চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সাত বছরে ৬৬ বার অপারেশন!

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ১:৪৩ অপরাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

সাত বছরে ৬৬ বার অপারেশন!

শার্লট এভান্সের বয়স যখন ১২ তখন হঠাৎ করেই তার শরীরের কোন কোন অংশ ফুলে যেতে শুরু করে। আর এই ফোলা ভাব থাকে মাসের পর মাস। এখন তার বয়স ১৯। এরই মধ্যে তার ফুলে যাওয়া অংশের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার ৬৬ বার অপারেশন হয়েছে। একবার এমন অবস্থা হয়েছিল যেখানে তার একটি পা কেটে ফেলার উপক্রম হয়েছিল।
ব্রিটেনের এই তরুণীর অভিজ্ঞতার কথা তিনি বলছিলেন বিবিসি সাংবাদিক জোহানা কার-কে :-
ছোটকালে আমার কোন সমস্যাই ছিল না। আমি নাচতে ভালবাসি। প্রায় প্রতিদিনই আমি নাচতাম। থিয়েটারেও নাচের অনুষ্ঠান করতাম। তারপর হঠাৎ করেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।
একদিন নিতম্বে প্রচ- ব্যথা নিয়ে ঘুম ভেঙে যায়। নিতম্বে ভেতরের এক জায়গায় বিচির মত কিছু একটা অনুভব করি। ব্যথা বাড়তে থাকলে হাসপাতালে যাই। সেখানে একসময় টের পাই আমার সব আঙুল ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ডাক্তাররা এটা দেখে বলে আমার ‘কম্পার্টমেন্ট সিনড্রোম’ হয়েছে। এ সম্পর্কে ডাক্তাররা জানেন এবং সাধারণত শরীরে ব্যথা পেলে এটা হয়। কিন্তু আমার কেন এটা হচ্ছে সে ব্যাপারে তারা কোন কারণ দেখাতে পারেননি।
এই পর্যায়ে আমার শরীরে প্রথমবার অপারেশন করা হয়। তারা আমার মাংসপেশিতে কেটে ফুটো করে। এবং কয়েকদিন ধরে সেই ফুটো খুলে রাখা হয়। এরপর চাপ কমে গেল সেই কাটা জায়গা জুড়ে দেয়া হয়। ঐ অপারেশনের পর থেকে আমার সমস্যাও বাড়তে থাকে। একবার আমাকে একটানা সাত মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। এসময় আমার মা অসাধ্যসাধন করেছেন। তিনি টানা সাত মাস হাসপাতালের চেয়ারে রাতে ঘুমিয়েছেন।
হাসপাতালের শিশু বিভাগে যে সময়টুকু ছিলাম তখন মনে হতো ডাক্তাররা আমার জন্যে তেমন কিছু একটা করছেন না। এরপর তারা আমাকে বলতে থাকলেন আমার আসলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তখনও আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গা বার বার করে ফুলে উঠছিল।
স্কুলের ক্লাসে আমার উপস্থিতির হার ছিল ৪০ শতাংশ। আমার হাইস্কুল ফাইনাল পরীক্ষা আমি দিয়েছিলাম হাসপাতালের বেডে বসে। দ্বাদশ শ্রেণির প্রথম পরীক্ষাটি হয় আমার অপারেশনের ঠিক পর পর। মনে আছে, বেদনা-নাশক ওষুধ মরফিন পাম্প করতে করতে আমি ঐ পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এখন মনে হয় এতে আমার ভালই হয়েছিল। মরফিনের ফলে আমার পরীক্ষা নিয়ে কোন মানসিক চাপ ছিল না, এবং সবগুলো বিষয়ে ভাল ফল করে আমি পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে আমার পা আবার ফুলে যায়। নিয়মিত চিকিৎসার জন্য আমি আবার হাসপাতালে ভর্তি হই। একদিন একজন ডাক্তার আমার বেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন আমি কেমন আছি। উত্তরে আমি চাদর সরিয়ে বললাম, আমার পায়ের অবস্থা এরকম। পায়ে কোন পালস্ নেই।
দেখে ঐ ডাক্তার বললেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার পায়ের রঙ কালো হয়ে গেছে। তাই পাটা কেটে ফেলতে হবে।
এরপর আমাকে অজ্ঞান করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি ভেবেছিলাম জ্ঞান ফেরার পর আমি আর পা দেখতে পাবো না। কিন্তু জ্ঞান ফিরে দেখি পা তার জায়গাতেই আছে। আমি তো খুব খুশি। ডাক্তাররা আমাকে বলল, পায়ের পালস্ ফিরে এসেছিল বলে তারা আর অ্যামপিউট করেনি। আর এক ঘণ্টা দেরি হলো পা’টা কেটেই ফেলতে হতো।
প্রতিবার অপারেশনের পর আমার শরীরে কাটা দাগের সংখ্যা বাড়তে থাকে। লোক মনে করে আমার মানসিক সমস্যা রয়েছে বলে আমি নিজেই নিজের দেহ কেটে ফেলি। কিছুদিন আগে হাসপাতালের লিফটে এক লোক আমাকে বলে আমি স্বার্থপরের মতো আচরণ করছি। করোনাভাইরাসে যখন লোকে মারা যাচ্ছে তখন আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করছি।
এবছর মোট আটবার আমার শরীরের কোন না কোন অংশ ফুলে গিয়েছিল। একই সাথে অন্যান্য সমস্যাও বাড়ছে। বয়স কম থাকলে ক্ষত তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যেত। এখন সময় বেশি লাগে।
এখন আমার নতুন চিকিৎসা শুরু হয়েছে। এই প্রথম নতুন ওষুধে কিছু ফল হচ্ছে। ফুলে যাওয়ার ঘটনাও আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। কিন্তু আমার সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ডাক্তাররা এখনও ধরতে পারছেন না। এই ওষুধ কেন এবং কীভাবে কাজ করছে তারা সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছেন না।
আমি যতটুকু জানি তারা সারা দুনিয়া তন্ন তন্ন করে আমার মতো আরেকটি রোগী খুঁজে বরে করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা পাননি। তারা অন্য চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বিবেচনা করেছেন। কিন্তু সমস্যার মূল কারণ যখন জানা যায় না, তখন সঠিক চিকিৎসা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এখন আমার সমস্যা শুরু হলে আমি বাসাতেই থাকি। তা না হলে আমাকে সারা জীবন হাসপাতালেই কাটাতে হবে। পরিস্থিতি খুব খারাপ না হলে বা অপারেশন করার প্রয়োজন না হলে হাসপাতালে যাই না। বাসায় নাড়াচড়া করার ব্যাপারে মা আমাকে সাহায্য করেন।
আমার আরেকটা দুঃখ নাচতে না পারা। আমি থিয়েটারে অভিনয় করতাম, গান করতাম, নাচ করতাম। এখন আবার নাচের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেছি। কিন্তু ভয় আমার কাটে না। কি জানি, যদি আবার সমস্যা শুরু হয়! তাই খুব একটা ভরসা হয় না। কিন্তু তারপরও আমি আশায় বুক বেধে রাখি: হয়তো একদিন আমি সেরে উঠবো।-বিবিসি বাংলা

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 146 People

সম্পর্কিত পোস্ট