চট্টগ্রাম রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২০

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ৩:০২ অপরাহ্ণ

মোতাহার হোসেন

অর্থনীতিতে আশার আলো

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় দেশের সামগ্রিক কাঠামোতে আঘাত হেনেছে। সবচেয়ে বেশী আঘাত হেনেছে মানুষের কর্মক্ষেত্রে, জীবিকা নির্বাহে। দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশ্বের দেশে দেশে করোনার এই অভিঘাত মারাত্মক। মানুষের জীবন-জীবিকা ও কর্মে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার দূরদর্শী নেতৃত্বে মানুষ আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে করোনা মোকাবিলা এবং মানুষের জীবিকা ও জীবনকে সচল রাখা এবং অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সোয়া লাখ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ অর্থনীতিকে গতিশীল করছে। ১৫ সেপ্টেম্বর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) করোনার মধ্যেই চলতি অর্থ বছরে জিডিপি ৬.৮% অর্জিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সরকার গৃহীত প্রণোদনা প্যাকেজ এবং এর সঠিক বাস্তবায়নের কারণে এর সুফল ইতোমধ্যে মানুষ পেতে শুরু করেছে।
প্রসঙ্গত: করোনার ধাক্কা সামলাতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের পাশাপাশি অতিদরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে নানারকম সামাজিক কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ ও উপকার ভোগীর সংখ্যা এবং সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। এসব কর্মসূচির মূখ্য উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রাণঘাতি করোনার মধ্যে মানুষের জীবন রক্ষা করা, মানুষের জীবিকার চাকা সচল রাখা এবং দেশে চলমান অর্থনৈতিক কর্মকা-ের গতিকে এগিয়ে নেয়া। এসব কর্মসূচির সফলতাও আসতে শুরু করেছে এবং হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখছেন সব শ্রেণী পেশার মানুষ। স্থানীয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত, সবল এবং নিয়ত গতিশীল, ঊর্ধমুখী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অর্থনীতির প্রধান সব সূচকে ঊর্ধমূখী অবস্থান বিরাজ করছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রপ্তানী আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তথা ৪০.৫৩ বিলিয়ন ডলার। এই আয় লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষায় ৪% বেশী আর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের চেয়ে ১০% বেশী। এ সময় শুধু রপ্তানীমুখী তৈরী পোশাক খাত থেকে আয় হয় ৩ হাজার ৪১০ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১.৯৯% বেশী। বিগত অর্থবছরের বাংলাদেশ ব্যাংকের রির্জাভ হচ্ছে ৩৯.৮০ বিলিয়ন ডলার আর গত আগস্ট মাসে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১৭৩ কোটি ডলার। আর জুনে এসেছে ১৮৩ কোটি ডলার। মূলত: রপ্তানী আয়ে প্রবৃদ্ধি, রির্জাভ আর রেমিটেন্স বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্সর উপর ২% হারে এবং পণ্য রপ্তানী আয়েও প্রণোদনা প্রদান। এ কারণে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ সরকারের বৈধ চ্যানেল তথা ব্যাংককিং চ্যানেলে টাকা প্রেরণ। রেমিটেন্সের উপর প্রণোদান প্রদানে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করায় রির্জাভ, রেমিটেন্স দুটোই সমান হারে বাড়ছে ক্রমাগত। এটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রাখছে। অবশ্য করোনা কালে দেশের অর্থনীতির গতিময়তায় সরকারি মহলসহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী দাতারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিষয়টিকে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কর্তৃক প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের সেপ্টেম্বর আপডেটে ইতিবাচক তথ্য ওঠে এসেছে। তাদের পূর্বভাসে বলা হয়,‘ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা সামলে অর্থনৈতিক কর্মকা- ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।’ আর সরকারের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বরাবরই বলে আসছেন বছরান্তে জিডিপি ৮% অর্জিত হবে। তবে এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে মহামারীকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বলে মনে করছে এডিবি। অর্থাৎ, বাংলাদেশে কিংবা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের গন্তব্য দেশগুলোতে মহামারীর সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। তারা বলছে, উৎপাদনের গতি বাড়ায় এবং বাংলাদেশি পণ্যের ক্রেতা দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতিকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে এবং চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতিকে জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখতে পারবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই ধারা টেকসই করতে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচির বাস্তবায়নে জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে এডিবি। করোনার টিকা যদি আগে পাওয়া যায় এবং মহামারীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার ওপর যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত রাখা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই ধারাকে টেকসই করতে ‘সহায়ক হবে’। এই সঙ্কটে সম্পদের যথাযথ বণ্টন, ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন নতুনভাবে কর্মসংস্থানের বিবিধ ক্ষেত্রে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থান,আউট সোর্সিং, ক্ষুদ্র, মাঝারি, কুঠিরশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু পালন, মৎস্যখামার গড়ে তুলে বেকার, তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থান করা গেলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির চাকা আরো বেগবান, আরো গতিশীল হবে। একই সাথে সংশ্লিষ্টা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে, সহজ কিস্তিতে ঋণ, প্রয়োজনীয় কারিগরি, প্রযুক্তিগত সহায়তা, তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্যপ্রাপ্তি, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ সরকারি সহায়তা দরকার। একই সাথে কর্মরত মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে আরও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে সম্ভাবনার দ্বার আরো প্রসারিত হবে।

লেখক: মোতাহার হোসেন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জা জার্নালিস্ট ফোরাম।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 94 People