চট্টগ্রাম রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

১ ডিসেম্বর, ২০২০ | ১:১৯ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

যৌবনই ইবাদতের মোক্ষম সময়

যৌবন জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যৌবনকে মূল্যায়ন করার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বিভিন্নভাবে। সময় ফুরিয়ে আসার আগে যৌবনের কদর করার জোর তাগিদ দেন তিনি।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তিকে নসিহত করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি বিষয়ের মূল্যায়ন করো। এক. বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার আগে যৌবনকে। দুই. অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে। তিন. দারিদ্র্য গ্রাস করার আগে স্বনির্ভরতাকে। চার. কর্মব্যস্ততার আগে অবসরকে। পাঁচ. মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৩১৯)

বিজ্ঞাপন

উপর্যুক্ত হাদিসের যে পাঁচ বিষয়কে মূল্য দেয়ার কথা বলা হয়েছে, সব কটি একজন যুবকের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়। হেলায়-খেলায়, মৌজ-মাস্তিতে জীবনের সোনালি সময় নষ্ট করা সত্যিকারের মুসলমানের কাজ নয়। বরং যুবসমাজের উচিত, ইসলামের নির্দেশনা মেনে, সুন্নাহর আলোয় যৌবনকে রাঙিয়ে তোলা এবং আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

অন্তরের পরিশুদ্ধি

যৌবনের উত্তাল সময়েই গুনাহ ও স্খলনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই যুবকদের প্রয়োজন আত্মার পরিচর্যা ও পরিশুদ্ধি। চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে অবাধ্য মন যেকোনো সময় বিপথগামী হয়ে ওঠে। তাই নিজেকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে উন্নত হৃদয় ও মন-মানসের অধিকারী হতে হবে। অন্তর পরিশুদ্ধ করার সুফল এবং কলুষিত করার কুফল বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘যে তার আত্মা পরিশুদ্ধ করেছে সে-ই সফল এবং যে তার আত্মা কলুষিত করেছে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আশ-শামস, আয়াত : ৮-৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এক দীর্ঘ হাদিসের শেষাংশে আত্মার শুদ্ধতার গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘সাবধান! মানবদেহে একখণ্ড গোশতের টুকরো আছে, যখন তা সুস্থ হয়ে যায় পুরো শরীরটাই সুস্থ হয়ে যায় এবং যখন তা অসুস্থ হয়ে যায় পুরো শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো, এটাই কলব বা অন্তর।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪১৭৮)

গুনাহমুক্ত জীবন

গুনাহমুক্ত জীবন গড়তে যৌবন হেফাজত করতে হবে। হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। নজরের হেফাজত যৌবনে খুবই জরুরি। আল্লাহতায়ালা নজর ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।… আর ইমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। (সুরা নুর, আয়াত : ৩০-৩১)

এ ছাড়া যৌবনে নানা অন্যায়-অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই নিজেকে সব ধরনের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জুয়া, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দুর্নীতি সবই ইসলামে নিষিদ্ধ। যৌবনকে পবিত্র রাখতে গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার বিকল্প নেই।

বিয়ে

গুনাহমুক্ত জীবনের পথে বড় প্রতিবন্ধক যৌবনের তাড়না। কারণ নারী-পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ স্বভাবজাত। এ কথারই সত্যায়ন করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদের জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ৮) তবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে নিষিদ্ধ। জৈবিক চাহিদা পূরণে আল্লাহ বিয়ের অনুপম ব্যবস্থা রেখেছেন। পৃথিবীতে মানুষের পরম্পরা রক্ষার এটিই একমাত্র নৈতিক হাতিয়ার। তাই সামর্থ্যবান যুবকদের বিয়ে করা উচিত। বিয়ের প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দোহাই দিয়ে বিলম্ব করা ইসলাম অনুমোদন করে না। অবশ্য একান্ত সামর্থ্য না থাকলে রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন রাসুল (সা.)।

যুবকদের উদ্দেশে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সাওম পালন করে। কেননা, সাওম তার যৌনতাকে দমন করবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০৬৫)

ইবাদতে মগ্নতা

যৌবনই ইবাদতের সেরা সময়। সামর্থ্যবান মানুষই পারে পূর্ণ মনোযোগসহকারে ইবাদত করতে। বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া এবং রাত জেগে দীর্ঘসময় আল্লাহর ইবাদত করা যৌবনকালেই সম্ভব। যৌবনে ইবাদতকারীদের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন রাসুল (সা.) । তিনি বলেন, ‘সাত প্রকারের মানুষকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না। এক. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। দুই. আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন যুবক।…’ (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৬)

নেতৃত্ব গ্রহণ

যুবকদেরই সমাজের নেতৃত্ব হাতে নিতে হবে। মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করতে হবে। এ লক্ষ্যেই আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। যৌবনের পরিণত বয়সেই সব নবী-রাসুলকে আল্লাহতায়ালা নবুয়তের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। প্রিয়নবী (সা.)-কে পাঠানোর উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদেরই একজনকে তোমাদের রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের কাছে আমার বাণী পাঠ করবেন এবং তোমাদের পরিশুদ্ধ করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তার তত্ত্বজ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫১) তাই সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণে যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। জাতিকে শিক্ষাদীক্ষায় সমৃদ্ধ করে সামষ্টিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হবে।

অন্যায়ের প্রতিবাদ

অন্যায়ের প্রতিবাদে যুবসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুবসম্প্রদায়কেই নেতৃত্ব ও দায়িত্ব অর্পণ করেন। ইয়াজিদের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে নবীদৌহিত্র যুবক হোসাইন (রা.) জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যুবক বয়সেই নমরুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। মূর্তিপূজাসহ সব অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তারই কথা উল্লেখ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের কেউ কেউ বলল, আমরা শুনেছি এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে। তাকে বলা হয় ইবরাহিম।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৬০)

হালাল উপার্জন

স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মায়ের দেখভাল করা এবং আর্থিক ভরণপোষণ প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কর্তব্য। তাই তাকে উপার্জন করতে হয়। তবে এই উপার্জন হালাল হওয়া অপরিহার্য। হারাম উপার্জন আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সুদ, ঘুষ ও গুনাহের কাজ করে উপার্জন ইসলামে বৈধ নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যেসব হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো। শয়তানের দেখানো পথ অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৬৮)

হারাম পথে উপার্জিত খাবারের ভয়াবহতা বর্ণনা করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বায়হাকি, হাদিস : ৫৫২০)

পরকাল ভাবনা

যৌবনের রঙিন দিনগুলোতে আমরা পরকালের কথা ভুলে যাই। ভুলে যাই মহান প্রতিপালকের কথা; তার দরবারে জবাবদিহির কথা। মৃত্যুর পর আমাদের সব কাজের জবাব দিতে হবে। তাই যৌবনকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে অধিক পরিমাণে পরকাল ভাবনা জরুরি। পরকালের ভয় যৌবনকে অপরাধমুক্ত করে।

কেয়ামতের দিন আমাদের যৌবন সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। নবী (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচ বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগে কোনো মানুষের দুই পা আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে সরতে পারবে না। এক. তার জীবনকাল সম্পর্কে কীভাবে অতিবাহিত করেছে। দুই. তার যৌবনকাল সম্পর্কে কী কাজে তা বিনাশ করেছে। তিন. তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে। চার. এবং তা কী কী খাতে খরচ করেছে। পাঁচ. সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মোতাবেক কী কী আমল করেছে তা সম্পর্কে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 284 People

সম্পর্কিত পোস্ট