চট্টগ্রাম শনিবার, ৩০ মে, ২০২০

রহস্যের অন্তঃশীলা “ময়ূরফুলের সন্ধ্যা”

১৩ মার্চ, ২০২০ | ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

শোয়েব নাঈম

অভিমত

রহস্যের অন্তঃশীলা “ময়ূরফুলের সন্ধ্যা”

“কবিতা লিখি, কেন লিখি তাও জানি না। শুধু এটুকু জানি আমার সব বলা না বলা এই কবিতার ভেতরেই। ভালোবাসলে, কষ্ট পেলে, সমস্ত অন্তর্দাহ আমি কবিতার কাছে ঢেলে দিই। কিচ্ছুটি আশা করি না। কবিতা বিক্রি করে যেহেতু খেতে পারব না কোনদিন, তাই গোষ্ঠীবদ্ধতার বাইরে গিয়ে নীরব থাকি। তবুও কেউ এভাবে আনন্দ দেন। না-চাইতে এই পাওয়াগুলো আমি দু’হাত ভরে নিই।” রিমঝিম আহমেদ কবিতা নিয়ে তার অনুভূতি এভাবেই প্রকাশ করেন।
ধরা যাক ‘ময়ূর’ ময়ূরাকৃতি অনুরূপ দেহভঙ্গিযুক্ত একটি অনুভূতিবিশেষ।
ধরা যাক ‘ময়ূরফুলের’ রঙিন পেখমের আকর্ষণীয় রঙ বিন্যাসে সৌন্দর্য আভিজাত্যে এক আলাদা সময়ের ক্যানভাস।
ধরা যাক ‘সন্ধ্যা’ আজ এবং আগামীকাল মধ্যবর্তীর সন্ধিক্ষণই হচ্ছে সায়াহ্ন সন্ধ্যাবেলা।
কবি রিমঝিম আহমেদের কাছে পরমাপ্রকৃতির মতো চেতনাময়ী কালাতিক্রম আগামীকালের ভবিষ্যদ্দ্যোতক বীজ হচ্ছে ‘ময়ূরফুলে’র সন্ধ্যা গ্রন্থের কবিতাসমূহ। গ্রন্থের টুকরো টুকরো জীবনের আলাপগুলি বর্তমানের ভিতর থেকে আগামীকালকে বহন করে এনে কবিতার ক্যানভাসকে বহুবিস্তৃত করেছেন। আধুনিক কবিতার ধারা অতিক্রম করে প্রসারিত চেতনায় কবিতার ফর্ম এবং কনটেন্টের সংজ্ঞা নির্ধারণ ও প্রতিকল্প নিরূপণ, টানা গদ্যের বিন্যাসে কাব্য-এলাকা থেকে ছন্দ-লয়-বাকভঙ্গিমা-ধ্বনি এসবকে বাহিরে নিয়ে কাব্যরচিয়তা অধুনান্তিক পরিসর সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বর্তমানকালের সঙ্গে ভিন্নধারার নতুন বোধকে শনাক্ত ও আত্মজ করে কবিতার স্পন্দন, উদ্দীপনা, ব্যঞ্জনায় গ্রন্থটিকে ঋদ্ধ করেছেন। জীবন ও যাপিত পরিসরের ছোট ছোট সংঘাতগুলি কবিতার ভিতরে প্রবেশ করিয়ে বহুরঙে অফুরন্ত অর্থ সৃষ্টি করেছেন এবং কেন্দ্রীয় বিষয়কে অনুপস্থিত রেখে কবিতায় ব্যক্তিগত বার্তা বহন করে টেক্সটকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিটি কবিতার শিরোনামে অবয়বহীন অবয়বের মিশেল দিয়েছেন। প্রচ্ছন্নভাবে সময়কে ইঙ্গিত করে দিনলিপির মতো সময় চিত্রলিপিতেÑ “যে নদী বাঁকখালি” পর্বে ১৭টি; “অসুখের অলস পতাকা” পর্বে ১৩টি; “অনঙ্গের ঝরাপাতা পর্বে ১৭টিÑ এভাবে ৩টি সময়ের সন্ধিতে দিনলিপি লিখেছেন অর্থাৎ ৪৭টি গ্রন্থে বড় স্পেস ধরে দীর্ঘ উপমায় কবিতা রচনা করেছেন। একটা আপোষহীন বিদ্রোহী ধারা আর অনুভূতির ব্যাকুলতা ভরা একটি কবিতা থেকে আরেকটি কবিতার ব্যবধান শুধু ‘একজন্ম, দুইজন্ম, তিনজন্ম’ সময়সারণির। চিত্রকল্পগুলি যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন সেগুলি কেবল বাহির জগতের কতিপয় দৃশ্য নয়, কবির চেতনায় যা কিছু ঘটেছে তারই প্রতিচ্ছবি, চিত্রকল্পগুলি কবিতার লাইনে বিম্বিত করে দীর্ঘ প্রসারিত করেছেন। স্তবকে ব্যবহৃত শব্দগুলি এত তীক্ষè এত প্রখর, এক শব্দের সাথে আরেক শব্দের ঘষা লেগে সহজাতভাবেই চিত্রকল্প তৈরি হয়।
বড় স্পেস ধরে দীর্ঘ উপমার কবিতা, যেমন: “ […] আমার ঘুমগুলো পুরে দেয় দ্রুতগামী ট্রেনের কামরায়…” (শেষরাত: পৃষ্ঠা ২১)।
টানা গদ্যের বিন্যাসে চিত্রকল্পগুলি যেভাবে দীর্ঘ প্রসারিত করেছেন করেছেন, যেমন:
“ […] তারপর থেকে চলন্ত থেকে চলন্ত জানলায় মায়ের ছায়াগুলো এসে শুয়ে থাকে। আর আমি রাতভর পাহারা দিই…” (শেষরাত: পৃষ্ঠা ২১)।
প্রসারিত চেতনায় কবিতার ক্যানভাসকে বহুবিস্তৃত করেছেন, যেমন:
“ […] আমার মা মরে গিয়েছিল শেষরাতে। তখন আমি বটপাখি, হলুদ ফলের ভেতর কাঁচা কাঁচা স্বপ্ন জমাই…” (শেষরাত: পৃষ্ঠা ২১)।
আধুনিক কবিতার ধারা অতিক্রম করে অধুনান্তিক পরিসর সৃষ্টি করেছেন, যেমন: ‘শেষরাত’ (পৃষ্ঠা ২১)-এর কবিতাটির মতো ‘ময়ূরফুলের সন্ধ্যা’ গ্রন্থের যেকোনো কবিতা পাঠ করলেই কবি রিমঝিম আহমেদের অধুনান্তিক পরিসরের নতুন বোধকে শনাক্ত করা যায়।
তিন পর্বেই কবিতার গায়ে বাসা বেঁধে আছে কবিতার অসুখ, বস্তুজীবনে সব পাওয়ার পরও কবির এক ট্রেনভর্তি বিষণœতা আর অসুখ গ্রাম থেকে নগরের দিকে চলে গেছে। গ্রন্থের ভিতরে বিপুল শূন্যতা নৈঃসঙ্গ অনুভবে আত্মক্ষরণে দ্বন্দ্বে দ্বিধায় কবিতাগুলি ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। অস্তিত্বের টানাপড়নের দাহময় কাব্য আছে, আত্মের বিচূর্ণ দর্পণ আছে, সেই আত্মপরিচয়ের সংস্রব হচ্ছে দীর্ঘ স্তবকগুলি:
“[…] ট্রেনের ভেতর এক অবিশ্বাস্য ট্রেন আমাকে ধেয়ে নিয়ে যাচ্ছে। …. অক্ষত আমরা ময়ূরফুলের মতো একে অপরের কাছে জমা পড়ে যাই। নিতান্তই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুর হবার অপরাগতায় নিজের চোখ হাতে নিয়ে বসে থাকছি ধোঁয়াটে সন্ধ্যাগুলোয়…” (পুরাতন জেল-রুট ধ’রে: পৃষ্ঠা ৫০ )।
