চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

এলি ও নেলি : নারী থেকে পুরুষ অতঃপর নারীতে ফেরার গল্প

১৮ মার্চ, ২০২০ | ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

এলি ও নেলি : নারী থেকে পুরুষ অতঃপর নারীতে ফেরার গল্প

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ লিঙ্গ পরিবর্তন করেন, তারা দ্বিতীয়বার আর সে নিয়ে চিন্তা করেন না। কিন্তু এলি আর লুসির ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল অন্যরকম। বেলজিয়ামের নাগরিক এলির বয়স ২১ বছর। তার জার্মান সঙ্গী নেলির বয়স ২৪। তারা দুজনেই পুরুষালি হয়ে ওঠার জন্য টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করেন, অপারেশন করে তাদের স্তন কেটে ফেলেন। কিন্তু এখন আবার তারা তাদের জন্মের সময়কার লিঙ্গ-নারীতে ফিরে এসেছেন। নেলি বলছেন, আমি খুশী যে, আমার জরায়ু কেটে বাদ দিয়ে দেইনি। যার মানে হলো আমি এখন হরমোন গ্রহণ বন্ধ করতে পারবো এবং আমাকে দেখতে অনেক বেশি নারীসুলভ লাগবে।’ গত বছর তারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা দুজনেই টেস্টোস্টেরন গ্রহণ বন্ধ করে দেবেন এবং ‘হি’-র বদলে ‘শি’ বা ‘হার’ সম্বোধনে ফিরে যাবেন। আস্তে আস্তে তাদের শরীরে নারীসুলভ অঙ্গগুলো তৈরি হতে শুরু করে। তাদের চেহারা অনেকটা নমনীয় হয়ে ওঠে, শরীরের বাকগুলো দেখা দেয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করার ফলে কিছু প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। ‘আমার কণ্ঠ আর কখনোই আগের মতো হবে না,’ বলছেন নেলি। আমি গান গাইতে পছন্দ করতাম, কিন্তু আমার গলা আর কখনোই গানের মতো হচ্ছে না। যখন আমি কাউকে টেলিফোন করি, তারা আমার গলা শুনে পুরুষ বলে ধরে নেয়।’’ এই দুই তরুণীর গল্পটা বেশ জটিল। শিশু বয়সে একটি মেয়ে হওয়ার কারণে কোন বিব্রত বোধ করতে হয়নি এলিকে। কিন্তু যখন সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন সেই অনুভূতি পাল্টাতে শুরু করে। ‘আমি উপলব্ধি করতে শুরু করি, আমি ছেলেদের মতো অনেক কাজ করছি-আর সেটি অনেকের কাছেই ভালো লাগছে না, বিশেষ করে শিশুদের কাছে।’’ লম্বা এবং খেলোয়াড়সুলভ এলির বাস্কেটবল খেলতে ভালো লাগতো, যা অনেকটা ‘ছেলেদের খেলা’। চৌদ্দ বছর বয়সে সে অন্য মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করে।
‘আমি মেয়েদের সঙ্গে ডেটিং করতাম, সেটাই আমার ভালো লাগতো,’’ তিনি বলছেন।
এরপরে এলি তার একজন বোনকে জানান যে, তিনি লেসবিয়ান। আমার বোন আমাকে বলে, আমি যেরকমভাবে নারী হয়ে উঠছি, তা নিয়ে সে গর্ববোধ করে। তখন আমার মনে হলো, তাহলে এখন আমি একজন নারী হয়ে উঠেছি? এটা আমার ভালো লাগছিল না। এমন নয় যে আমি ছেলে হতে চেয়েছি, আসলে আমি নারী হতে চাইছিলাম না। আমি মাঝামাঝি কিছু হতে চাইছিলাম এবং ইচ্ছেমত জীবন কাটাতে চাইছিলাম।
পনেরো বছর বয়সে এলির মনে হচ্ছিল, একজন নারী হলে সেটি তার জীবনকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। তার মতো নেলিও মনে করতেন, নারী হয়ে ওঠা মজার কিছু নয়।
