চট্টগ্রাম রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২০

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ১:৫৫ অপরাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

হেলে-দুলে আর কত কাল?

চট্টগ্রামবাসীর কাছে যেন একটি অভিশাপ পোর্ট কানেক্টিং রোড। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ভারী যানবাহনগুলোর যাতায়াতের জন্য পরিচিত সড়কটি এখন যেন ‘মৃত্যুকূপ’। ২০১৭ সালে সড়কটি প্রশস্ত করতে শুরু হয় সংস্কার কাজ। জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে সড়কটির চলমান সংস্কার কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্বভার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক)। কিন্তু গত ৩ বছরে সড়কের বেশকিছু অংশ দৃশ্যমান ও কাজের শেষ হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি বড়পোল থেকে অংলকার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়ক। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও এ সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়কটির এখনো ৬০ শতাংশ কাজই বাকি।
যেখানে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলটির খনন কাজ উদ্বোধনের একবছরের মাথায় ৫৮ শতাংশ কাজ শেষ সেখানে দীর্ঘ চার বছর ধরে সড়কটির এ বেহাল দশায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে ঠিকাদারদের সক্ষমতা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে চসিকের দায়িত্বে অবহেলা নিয়েও। যদিও সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের তৎপরতায় সড়কটিতে বেড়েছে সংস্কার কাজের তৎপরতা। ঘুমন্ত ঠিকাদাররা জেগে উঠে চালাচ্ছেন সংস্কার কাজ। তবে ঠিকাদারদের এ ঘুম দেরিতে ভাঙায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও শেষ হবে না সংস্কার কাজ।
সড়কটি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বড়পোল মোড় থেকেই অলংকার যাওয়ার পথে সকল যানবাহনকে চলতে হয় এক সড়ক দিয়ে। পূর্ব পাশের সড়কটি দিয়ে চলাচলের কারণ হচ্ছে বড়পোল থেকে ওয়াবদা মোড় পর্যন্ত পশ্চিম পাশে চলছে সংস্কার কাজ। আর সেই সংস্কার কাজের মধ্যেই এখানে গড়ে উঠেছে একটি ভ্রাম্যমাণ গাড়ির পার্কিং। যেখান থেকে দেশের যেকোন স্থানে যাওয়ার জন্য ভাড়া করা যায় গাড়ি। এরপরই হালিশহর নয়াবাজার মোড়। পোর্ট কানেক্টিং সড়কের মূল দুঃখ যেটাকে বলা হয়। তাসফিয়া কমিউনিটি সেন্টার থেকে সাগরিকা মোড় অর্থাৎ প্রায় দেড় কিলোমিটার এ সড়কটি পার হতে গেলে যেকোন যানবাহনকেই গড়াগড়ি খেতে হয় কাদায়। কখনো কখনো গর্তে পড়ে বিকল হয়ে যায় গাড়ি। সৃষ্টি হয় যানজটের। পশ্চিম পাশের সড়কটির এ অবস্থা হলেও চসিক প্রশাসকের চাপাচাপিতে পূর্ব পাশে চলছে সংস্কার কাজ। ইটের সুড়কি বসিয়ে সেখানে চালানো হচ্ছে রোলার। তবে সেটাও বন্ধ রয়েছে বৃষ্টির কারণে। শুধু তাই নয়, এ সড়কটির সড়াইপাড়া মোড়ে যে ক্রস কালর্ভাটটি ছিল সেটিও ভেঙে রাখা হয়েছে ১০ দিন ধরে। যা নিয়ে ঠিকাদার মাথাও ঘামাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এমনকি, প্রায় দেড় কিলোমিটার এ সড়কটির সংস্কার কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি
অবহেলার কারণে আগামী ১ বছরেও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেছেন তারা। আর এ কারণে এখানকার স্থানীয়দের দুর্ভোগও পৌঁছেছে চরমে।
আব্দুল মাবুদ নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা পূর্বকোণকে বলেন, ‘পোর্ট কানেক্টিং রোডের কাজ শুরু হয়েছে আজ প্রায় ৪ বছর। এই ৪ বছর আমাদের যে কি অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে কেটেছে তা কেবল এখানকার বাসিন্দারাই জানে। যারা এখানে ভাড়া থাকতো তারা বাসা পাল্টিয়ে হয়ত এই নরক যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেয়েছে। কিন্তু আমরা যারা লোকাল, তারা না কোথাও যেতে পারছি, না থাকতে পারছি। বিশেষ করে আমরা যারা নয়াবাজার এলাকাতে থাকি তাদের দুঃখ আরও কতবছর পর শেষ হবে তা নিয়েও সন্দিহান। কারণ, এ সড়কটিতে কাজ চলছে খুবই ধীর গতিতে। তবে গত মাস খানেক ধরে কাজ চলছে। নতুন চসিক প্রশাসক এসে ঠিকাদারদের চাপ দেয়ায় কাজে কিছুটা গতি বেড়েছে। তবে মনে হয় না, আগামী এক বছরেও একাজের সমাপ্তি হবে’।
ভাড়াটিয়াদের বাড়ি ছাড়ার বিষয়ে হাবিব ভিলার মালিক সোহেল বলেন, রাস্তার কারণে এখন ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ মাসেও আমাদের ভবনে প্রায় ৪টি ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে। প্রতি মাসেই এমন অবস্থা থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মাবুদের মত কাজের গতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল সৈয়দ আহমেদ, পিএসসি। তিনিও ঠিকাদারের গাফেলতি নিয়ে মন্তব্য করেন পূর্বকোণকে। তিনি বলেন, ‘পোর্ট কানেক্টিং সড়কটির সংস্কার কাজ চার ভাগে ভাগ করে করা হয়। এখন যে অংশে কাজ চলমান রয়েছে তার এক অংশের ঠিকাদার তাহের ব্রাদার্স ও অন্য অংশের ঠিকাদার মেক (গঅঈ)। তাহের ব্রাদার্সকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজ করার অনুমতি দেয়া হলেও এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। অথচ, গতবছরের জুলাই মাসে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেককে তাসফিয়া কমিউনিটি সেন্টার থেকে সাগরিকা মোড় পর্যন্ত মোট ১.৫৩ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজের দায়িত্ব দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি কেবল শেষ করেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ। অনেকটা চাপের মধ্যে রেখেও এ প্রতিষ্ঠানটির কাজে অগ্রগতি আনা যাচ্ছে না। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে তাদের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে’।
চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন এসি মসজিদের পর থেকে অলংকার পর্যন্ত সড়কটি ছিল একটি ধ্বংস স্তূপ। দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই এ সড়কটির সংস্কার কাজ শেষ করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিই। কারণ, বছরের পর বছর সড়কটির বেহাল দশার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার সড়কটি পরিদর্শন করেছি এবং সংস্কার কাজ চালিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছি। তবে বৃষ্টির কারণে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবুও আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তাসফিয়া থেকে নয়াবাজার মোড়ের পূর্ব পাশের সড়কটির সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে ধারণা করছি। বাকি অংশের কাজ আগামী নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছি। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আশাকরছি, সময়ের মধ্যেই কাজ বুঝিয়ে দিবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো’।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 164 People