেদ রউফ ছড়ার মধ্যে আলো জ্বালেন। তাঁর ছড়ার দখলে সহজ সরল ভাষার ভাব লহরে রমা চৌধুরী মুগ্ধ হন। অবসরের সঞ্জিতসহ আরও অনেকের কথা আছে তাঁর লেখায়। রমা চৌধুরী ছড়া ও কবিতার পদ্যে ‘ছড়ার গুণগান গেয়েছে এভাবেÑ
‘সারা জগৎ ছড়িয়ে আছে
ছড়ার মশালা
ছড়াকার যে বৃষ্টি ঝরায়
দু’এক পশলা।
সবাই যদি ঢালে ছড়া
ডাকবে ছড়ার বান
ছড়ার পলি ফলাবে জানি
ভাষায় সোনার ধান।’
পদ্যের বেলায় তিনি বলেন, ‘পদ্য থাকুক অমল ধবল, আশীষ ঝুরুক পদ্যে। রবীন্দ্রনাথ নজরুল জীবনান্দ এবং নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে রমা চৌধুরীর সুন্দর পদ্য কবিতা রয়েছে। দৈনিক আজাদী পত্রিকা নিয়েও তিনি লিখেছেন। উক্ত পত্রিকার অফিসের কাছাকাছি লুসাই ভবনেই প্রতিবেশীর মতো তিনি থাকতেন। লেখার মাধ্যমে তিনি সকলের ভালোবাসা চেয়েছেন যা পেয়েছেন তাতে তুষ্ট হয়েছেন, ভালো দিক নিয়ে থেকেছেন, মঙ্গলময় লেখার মাধ্যমে জীবন-যাপন করেছেন। গ্রামকে ভালোবাসা, পল্লীছবি, যাবো আবার গাঁয়ে, অমর একুশ, ফাগুনে, বাংলাদেশ, বাংলা মা, সোনার বাংলা, ষড়ঋতুর দেশ, জাত বাঙালি খেটেই খাও, বাঁচার চেষ্টা করো ইত্যাদি ছড়া কবিতায় প্রকাশ পেয়েছ রমা চৌধুরীর মানবতার জয়গাথা, দেশপ্রেম ও গ্রামের প্রতি ভালোবাসা। নিজ উপজেলা বোয়ালখালী এবং গ্রাম পোপাদিয়ার নামেও তিনি লিখেছেন। সমগ্র জীবনের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে তার লেখায় প্রকাশ পেয়েছে কিছু উপকারী তথ্য উপদেশ পরামর্শ। এসবের মাধ্যমে যাতে মানুষের কল্যাণ হয়। বাঁচার মতো বাঁচতে হলে কাজকে অবহেলা না করে শ্রমের মাধ্যমে তিনি মানুষকে সহজ সরল সুন্দর জীবন-যাপন করার প্রেরণা দিয়েছেন। আরো বলেছেন লিখতে বই নিয়ে বাঁচতে এবং আশায় থাকতে।
রমা চৌধুরী লিখেছেন গরীব আমি নই, চাইনে টাকা চাইনে, কর্ণফুলির কথা, দৃষ্টি রোধের অট্টালিকা, বই পড়া, বইমেলা, ভাবজগতের কবি, ইস্টার সান ডে, পূজা প্রসাদ ভোগ, লোকনাথ বাবাজী ও ঠাকুর দাদা ঠাকুর মা’র ঘর বাড়ি সম্পর্কে। এমন কী পশুপাখি গাছপালা মাটি মাকড়শা তেলাপোকা টিকাটিকি কাক পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তিনি জানতেন এসবের প্রতি মানুষের বিবেক সমীহবোধ এবং সুষ্ঠু আচরণবিধি দ্বারা পরিেেবশর ভারসাম্য রক্ষা হয় সেসব প্রকৃতির সুন্দর সম্পদ জীববৈচিত্র নিয়েও তার লেখা হয়েছে কিছু আঞ্চলিক ছড়া কবিতার ও চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে তাঁর ১০০১ দিন-যাপনের পদ্যে। রমা চৌধুরীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছেÑচট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন দর্শন, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়, ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রতিভার সন্ধানে লাখ টাকা (উপন্যাস), হীরকাঙ্গরীয় (উপন্যাস) একাত্তরের জননী (উপন্যাস) সহ আরো কিছু বই। এমন জাত লেখক এবং ভাব-জগতের কবির জীবদ্দশায় (জুতা সেন্ডেল কিছুই ছাড়া) খালি পায়ে থাকা বা চলাফেরা করার বিস্ময়কর পদচারণা সবই দেখেছে। একাত্তরের শহীদেরা যে মাটিতে, রমা চৌধুরীর ছেলেরা যে মাটিতে সমাহিত হয়েছে সে মাটির বুকে তিনি খালি পায়ে দিন যাপন করেছেন। গতায়ুূ হওয়ার পর তিনিও সন্তানের পাশে ওই মাটিতে শায়িত হয়েছেন। রমা চৌধুরী বিদায়ের শেষ-শয্যায় পেয়েছেন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা ফুলেল অর্ঘ্য এবং গার্ড অব অনারসহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 818 People

সম্পর্কিত পোস্ট