চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

২০ নভেম্বর, ২০২০ | ১:২৩ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 

খালে ডাস্টবিনে পেঁয়াজ

‘পেঁয়াজের লোকসানে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের হাহাকার। চোখের জলে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠছে। মূলধন হারানোর আশঙ্কায় অনেক আমদানিকারক’।- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন স্টাটাস দিয়েছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন। তার এই স্টাটাসের সূত্র ধরে ঘুরে আসি দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বড় পাইকারি মোকামে।

মহিউদ্দিন গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘পচে যাওয়ার কারণে নষ্ট, দামে বাজার ধস নামার কারণে আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’।

ব্যবসায়ীদের লোকসান ও পুঁজি হারানোর বিষয়কে ভাওতাবাজি-ক্রেতাদের সঙ্গে মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, তারা ৫০ পয়সা কমিশনে পেঁয়াজ বিক্রি করে আসছেন। বাজার উত্থান-পতন বা লাভ-লোকসানের সঙ্গে জড়িন নন তারা। এখন রাতারাতি কিভাবে তারা আমদানিকারক হয়ে গেলেন। লোকসান গুনে, পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। এটা পুরোটাই ভাওতাবাজি। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা ও মিথ্যাচার করছেন’।

দেখা যায়, পাইকারি মোকামে প্রতিটি আড়ত ও দোকানে পেঁয়াজে ঠাসা। বস্তায় বস্তায় পেঁয়াজ ট্রাক-ভ্যানে আনা-নেয়া চলছে। বেশির ভাগ পেঁয়াজের মানই নষ্ট হয়ে গেছে। বেশির ভাগ বস্তা ফুঁড়ে বীজ বের হয়ে গেছে। অনেক পেঁয়াজ পচে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আড়ত ও দোকানের সামনে এলোমেলো পড়ে রয়েছে পচা পেঁয়াজের বস্তা।

ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর বিকল্প দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি আইপি (আমদানি অনুমতিপত্র) নেয় আমদানিকারকেরা।

গত বছর ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর দেশীয় বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে হুলস্থূল কাণ্ড ঘটেছিল। কেজিপ্রতি ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। দেশে পেঁয়াজের দাম রেকর্ড করেছিল। সেই আশায় এবার ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর প্রচুর ব্যবসায়ী পেঁয়াজ আমদানি করেছিল। কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ী ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও পেঁয়াজ আমদানি করেছিল।

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মাসের তুলনায় পেঁয়াজের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। তাদের দাবি, ৬০ টাকা দরে আমদানি করা পেঁয়াজ পাইকারিতে ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। এমনকি পচে যাওয়ার কারণে ১০-১৫ টাকা দরেও বিক্রি করতে হয়েছে আমদানিকারকদের। এছাড়াও পচে যাওয়ার কারণে প্রচুর পেঁয়াজ খালে-ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়েছে।

চাক্তাই আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসান খালেদ বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পেঁয়াজ আমদানি করায় বাজারে ধস নেমেছে। ৬০ টাকায় আমদানি করা পেঁয়াজ ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। এমনকি মান নষ্ট হয়ে যাওয়া পেঁয়াজ ১০-১৫ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। আর পচে যাওয়া পেঁয়াজ খালে ফেলে দিতে হয়েছে। অনেক আমদানিকারক ব্যাংক ঋণ ও লোকসান গুনে দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, নিউজিল্যাণ্ড, হল্যাণ্ডের  কয়েকটি দেশ থেকে কাছাকাছি সময়ে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি আমদানি হওয়ার বাজারে ধস নামে।

চট্টগ্রাম প্লান্ট কোয়ারেন্টাইন স্টেশনের উপ পরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল জানান, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৭শ ৬৩ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া অনুমতি (আইপি) নেয়া হয়েছে আরও ২ লাখ ৬ হাজার ৭৮৮ মেট্রিক টন।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত ২০ অক্টোবর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা দরে। গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা। মিয়ানমারের ভালমানের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৭০-৭৫ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা দরে। নিম্ন ও মধ্যমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ টাকা দরে। পাকিস্তানি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৬৫-৭০ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা দরে। তুরস্কের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৭০ টাকা। তা বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৩ টাকায়। মিশরের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৬৫ টাকায়। তা বিক্রি হচ্ছে ২৩-২৫ টাকায়। ইরানি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়। নিউজিল্যাণ্ডে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকায়। তা বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়। হল্যাণ্ডে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল মানভেদে ৫০-৬০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩২ টাকা দরে।

ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আহসান খালেদ বলেন, ‘দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাছাড়াও নষ্ট হয়ে যাওয়া পেঁয়াজ বস্তাপ্রতি একশ ও দেড়শ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। বিক্রির অনুপযোগী পেঁয়াজ ডাস্টবিন ও খালে ফেলে দিতে হয়েছে। এ কারণে অনেক আমদানিকারক পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে’।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এ ঘোষণার পর দেশীয় বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে হুলস্থুল শুরু হয়।

আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমার, চায়না, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে। পাইপ লাইনে রয়েছে প্রচুর পেঁয়াজ। আমদানি বাড়ায় দামও কমতে শুরু করেছে পাইকারি বাজারে।

ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমারের পেঁয়াজ টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিতে সময় লাগে এক-দুই দিন। কিন্তু চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর হয়ে আমদানি করতে সময় লাগে অন্তত ২৫ দিন। সিঙ্গাপুর বন্দর ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। কোল্ডস্টোর (হিমাগার) এবং শীতাতপ কন্টেইনারে আমদানি করা পেঁয়াজ অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় ডগা গজিয়ে যায়। মান খারাপ হয়ে গেছে। অন্য দেশ থেকেও আমদানিতে ২০-২৫ দিন সময় লাগে। এজন্য পেঁয়াজের মান খারাপ হয়ে পড়েছে। এসব পেঁয়াজ বন্দর থেকে খালাসের পর ৪-৫ দিনের বেশি সময় রাখা যায় না। বিক্রি করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 79 People