প্রত্যক্ষকে প্রচ্ছন্নের সাথে, নিকটকে দূরের সাথে, অতীতকে বর্তমান আর ভবিষ্যতের দিকে লীন করে দিয়ে সৃষ্টি করেছেন গোপনতাপূর্ণ অন্তঃশীলা। আপন অস্তিত্বকে স্বীয় সম্পর্কের অস্তিত্বের সাথে বিলীন করে দিয়ে ক্লিষ্ট আর ক্লান্তিতে নিজ উপগমন অস্তিত্বকে সম্প্রসারিত করেছেন
“ […] প্রতিদিন কাকের কর্কশ ডাক। বুড়ো হয়ে আসা ছাদের করতল ছেড়ে কোথাও যাওয়া হয় না আমার। মা আসে স্মৃতিতে ভর দিয়ে। খোলা জানলা দিয়ে বাবার গায়ের গন্ধ গায়েবি খেলায় ঘরে ঢুকে বিবশ করে দেয়…”… (মা: পৃষ্ঠা ১৫)।
“ […] দেখি বাবার নুনমাখা মুখ, চিরল বাঁক বেয়ে ঢুকে-পড়া নুনের প্লাবন। দেখি, আমার পূর্বপুরুষের প্রতিচ্ছবি…” …. (যে নদী বাঁকখালি: পৃষ্ঠা ১৩)।
কবির মানসভ্রমণে উত্তরাধিকারের মতো গভীর তাৎপর্যময় লোকঐতিহ্যের প্রভাবপ্রেরণা এবং নিজ শিকড়ের যোগ আছে। কবির বংশানুক্রমিক আশ্রয়ের উপকরণ হয়ে এসব সংস্কারগুলি এই গ্রন্থেও আবির্ভাব হয়েছে। ঐতিহ্যটানের সাথে সূক্ষ্ম লোকচিত্রকল্পের নির্দশনগুলি স্তবকে স্থাপিত করে রহস্যময় বিভোরতা বৃদ্ধি করেছেন কবি
“[…] খুব বৃষ্টি হলে, বাহির ভাসিয়ে নিয়ে গেলে, অথবা আমাদের পাড়ায় ঝুপ করে আকাশ নেমে এলে, মা চাল ভাজতে বসত। চালভাজা, আমরা শিখেছিলাম কড়ই। এমন জলমগ্নতা ঠেলে দূর কোন পাহাড়ি গ্রাম থেকে কড়ই ভাজার ঘ্রাণ ভেসে আসে…”… (ময়ূরফুলের সন্ধ্যা: পৃষ্ঠা ২০)।
বস্তুত আবাসভূমির সাথে পারিপার্শ্বিকের যে সম্পর্ক, মানুষের মনের সাথে প্রকৃতিরও অনুরূপ সম্পর্ক। সকল কবির কাব্যে প্রকৃতি উপস্থিত, প্রত্যক্ষে কি পরক্ষে… কিন্তু কবি রিমঝিম আহমেদের কাছে প্রকৃতিই তাঁর বিচরণভূমি, নিসর্গাশ্রিত নিবিষ্টতা আর প্রকৃতির অনুধ্যানই তাঁর একান্ত আবাসভূমি। এই গ্রন্থে প্রকৃতিমগ্নতাই তাঁর উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব কখনো তা কবিতার মূলাধার, কখনো বা কবিতার প্রেক্ষাপট। এই প্রকৃতিজগৎ প্রচলিত চিন্তাময় প্রভাবিত বর্ণনা অনুষঙ্গের কোনো জগৎ নয় স্বতঃস্ফূর্তিতে উজ্জ্বল, স্বকীয় নির্মাণে বিশিষ্ট এবং বড় অনন্য বোধের ইন্দ্রিয়বেদ্য এক কবিজগৎ। কবিচেতনার ভিন্ন ভিন্ন মগ্নতার রঙে এ প্রকৃতিজগতের নব নব-মূল্যায়ন ঘটেছে তাঁর কাব্যের প্রবহমান বিকাশে। গ্রন্থের প্রথম থেকে শেষপর্যায় অবধি কবিতাগুলি সর্বত্র বিরাজিত থেকেছে কবির অভিনিবিষ্ট প্রকৃতিচেতনার ধারাটি। ১ম পর্ব- ‘যে নদী বাঁকখালি’; ২য় পর্বÑ ‘অসুখের অলস পতাকা’; ৩য় পর্বÑ ‘অনঙ্গের ঝরাপাতা’ এই তিন পর্বের কবিতা বিন্যাসের শুরু পর্বেও রয়েছে সূচনা পর্ব। যেখানেও রয়েছে প্রকৃতি চেতনার পাশাপাশি প্রতিবেশচেতনার সংক্ষুব্ধ আঘাত
