চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৪ নভেম্বর, ২০২০ | ১:৪৮ অপরাহ্ণ

ডা. হাসান শহীদুল আলম

চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তন-প্রবণতা রোধে করণীয়

তৃতীয় পর্ব। চৈত্রের মাঝামাঝি। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। পটিয়াস্থ চেম্বার। লিখছিলাম চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তন-প্রবণতা রোধে করণীয় সম্পর্কে। তার ধারাবাহিকতায় চিকিৎসকদের কেন প্রয়োজন ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার সে ব্যাপারে গতবারের বাকী অংশ।

ঝ) ৫. (দুই) স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দাপ্তরিক অন্যায় অবিচার রোধ করতে হলে : ধরা যাক একজন দরিদ্র রোগী উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন সাব সেন্টার বা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে গিয়ে সেবাকর্মী থেকে যথার্থ সেবা পেলেন না। তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হলো কিংবা যে কোন সেবার জন্য তার কাছ থেকে প্রয়োজনের বেশী মূল্য নেয়া হলো। অথবা এম্বুলেন্সের চালক রোগী নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালো। চিকিৎসকরা এ সময় অসহায়ত্ব অনুভব করেন। কারণ, তিনি একজন সাধারণ ক্ষমতাহীন মেডিকেল অফিসার। কেউ তাঁর আদেশ না শুনলে বিধিমালা যাই বলুক বাস্তবে তাঁর কিছুই করার নেই। কারণ কর্মচারীরা তাদের কাজের জন্য ব্যবহারিক অর্থে কেবল একজন ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের কাছে দায়বদ্ধ। উক্ত কর্মকর্তাগণ তাঁদের দায়িত্ব পালনে এতোই জর্জরিত থাকেন যে, উল্লিখিত ধরনের অভিযোগসমূহের বিচার করার দায় তাঁরা নিতে চান না। এ কারণে কর্মচারীরা মেডিকেল অফিসারদের খুব একটা মেনে চলে না। তাই কোন কর্মচারীর অন্যায়কে সহ্য করে নেয়া ছাড়া একজন মেডিকেল অফিসারের আর কিছুই করার থাকে না। পরিণতিতে যা হয়, তা হচ্ছে নবীন একজন চিকিৎসক যিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন, তিনি নিজেই চলমান পদ্ধতির পুতুলে পরিণত হন।

তিন) স্বাস্থ্যখাতে তদারকি করতে হলে : কেবল চিকিৎসা প্রদান করার জন্য সরকার একজন চিকিৎসককে উপজেলা পর্যায়ে পাঠাননি। চিকিৎসা প্রদানের সাথে সাথে জনগণের স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে তাঁর তদারকি করা এবং বিশৃংখলা রোধে পদক্ষেপ নেয়াটাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ কাজটুকু করতে তাঁর ক্ষমতার প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্যে তাঁকে ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হলে চলে না। তাঁর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রতিবিধানে সরাসরি ইউএনও এবং স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁকে সহযোগীতা করবেন।

চার) স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন করতে হলে : দেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। যিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। কিছু কিছু পরীক্ষার হলে পরিদর্শককেও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া হয়। অথচ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের মতো এতো সংবেদনশীল একটি সেক্টর আমরা অরক্ষিত রেখে চলেছি। একজন সরকারী মেডিকেল অফিসারের কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকলেই তৃণমূল পর্যায়ে পরিবর্তন এনে স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে।

ট) হাসপাতাল সমূহের জরুরী বিভাগসহ চিকিৎসকদের কর্মস্থলের সর্বত্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা : ১)চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বিধানে স্বাস্থ্য প্রশাসনকে দায়িত্ব নিতে হবে। এ জন্যে প্রয়োজনে জনপ্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতা নিতে হবে। সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসক তাঁর দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করতে হবে এবং তার সমস্ত ব্যয় কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে এবং বেসরকারী হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনার জন্যে মালিকগণ মামলার বাদী হবেন এবং খরচ বহন করবেন। ২) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মামলা পরিচালনার জন্য এবং ঘটনার তড়িৎ সমাধানের জন্য আলাদা সেল গঠন করতে হবে। ৩) প্রতিটি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় লোকের প্রবেশ বন্ধ এবং রোগীর স্বজনদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথাযোগ্য আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা। কোন রোগীর সাথে একজনের বেশী দর্শনার্থী যাতে প্রবেশ না করে স্বাস্থ্য প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৪) প্রতিটি হাসপাতালের সেবা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে। সেবা সম্পর্কে ঢালাও মন্তব্যের কারণে চিকিৎসকদেরকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন কখনও এহেন মন্তব্য বা কর্মকা-কে মনিটর করেনি।
যার ফলে চিকিৎসা পেশার সাথে সংশ্লিষ্টগণ বারবার নাজেহাল হয়েছেন এবং হচ্ছেন। এর বিরুদ্ধে মনিটরিং ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে আউটডোর ও ইমার্জেন্সির সামনে ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন করে হাসপাতালে বেডসংখ্যা ও ভর্তি রোগীর সংখা যা তিন থেকে চারগুণ হয় এবং আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা প্রকাশ করতে হবে। এতে সরকারী মেডিকেলে চিকিৎসার ব্যাপারে জনগণের ভুল ধারণার কিছুটা হলেও অবসান ঘটবে। ৫) চিকিৎসকদের চেম্বারে বা হাসপাতালে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ৬) প্রাইমারী, সেকেণ্ডারী ও টারশিয়ারী ধাপের প্রতিটি হাসপাতালে এমনকি চিকিৎসকদের চেম্বারে নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা রাখা যারা যেকোন প্রকার বিশৃংখলা রোধ করতে পারে। এ জন্যে প্রয়োজনে পুলিশ ফাঁড়ি বা পুলিশের বিশেষ স্কোয়াডের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তন-প্রবণতা রোধে আরও করণীয় সম্পর্কে পরবর্তী লেখায় থাকছে।

লেখক:ডা. হাসান শহীদুল আলম, ডায়াবেটিস ও চর্মযৌনরোগে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 102 People

সম্পর্কিত পোস্ট