‘বয়ঃসন্ধির সময় এটা শুরু হয়, যখন আমার বয়স প্রায় নয় বছর। তখন আমার স্তন তৈরি হচ্ছিল কিন্তু আমি বুঝতেও পারছিলাম না সেটার মানে কি। আমার মা আমাকে খোলা বুকে বাইরে যেতে বারণ করে দিলেন। তখন আমার মনে হতো, কেন আমার ভাই খালি গায়ে বাইরে যেতে পারবে, আর আমি পারবো না?
নেলির বয়স যতো বাড়তে লাগলো, লম্পট লোকজনের নজর তার ওপর পড়তে শুরু করলো।
‘আমাকে অনেক সমস্যার মোকাবেলা করতে হতো। আমার বাড়িরর পাশের রাস্তায় যাবার সময়েও কেউ না কেউ আমার শরীর স্পর্শ করার চেষ্টা করতো। আস্তে আস্তে আমি বুঝতে শুরু করলাম, সমাজে সেক্সি বলতে যা বোঝায়, পুরুষরা যা আকাক্সক্ষা করে, আমি হয়তো তাই। কিন্তু আমাকে একজন ব্যক্তি হিসাবে যেন গণ্য করা হচ্ছে না।’
নারীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন নেলি, কিন্তু নিজেকে একজন লেসবিয়ান হিসাবে চিহ্নিত করাটাও তার জন্য ভীতিকর ছিল। উনিশ বছর বয়সে একজন বাইসেক্সুয়াল (যে নারী-পুরুষ, উভয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে) হয়ে ওঠেন নেলি। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত পুরুষদের আকর্ষণ আর নিজের নারী শরীর নিয়ে অস্বস্তি বোধ তার ভেতরে রয়েই যায়। নিজের স্তন কেটে ফেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নেলি।
তখন নেলির সামনে দুইটি বিকল্প ছিল- রূপান্তরিত হওয়া অথবা আত্মহত্যা করা। তখন তিনি একটি ট্রান্সজেন্ডার গ্রুপের সহায়তা চান। তারা একজন থেরাপিস্ট পাঠিয়ে দেন।
তিনমাস পরে নেলিকে টেস্টোস্টেরন নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ১৬ বছর বয়সে এলিও পুরুষ হরমোন নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় এ ধরণের চিকিৎসার জন্য তার অভিভাবকদের অনুমতির দরকার ছিল। প্রথম চিকিৎসক জানান, এলির উচিত আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা। তবে দ্বিতীয় চিকিৎসক তার রূপান্তরের ব্যাপারে রাজি হন।
এলির পিতা, এরিক চিন্তিত ছিলেন যে, হরমোন নেয়ার ফলে তার সন্তানের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা। কিন্তু চিকিৎসক তাকে আশ্বস্ত করেন।
প্রথমদিকে টেস্টোস্টেরন নেয়ার ফলে এলি মানসিকভাবে অসাড় বোধ করতেন। কিন্তু কিছুদিন পরে তার ভালো লাগতে শুরু করে। ১৭ বছর বয়সে স্কুলের পড়াশোনা শেষে বেলজিয়াম ছেড়ে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান।
এদিকে রূপান্তরের মাধ্যমে পুরুষ হয়ে উঠলেও নেলির আত্মহত্যার প্রবণতা কমেনি এবং তার খাবার খাওয়ার সমস্যারও সমাধান হয়নি। নেলির মনে হচ্ছিল, টেস্টোস্টেরনই তার জীবনের সবকিছু। তিনি জরায়ু কেটে ফেলার চিন্তাও করছিলেন, কিন্তু নিজের থেরাপিস্টের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিলেন না।
জার্মানির একজন নতুন ছাত্র এবং রূপান্তরিত পুরুষ হিসাবে এলি ভাবছিলেন, তিনি নতুন একটি জীবনের সন্ধান পেয়েছেন।
‘আমি একজন পুরুষের মতোই চলছিলাম, ভালোই লাগছিল। আমাকে অনেকে বলছিলেন যে, আমার রূপান্তরের কাজটি সফল হয়েছে, কারণ আমি যে রূপান্তরিত পুরুষ, সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। তবে মেয়েদের সঙ্গে ডেটিং করা তার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েদের সঙ্গে ডেটিং করতে আমার স্বস্তি লাগতো না, কারণ আমি চাইনি আমাকে সরাসরি একজন পুরুষ হিসাবে ধরে নেয়া হোক। আমার নিজের শরীর নিয়েও অস্বস্তি কাজ করতো।’’