“মা তালগাছ, একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিল প্রান্তরের কাছে
যত বিমর্ষতা, ঘরে ঢোকার আগে মা সব গিলে খেত
বাবা উড়–ক্কু মাছ, সন্তরণ ভালোবেসে
সমুদ্রের দিকে চলে গেছে
আমি জন্মান্তর, খিল এঁটে ঘুমিয়ে পড়েছি
জাগিও দিও না, সুবেহ তারা “ (১ম পর্ব- ‘যে নদী বাঁকখালি’ এর সূচনা পর্ব) ।
নশ্বরতার বিষণœ উপলব্ধিতে কাব্যে নির্মিত হয়েছে বাস্তবের তাড়নায় ও কল্পনার অনুপ্রেরণার বিপরীত দ্বন্দ্বে কবির সময় নিরূপণ
“হাতঘড়ি বিক্রি করে দিয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছ। বারান্দার ভোর হয়। খুলে পড়া চোখ গড়াতে গড়াতে অন্ধকার বারান্দা বেয়ে রাত আসে বানের জলের মতো। তুমি থমকে আছ। তোমার পেছন দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দিনরাত পর্যায়বৃত্তিগতি। হাতঘড়ি বিক্রি করে দিলে মানুষের সময়ও বিক্রি হয়ে যায়” … (সময়: পৃষ্ঠা ৩৫) ।
সমাজ, প্রকৃতি, সময়, লোকঐতিহ্য অনুধ্যানের পাশাপাশি অনেকটা সমান্তরাল, কখনো বা বেশ উচ্চতর শোভাভূমিকায় যে বিষয়টা এই গ্রন্থে পূর্বাপর লক্ষণীয়ভাবে রসাস্বাদন করেছে , তা হলো কবির প্রেম। প্রেমের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের উত্তাপ কাব্যে প্রসারিত না করে, এর পরিবর্তে কবিতায় নিয়ে এসেছেন এক অস্পষ্ট, অনির্দেশ্য প্রেম ব্যাকুলতা। যা বাস্তব থেকে দূরস্থিত অথচ কল্পনার যথার্থ উজ্জীবনে স্বপ্নেও আশ্বস্ত নয়, জৈব এবং ইন্দ্রিয়গোচর চেয়েও বড় সেই প্রেম’
“ […] আরেকটু ঘুমিয়ে নিলে ছাদ জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে ফুল। তুমি নতুন প্রেমিক নও। তুমি আশাবাদী নও। তুমি কেউ নও। এমনভাবে বসে আছ ড্রয়িংরুমে, যেন বহুদিন থেকে যাবে এই গৃহে…” (আরেকটু ঘুমিয়ে নিলেই: পৃষ্ঠা ৩৪)।
‘ময়ূরফুলের সন্ধ্যা’ মূলত এক অন্তরাল পাঠভ্রমণধর্মী কাব্যগ্রন্থ, কলকাকলিময় বাহির দুনিয়া থেকে গুটিয়ে যাওয়া কবিসত্তার গভীরের সন্তরণ। প্রিয়জনদের মৃত্যুর দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়া ধূসরতার অস্পষ্টে কবিতার উপরিস্তর থেকে হারিয়ে গেছে কবির হাসি-আনন্দ, আর কবিতার নিচের স্তরে মিশে আছে ভালোবাসার নশ্বরতার বেদনা।

The Post Viewed By: 381 People

সম্পর্কিত পোস্ট