সুতরাং এলি একটি ডেটিং অ্যাপে যান এবং সেখানেই নেলির সঙ্গে পরিচয় হয়। নেলি অবশ্য আরেকজন রূপান্তরিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের খোঁজ করছিল না।
নেলি বলছেন, যখন আমি এলির সঙ্গে বার্তা আদানপ্রদান শুরু করি, সেটা বেশ ভালো একটা ব্যাপার হিসাবে দেখা দেয়। আমরা অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে শুরু করি, একজন আরেকজনের সঙ্গে স্বস্তি বোধ করতে শুরু করি।
ডুসলডর্ফে প্রথমবারের মতো দেখা হওয়ার তাদের সম্পর্ক খুব দ্রুত গতিতে এগোতে শুরু করে। স্তন কেটে ফেলার মতো অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন নেলি। আর এলি তাকে অনুপ্রেরণা দেয়। একটি ফ্ল্যাটে উঠে আসেন এই যুগল।
এলি এবং নেলি নিজেদের পরিচয় নিয়েও গভীর আলোচনা করতেন। এই সময়ে আরেকটি ঘটনা ঘটে।
তাদের দুজনের যোনিপথের ক্ষয় দেখা দিতে শুরু করে। ব্যথা ও শুষ্কতার মতো সমস্যা সাধারণত রজোবন্ধের সময় নারীদের মধ্যে দেখা দেয়। কিন্তু টেস্টোস্টেরন নেয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবেও দেখা দিতে পারে। এর প্রতিকার হচ্ছে ইস্ট্রোজেন ক্রিম ব্যবহার করা। ‘কিন্তু এটা আসলে খুব একটা সহায়তা করছিল না,’ বলছেন নেলি। আমি ভাবলাম, যখন আমার শরীর নিজেই হরমোন তৈরি করতে পারে, তখন আমার পুরো শরীর হরমোনে ভরে ফেলছি।’
একই ভাবে ভাবছিলেন এলিও।
তিনি ভাবলেন, ‘তার চেয়ে কি স্বাভাবিকভাবে শরীরকে চলতে দেয়া উচিত নয়?’ তখন তারা টেস্টোস্টেরন নেয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু পুরনো লিঙ্গে আবার ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়াটা ছিল কঠিন।
নেলি বলছেন, ‘আবার আগের রূপে ফিরে যাওয়ার চিন্তাটা ছিল ভীতিকর কারণ আমার সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্যই আমি রূপান্তরিত হয়েছিলাম। রূপান্তর থেকে সরে যাওয়ার মানে হবে আবার সেখানে ফিরে যাওয়া।’
রূপান্তর থেকে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে সামান্যই প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হয়েছে। যেটুকু গবেষণা হয়েছে, তাতে বলা হয় যে, এক্ষেত্রে সাফল্যের হার খুবই কম। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, জন্ম সময়ের লিঙ্গে ফেরত যাওয়ার সাফল্যের হার ০.৫ শতাংশ। কিন্তু সেই গবেষণায় এ ধরণের রূপান্তর ফেরত মানুষের সংখ্যা খুব বেশি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বা দীর্ঘদিন ধরে তাদের পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।
পুনরায় নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার কয়েক মাস পরে এখন নেলি আর এলি নারী ও লেসবিয়ান হিসাবে তাদের জীবন শুরু করেছেন। যার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তাদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা। তথ্যসূত্র : বিবিসি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 115 People

সম্পর্কিত পোস্ট